অভিনন্দন সিদ্দিকুর
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৫২
বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমের দলগত সাফল্যের বাহিরে, ক্রীড়াক্ষেত্রে, নিঃসন্দেহে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হইলো গলফার সিদ্দিকুরের ব্যক্তিগত অর্জন। ২০১০ সালের এশিয়ান ট্যুরে ব্রুনাই ওপেন জয় করিবার পর গত রবিবার তিনি জয় করিয়াছেন হিরো ইন্ডিয়া ওপেনের শিরোপা। ব্রুনাই ওপেনের পর ইহা এমন একটি আন্তর্জাতিক শিরোপা যাহার মূল্য অনেক। ক্রিকেট বাদে গলফ হইলো আরেকটি খেলা যাহার বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ নিতে যাইতেছে। চলতি মাসে অস্ট্রেলিয়ায় গলফ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পতাকা উড়িবে, কেবলমাত্র সিদ্দিকুরের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়া। বিশ্বকাপে সিদ্দিকুর সেরা দশের মধ্যে থাকিবার আশা ব্যক্ত করিয়াছেন। তেমন হইলে আন্তর্জাতিক গলফে বাংলাদেশ এক নূতন শক্তি হিসাবে বিবেচিত হইবে। সিদ্দিকুরের সাফল্যে পুরা জাতি গর্বিত এবং দেশের সব মানুষের সহিত এই কুশলী ক্রীড়াবিদকে আমরাও অভিনন্দন জানাই।
সাড়ে ১২ লাখ ডলার মূল্যমানের ইন্ডিয়া ওপেনে ১২০ জন খেলোয়াড় অংশ নেন। টুর্নামেন্টটির ৫০তম আসরে সবাইকে পিছনে ফেলিয়া শিরোপাটি দখলে নেন বাংলাদেশের সিদ্দিকুর। প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ড হইতেই সিদ্দিকুর শীর্ষস্থানে ছিলেন। শেষ রাউন্ডে খানিকটা পিছাইয়া গেলেও সামান্য ব্যবধানে তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাস্ত করিয়া চ্যাম্পিয়ন হন। ২০১০ সালের ব্রুনাই ওপেনের পর, বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে, শুরু হইতে ভালো করিবার পরও শেষ মুহূর্তে সিদ্দিকুর পিছাইয়া পড়িয়াছিলেন। কিন্তু এইবার আর তাহা হয় নাই। এই শিরোপা জয়ের পর তাহার এশীয় র্যাংকিং নয় হইতে তিনে উন্নীত হইয়াছে।
গলফার সিদ্দিকুরের জীবনকাহিনী রূপকথার ন্যায়। গলফ অভিজাত এক খেলা, কিন্তু সিদ্দিকুর ছিলেন নিতান্তই দরিদ্র পরিবারের এক সন্তান। দারিদ্র্যের কষাঘাত হইতে মুক্তি পাইবার আশায় সিদ্দিকুরের পিতা-মাতা মাদারীপুর হইতে ঢাকায় অভিবাসন করেন এবং বসবাস করিতে শুরু করেন শহর হইতে কিছু দূরে ধামালকোটের বস্তিতে। পড়াশোনার পাশাপাশি বালক সিদ্দিকুর কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বলবয় হিসাবে যাওয়া-আসা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বলবয় হইতে ক্যাডি হিসাবে খেলোয়াড়দের সরঞ্জাম বহন করিবার দায়িত্ব পান। ইহার ধারাবাহিকতায় একসময় তাহার গলফ খেলার সুযোগ ঘটে। ২০০০ সালের দিকে গলফ ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের উদ্যোগে দেশে প্রতিযোগিতামূলক গলফে সুবিধাবঞ্চিত বলবয়-ক্যাডিদের অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণের সংস্পর্শে আসেন তিনি। ইহার পর দেশে ও দেশের বাহিরে নানান অপেশাদার টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হইতে থাকেন তিনি। একসময় পেশাদার টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার সুযোগ ঘটে তাহার। প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে এশিয়ান ট্যুরে অংশ নিয়াই তিনি জিতিয়া লন ব্রুনাই ওপেন শিরোপা। তাহার পর হইতেই আন্তর্জাতিক গলফে, বিশেষত এশিয়া সার্কিটে সিদ্দিকুর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। এখন তাহার সুযোগ আসিয়াছে বিশ্ব সার্কিটে নিজেকে প্রমাণ করিবার। গরিব পরিবারের সন্তান হইয়াও বড়লোকী এক ক্রীড়ায় কেবল দেশসেরা নহে, এশীয়সেরাদের একজন হইবার মাধ্যমে সিদ্দিকুর প্রমাণ করিয়াছেন, প্রতিভার সহিত অধ্যবসায়-নিষ্ঠা-প্রত্যয়ের যোগ থাকিলে যে কাহারও পক্ষে যে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব।
সিদ্দিকুরের কারণে দেশে গলফ খেলিবার চর্চা বাড়িয়াছে এবং গলফ খেলা হিসাবেও সকলের মনোযোগ পাইতেছে। তবে খেলাটি এখনও অল্প কিছু অঞ্চলে, যেমন সেনানিবাসে, সীমাবদ্ধ রহিয়াছে। গলফ কোর্সের জন্য প্রয়োজন বড়ো একটি স্থান। উপরন্তু, কোর্স পরিচর্যার বিষয়টি এবং খেলার সরঞ্জামাদি বেশ ব্যয়বহুল। সিদ্দিকুর তাহার প্রতিভা দিয়া অসম্ভবকে সম্ভব করিলেও গলফ খেলাটি এখনও এলিট বৃত্তে বন্দি রহিয়াছে। নীতি-নির্ধারকদের উচিত হবে খেলাটির গণতন্ত্রায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া। আরও অনেক মানুষের জন্য খেলাটি উন্মুক্ত করিতে পারিলে হয়তো দেখা যাইবে তাহাদের মধ্য হইতে আরও অনেক সিদ্দিকুরের জন্ম হইতেছে।