আলোকপাত
চাই শিক্ষাবান্ধব আইসিটি নীতিমালা
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১০
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দ্রুত সমপ্রসারণ ঘটছে বাংলাদেশে। কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যে, অফিস আদালতে, পরিবহনে, শিক্ষায়, উত্পাদন, চিকিত্সায় যতটা না প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে তার চেয়ে ঢেরবেশি প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে তথ্য ও যোগাযোগে। বিশ্বে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সফলতার ক্ষেত্র নেহায়েত কম নয়। কিন্তু যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক সাফল্য সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা যায়, মুঠোফোন ব্যবহারে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। বিষয়টি আমার কাছে মোটেই অবিশ্বাস্য মনে হয় না। কারণ আমাদের দেশে কিশোর থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রত্যেকেই এক বা একাধিক মুঠোফোন ও সিমকার্ড ব্যবহার করে। মুঠোফোন ব্যবহারকারিদের মধ্যে অধিকাংশই তরুণ। বাংলাদেশের তরুণ সমপ্রদায়কে কেন্দ্র করেই আমাদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বাজার রমরমা। বিষয়টি কোন দিকে যাচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কিছু দিন আগে বাসায় ফেরার পথে দেখলাম রাস্তার পাশে একটি ছেলেকে কেন্দ্র করে জটলা। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ছেলেটি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ট্যাবলেটে (বিশেষ কম্পিউটার) কাজ করতে গিয়ে বেখেয়ালে ঢাকনাহীন ম্যানহোলে পরে গিয়ে বেচারার নাকাল অবস্থা। মনে মনে বললাম তবুও ভালো যে বাসের চাকার নিচে পড়েনি।
আমাদের দেশে মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ, ইউটিউব, ই-মেইল, উইচ্যাট লাইন ইত্যাদির ব্যবহার তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তরুণ সমপ্রদায়ের মধ্যে বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটের যথেচ্ছা ব্যবহার অনেকটা বই বিমুখ করেছে। বইয়ের সাদাকালো মুদ্রিত বর্ণগুলো এখন শিক্ষার্থীদের কাছে একঘেয়েমি নিরস মনে হয়। অন্যদিকে সামান্য স্পর্শেই ক্ষুদ্র যন্ত্রের মাধ্যমে খুলে যায় বিশ্বের বিচিত্রসব রঙিন দুয়ার। এখন আর শিক্ষার্থীর কাছে মা-বাবা, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীতিকথা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে ক্লাসের বন্দীজীবন ভালো লাগে না। আগের দিনে পাবলিক পরীক্ষার পূর্বের রাতগুলোতে শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য ব্যতিব্যস্ত থাকতে হতো। এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবাধ সুযোগে শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত থাকে-তবে বই নিয়ে নয়, মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার অপেক্ষায়। প্রস্তুতি না থাকলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন আর পরীক্ষায় পাসের ভীতি নেই। এখন আর বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে ময়লা ধরে না। ডিজিটাল ভার্সন কপি করতেও তেমন অসুবিধা হয় না। শিক্ষা এখন জিপিএ সর্বস্ব। শিক্ষা বলতে শিক্ষার্থীর মনোদৈহিক, আত্মিক, সামাজিক বিকাশ বা সামাজিকিকরণকে বুঝায়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে চরিত্র গঠন, নৈতিকতা, নিয়মানুবর্তিতা, দেশপ্রেম, ধর্মীয়-সমাজিক মূল্যবোধ চর্চা সততা ও পরিশ্রমী মনোবৃত্তিকে তৈরি করা শিক্ষার কাজ। এসব কিছু বাদ দিয়ে এখন শিক্ষা বলতে বুঝি পরীক্ষা শেষে ভাল জিপিএ অর্জন। ফলে শিক্ষাক্রমে নানামুখী যুগোপযোগী পরিবর্তন অসলেও শিক্ষার্থীর ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব খুবই ক্ষীণ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবাধ ও অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বিশেষ করে শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের সুযোগ না থাকায় ক্লান্ত শ্রান্ত শরীর মন নিয়ে শ্রেণিকক্ষে হাজিরা দিতে হয়। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে নির্দয় এ যন্ত্রটি বইয়ের টেবিল থেকে কেড়ে নিয়েছে শিক্ষার্থীর মূল্যবান সময়। যে বয়সে মা-বাবার নিবিড় স্পর্শে থেকে সন্তানরা আদর কাড়াকাড়ি করবে, সে বয়সে কিশোর তরুণ সমপ্রদায় কোন এক ভার্চুয়াল জগতের নেশায় বিভোর কখনো বা ফেক আইডি’র কবলে পড়ে হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত। প্রতিনিয়ত মিথ্যার বেসাতিতে নিজেও ভাসছে অন্যকেও ভাসাচ্ছে। এভাবেই ইঁচড়ে পাকা তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনে বিশ্বাসহীনতার বালির বাঁধ বাঁধছে সমাজে সংসারে।
অতিরিক্ত বা অবাধ সর্বক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শতভাগ নিশ্চিত করতে হলে এক্ষেত্রে শিক্ষাবান্ধব একটি নীতিমালা সময়ের দাবি।
লেখক:অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল কলেজ, বাড্ডা, ঢাকা।
e-mail: niru_nc@yahoo.com