ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের অর্থনীতি
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩৬
নীরব ঘাতক স্বভাবের যে রোগটি দেহে বহু ব্যাধির আহবায়ক সেই ডায়াবেটিস রোগটির অব্যাহত অভিযাত্রায় শঙ্কিত সকলকে এটি নিয়ন্ত্রণে যথাসচেতন করে তুলতেই আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন আর বিশ্ব্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে সংক্রামক ব্যাধি নিচয়ের নিয়ন্ত্রণে গোটা বিশ্বে সবাই উঠে-পড়ে লাগলেও এবং গুটি বসন্ত কলেরা যক্ষ্মা ম্যালেরিয়ার মত মহামারী নির্মূলে সফল হতে সক্ষম হলেও মানুষের সুন্দর-সাবলীল জীবন-যাপনের পথে নীরবে তার সর্ব কর্মক্ষমতা হরণকারী অ-সংক্রামক ব্যাধি ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি সচেতনতার অনিবার্যতা এবং এর জন্য সুপরিকল্পিত সার্বজনীন উদ্যোগ গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকতা যথা মনোযোগ ও চেতনার চৌহদ্দিতে আসছে না বলে প্রতীয়মান হয়। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাসমূহের প্রতি বিশ্ব দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সকল সরকার ও জনগণের তরফে সংহত ও সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসংঘকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকল্পে প্রস্তাব গ্রহণের আহবান জানায়। মূলত বাংলাদেশের প্রস্তাবে এবং যৌক্তিকতার প্রচারণা-প্রয়াসে ১৪ নভেম্বরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘ ২০০৭ সালে ৬১/২২৫ নং প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই থেকে জাতিসংঘের সকল সদস্য দেশে, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দু’শ’র অধিক সদস্য সংগঠনে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থা কোম্পানি পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিক রোগীদের মাঝে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস নানা প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে। ২০০৭ সালেই জাতিসংঘের গৃহিত প্রস্তাবের সাথে সাথে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের ব্লু সার্কেল লোগোটিও নির্বাচিত হয়। নীল বৃত্ত জীবন ও স্বাস্থ্যের ধনাত্মক প্রতীক, নীলাকাশ সকল জাতি নিচয়কে সংঘবদ্ধ করেছে এবং একারণে জাতিসংঘের পতাকার রংও নীল। নীল বৃত্ত বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিক মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ ও জয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের প্রতীক। এবার ২০১৩ সালে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে, “ডায়াবেটিস জটিলতা সম্পর্কে সজাগ হোন”। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে ১৯২১ সালে ফ্রেডারিক ব্যান্টিং (১৮৯১-১৯৪১) এবং চার্লস বেস্ট (১৮৯৯-১৯৭৮) কর্তৃক ইনসুলিনের আবিষ্কার এক যুগান্তকারী অগ্রগতি-এ জন্যে ব্যান্টিং চিকিত্সায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯২৩ সালে। বলা বাহুল্য, ১৪ নভেম্বর ফ্রেডারিক ব্যান্টিং এর জন্মদিবসকেই তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ প্রদর্শনার্থে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে গৃহিত হয়েছে।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিক চিকিত্সা আন্দোলনের পথিকৃত্ প্রাণপুরুষ জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১৭-১৯৮৯) ১৯৫৬ সালে সেগুনবাগিচায় নিজের বাসভবনের আঙিনায় ছোট টিনের ঘরে দেশের ডায়াবেটিক চিকিত্সার যে উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন আজ তাঁর সেই প্রতিষ্ঠান, জাতির গর্বের প্রতীক ‘বারডেম’। বারডেম এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে ডায়াবেটিক চিকিত্সার মডেল বা সেরা কেন্দ্র এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮২ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ডায়াবেটিক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্র্ত্রণ এবং গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের একান্ত সেরা সহযোগী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি, সম্মান ও সমীহ করে আসছে। ’ অনেক মেজর রোগ থাকতে এ রকম একটা মাইনর রোগ নিয়ে তিনি আলাদা চিকিত্সা কেন্দ্র স্থাপন করতে চান কেন’ সে সময় প্রায়শ এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হলে ডা. ইব্রাহিম বলতেন ‘রোগটা মোটেই মাইনর নয়। কারো যেদিন ডায়াবেটিস হবে সেদিনই বুঝতে হবে যে, ঐ লোকটা অন্ধ হয়ে যাবে, কিংবা প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে বা তার হার্ট এ্যাটাক হতে পারে। কিন্তু যদি যথারীতি চিকিত্সা ও পরিচর্যার ভেতর একে রাখা যায়, তাহলে আজীবন সে সুস্থ থাকবে। রোগীর হয়তো ত্রিশ-চল্লিশ বছর বয়স, দশ বত্সরের মধ্যেই তার সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে, কিন্তু যথারীতি চিকিত্সা ও পরিচর্যা করলে এবং নিয়ম মেনে চললে সে ষাট বছর পর্যন্ত সুস্থ থাকবে এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবে।’ এ প্রসঙ্গে উপমা দিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমরা গাড়ি বিকল হলে তবে গ্যারেজে ঠিক করতে আনি, এটা বোকামী, সময় থাকতে যদি নিয়মিত মেইনটেন বা চেকআপ করানো হত তাহলে হয়ত গাড়ি গ্যারেজে আনার প্রয়োজনই পড়ত না।’ তাঁর এ মিশন ও ভিশন এর পতাকা তাঁরই গড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) দৃঢ় প্রত্যয়ে অত্যন্ত সযত্নে বহন করে চলছে। বারডেমে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা এখন চার লাখের বেশি, প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি (এর মধ্যে ৭৫ থেকে ১০০ জন নতুন) রোগী চিকিত্সাসেবার জন্য এখানে আসে। দেশের প্রায় সকল জেলায় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধিভুক্ত শাখা রয়েছে যেখানে স্থানীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে অগণিত ডায়াবেটিক রোগী। সরকারের জনস্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচির অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাডাস। বাংলাদেশে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রথম, প্রধান ও অন্যতম সফল নিদর্শন হল বাডাসের উন্নয়ন কার্যক্রম। বাডাস দাতা সংস্থার সাহায্যনির্ভর না হয়ে আয়বর্ধক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে ‘ক্রস ফাইন্যান্সিং’ এর মাধ্যমে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে প্রয়াসী, প্রত্যাশী। ডায়াবেটিসের মত মহামারী নিয়ন্ত্রণে মহতি উদ্যোগের মেলবন্ধন সুস্থ দেশ ও জাতি নির্মাণের দ্বারা জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সুনিশ্চিত হবে সন্দেহ নেই।
লেখক :সরকারের সাবেক সচিব
mazid1273@hotmail.com