আগুন লইয়া খেলা

যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ, ঝটিকা মিছিল, সড়ক ও রেলপথ অবরোধের চেষ্টার মধ্য দিয়া শেষ হইয়াছে ৮৪ ঘণ্টার হরতাল। যাত্রীপূর্ণ যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বোমা হইয়া উঠিয়াছে সর্বাধিক আতঙ্কের নাম। ইত্তেফাকের গত বৃহস্পতিবারের একাধিক প্রতিবেদনে এই সংক্রান্ত যেই চিত্র প্রকাশ পাইয়াছে তাহা, এক কথায়, আগুন লইয়া খেলা। মাত্র এক মাসে হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় সারাদেশে অন্তত ১০ সহস্রাধিক ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়াছে। প্রায় ২৬ জন নিহত হইয়াছে, অগ্নিদগ্ধ হইয়াছে ৭৬ জন, যাহাদের মধ্যে র্িশশু ও প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ১৬! নিক্ষেপ করা ককটেলে আহত মানুষের ইয়ত্তা নাই, কিন্তু আরও একটি ভয়াবহ দিক হইল অবিস্ফোরিত ককটেল বোমা। এই জর্দার বাক্স-সদৃশ লাল রঙের বস্তুটি পথশিশুদের নিকট বড় আকর্ষণীয়। বল ভাবিয়া তাহা লইয়া খেলা করা কিংবা নাড়াচাড়ার পরিণতির খবর আমরা আজকাল ঘনঘন প্রকাশ হইতে দেখিতেছি। জানা গিয়াছে, এই সকল ককটেল তৈরি যেইরূপ অতি সহজ, তেমনি ইহা তৈরির রাসায়নিক উপাদানও অতি সহজলভ্য। যাহারা ককটেল তৈরির কারিগর, তাহারা পূর্বে সরবরাহ করিত ছিনতাই ডাকাতি বা সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডের হোতাদের নিকট। কিন্তু রাজনৈতিক ডামাডোলের সর্বনাশা সময়ে আজ তাহাদের পৌষমাস। এই ককটেল বোমা তৈরি হইতে শুরু করিয়া তাহা বিস্ফোরণ ঘটানো অবধি রহিয়াছে বিভিন্ন প্যাকেজ। বিস্ময়ের সহিত জানা গিয়াছে এই ‘বোমা প্যাকেজে’র নানা শর্ত। এইবাবদ খরচ হয় পারফরম্যান্স অনুযায়ী ১০ হইতে ২৫ লাখ টাকা। এক বত্সর পূর্বে এই ‘বোমা প্যাকেজের’ জন্য খরচ পড়িত পাঁচ হইতে সাত লক্ষ টাকা। অর্থাত্ তাহাদের বাজার রমরমা এক্ষণে। বিভিন্ন যোগসাজশে তাহারা পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য বিস্ফোরণের পূর্বে মিডিয়াকে অবগত করিয়া দেয়। অত:পর মিডিয়ার স্টিল ও ভিডিও ক্যামেরা আসিলে চলে বোমা বিস্ফোরণের ‘শুটিং’। কিন্তু এই ‘শুটিং’ এক নির্মম খেলা। কিছু অবুঝ ছেলে খেলাচ্ছলে ঢিল ছুঁড়িতেছিল ব্যাঙভর্তি একটি জলাশয়ে। ঢিলে কোনো ব্যাঙ মরিলে তাহাদের আনন্দের শেষ থাকিত না। ব্যাঙদের এই মৃত্যুখেলায় একটি বয়স্ক ব্যাঙ ডাঙ্গায় উঠিয়া অবুঝ ছেলেদের বলিল, ‘এইভাবে খেলা করিও না। যাহা তোমাদের খেলা, তাহা আমাদের মৃত্যুর কারণ।’ এই উপকথাটি আমাদের অনেকেরই জানা আছে। হরতালে এই সহিংসতার নেপথ্যে যাহারা রহিয়াছেন, তাহারা নিশ্চয়ই সেই অবুঝ শিশু নহে। এইদেশের মানুষও নিশ্চয়ই তুচ্ছ ব্যাঙ নহে। যাহারা এই অরাজকতার নেপথ্যে রহিয়াছে তাহারা চিহ্নিত হইলে সকলের বিপদ একযোগে ঘনাইবে না। কোনো রোগ শরীরে বাসা বাঁধিলে তাহা নির্মূল করিবার দুইটি উপায়। ওই রোগটির জীবাণুটি শনাক্ত করিয়া তাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লওয়া; অথবা, জীবাণুটি শনাক্ত করা সম্ভবপর না হইলে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা। এই অ্যান্টিবায়োটিক শুধু ওই নির্দিষ্ট জীবাণুকেই ধ্বংস করে না, অনেক উপকারী জীবাণুরও বিনাশের কারণ হয়। তাহা অভিপ্রেত নহে, কিন্তু উপায় না থাকিলে চিকিত্সককে এইরূপ ব্যবস্থাপত্রই লিখিতে হয়। অতএব যাহারা অরাজকতা করিতেছে তাহারা নিজেদের পরিচয় দিয়া গেলে দেশের বৃহত্তর ক্ষতিসাধন কম হইত। আর আগুন লাগিলে সেই আগুনে আগুন-সৃষ্টিকারীও দগ্ধ হইতে পারে। আগুন লইয়া খেলা কোনো অবস্থাতেই ভালো নহে—এই সাধারণ হিতোপদেশ আমাদের বিস্মৃত হওয়া উচিত নহে। সুতরাং এই দেশকে বসবাসের উপযুক্ত রাখিতে হইলে এই খেলা বন্ধ করিতে হইবে।