সম্ভাবনার বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে অস্থির রাজনীতি

অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়েছে- এ বিষয়ে বাংলাদেশিদের যেমন সন্দেহ করার অবকাশ নেই, তেমনি নেই বিদেশিদেরও। তবে যে বিষয়টিতে ঐকমত্য আরও বেশি জোরদার তা হলো, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনার দিকটি। পৃথিবীর বিভিন্ন হিসাবের যোগফলে গত কয়েক বছর ধরে এটা স্পষ্টভাবেই দেখা গিয়েছে যে, বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচকগুলো এমনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, খুব শিগগিরই বাংলাদেশ মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে যখন উন্নত দেশগুলোতে নানাবিধ গবেষণা হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো ঘটনা। দেশের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল করতে কি করা যায় এমন গবেষণা বা তত্পরতার স্বাক্ষর না রেখে বাংলাদেশের রাজনীতি বরং উন্নয়নের ধারাকে থামিয়ে দিতে সংঘাতময় তত্পরতায় লিপ্ত থেকেছে গত কয়েক বছর ধরে। দেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের পরস্পরবিরোধী সংঘাতময় রাজনৈতিক চর্চার কারণে এবং বিশেষ করে নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে অচলাবস্থার সুযোগে বাংলাদেশের সম্ভাবনার স্বপ্ন অনেকটাই থমকে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সামনে এগিয়ে নিতে ভূমিকা না রেখে দু’দলের রাজনীতি বরং এই সম্ভাবনার দ্বারকে রুদ্ধ করার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে চলছে এখন রাজপথের সহিংসতা। এক দল সংসদে অধিক সংখ্যক সাংসদ থাকার সুযোগে সংবিধানকে তাদের মত করে সংশোধন করে নিয়ে নির্বাচনী ইস্যুতে বিশৃংখলার সুযোগ করে দিয়েছে; অন্য দল সংবিধান সংশোধনের সময় এর বিরুদ্ধে কোন রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালিত না করে অপেক্ষা করেছে চরম সময়ের অর্থাত্ নির্বাচনের পূর্বে সংঘাতময় পরিস্থিতির। এখন সামনে যখন নির্বাচন তখন দু’দল দু’দিকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। রাজপথে চলছে এক দলের ডাকা হরতাল আর অন্য দলের হরতাল ঠেকানোর তত্পরতা। মাঝখানে মৃত্যুবরণ করছে সাধারণ জনগণ। লাশ হচ্ছে শত মানুষ। মানুষের লাশ কাতর করতে পারছে না দু’দলের দু’নেত্রীকে। যার যার জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছেন তারা। যত লাশই পড়ুক, অর্থনীতির যত ক্ষতিই হোক- এই দু’দলকে নাড়া দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দু’দলই দাবি করে তাদের রাজনীতি মানুষের জন্য, দেশের উন্নয়নের জন্য। নির্বাচনী পদ্ধতি নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা অথবা দলীয় সরকার ব্যবস্থায় হবে এই বিতর্কের আবর্তে পড়ে দু’দল অসহনীয় আন্দোলন করছে। সরকার আন্দোলন করছে তাদের দ্বারাই নির্বাচন করার, আর বিরোধী দল আন্দোলন করছে তাদের বাদ দিয়ে নির্দলীয় সরকার দিয়ে নির্বাচন করার। কোন ছাড় কেউ দিতে পারছে না। দাবি আদায়ের শেষ ভরসা হিসাবে বিরোধী দল হরতাল ডাকছে একের পর এক। হরতাল ঠেকাতে পুলিশ গুলি করছে। হরতালকারীরা ইট নিক্ষেপ করছে, আগুন দিচ্ছে, ককটেল নিক্ষেপ করছে, মানুষ হত্যা করছে। উল্টোদিকে পুলিশ টিয়ার সেল নিক্ষেপ করছে, গুলি করছে। মাঝখানে থাকা দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ছে, দেশের জনগণ প্রাণ দিচ্ছে। দোকান ও ব্যবসা বন্ধ থাকছে, অর্থনীতির চাকা ঘুরছে না। প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা, লাশ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তারপরও হরতাল চলছে, হরতাল ঠেকানো চলছে। এরই নাম বাংলাদেশ স্টাইল রাজনীতি। এই রাজনীতির উদ্দেশ্য জনগণ নয়। এই রাজনীতির শেষ চাওয়া ক্ষমতা। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েই মারামারি, যে মারামারি হতে পারতো নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে (যদি কোন কারচুপি হতো)। কিন্তু আজ বাংলাদেশের রাজনীতি নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার মত ধৈর্য নেই, বরং নির্বাচনের পূর্বেই ফলাফলটি তার অনুকূলে নিয়ে আসার জন্য মারামারি করছে। লক্ষ্য করলে যে কেউ দেখতে পাবে, এখনকার হরতালে-বিরোধী দলের কোন নেতা-কর্মীকেই রাজপথে দেখা যাচ্ছে না। হরতাল ডাকছে তারা কিন্তু হরতালকারী হিসাবে দেখা যাচ্ছে অন্য কাউকে। আউট-সোর্সিং করে হরতাল করা হচ্ছে ইদানীং। ভাড়া করা আউট-সোর্স দিয়ে যে হরতাল হয় তাকে কি রাজনৈতিক আন্দোলন বলার কোন সুযোগ আছে? তর্কের খাতিরে যদি বলি, সরকার আরও দু’টি নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবায়ক সরকার ব্যবস্থায় করার সিদ্ধান্ত নিলে সরকার বা সরকারি দলের অসুবিধাটি কি হতো? তাদের হাতে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা রাখার উদ্দেশ্যের মধ্যে রাজনৈতিক সততার অভাব- এই বিতর্কের উত্তর তারা কি দিতে পারবে? অন্যদিকে বিরোধী দল যদি বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো তবে তাতে তাদের কি অসুবিধা হতো? তাদের অনুমান অনুযায়ী সরকার যদি নির্বাচনে কারচুপির আশ্রয় নিত তবে কি তারা সেই কারচুপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারত না? যে হরতালে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, হরতালকারীদের মৃত্যু ঘটছে, সেই হরতাল পালন করে বিরোধী দল কোন্ রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করছে? হরতালে সরকারকে ভয় দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ভয় তো সরকার পাচ্ছে না; হরতালে ভয় পাচ্ছে এদেশের জনগণ, ব্যবসায়ী এবং সুশীল সমাজ। ফলে হরতালের কারণে বিরোধী দলের সাথে জনগণের দূরত্ব বাড়ছে। জনবিরোধী হরতাল তারপরও চলছে। প্রশ্নটি দাঁড়ায়- কেন? এর ফলে রাজনৈতিক কোন্ লাভটা হচ্ছে? তবে কি দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে, সরকারকে বিপদে ফেলে, দেশের মানুষকে অসহনীয় অবস্থায় ফেলে বিরোধী দল দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে? সেই অশান্তির হাত ধরে তাদের কোন লাভ হোক বা না হোক, অন্তত সরকারের হাত থেকে লাভের সুযোগটি দূর হোক এমনটাই কি তারা চাচ্ছে? যে বাংলাদেশে এখন আর কেউ না খেয়ে মরে না, যে বাংলাদেশ পৃথিবীর সকলকে অবাক করে দিয়ে ক্রমশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, যে বাংলাদেশে কৃষিখাত, প্রবাসী আয়ের খাত এবং পোশাক শিল্পের আয়ের খাত দেশের পুরো চেহারাটা বদলে দিচ্ছে, সেই বাংলাদেশের রাজনীতি উন্নয়নের সকল সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করে দিতে পরস্পরবিরোধী সংঘাতময় পরিস্থিতি উপহার দিচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নের সম্ভাবনার দ্বারে পৌঁছে গিয়েও দুই রাজনৈতিক দলের ভুলের কারণে পিছনে ফিরে যাব এমনটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। দেশের উন্নয়ন রাজনৈতিক উন্নয়নের সাথে জড়িত। বাংলাদেশেই এর ব্যতিক্রম হয়েছে। রাজনৈতিক কালচার উন্নত না হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। উন্নয়নের সবচেয়ে প্রধান খাতটি কৃষিখাত। কৃষি বিপ্লবে ছেয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। দরিদ্র কৃষকের শ্রমঘন খাটুনি, কৃষিখাতে সরকারের সাহায্য, গণমাধ্যমের কৃষিবিষয়ক গবেষণা বিশেষ করে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব চ্যানেল আই-এর শাঈখ সিরাজের অনবদ্য প্রচেষ্টা সব মিলিয়ে কৃষিখাতে বিপ্লব ঘটেছে বাংলাদেশে। আর কৃষিখাত থেকে যখন ভাত-ডালের বন্দোবস্ত হয়েছে, তখন সামনে এগিয়ে এসেছে আরও একটি দরিদ্র মানুষের খাত প্রবাসী আয়। দরিদ্র মানুষের বিদেশে প্রবাসী হিসাবে সামান্য আয়কে পুঁজি করে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি পোশাক শ্রমিকের ঘামঝরা শ্রমের ফসল আমাদের পোশাকশিল্প উন্নয়নের ধারাকে আরও বেগবান করেছে। আয়ের এই তিনটি ধারাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য রাজনীতির সুবাতাস বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমরা সেখানেই ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের নিজস্ব স্টাইলের রাজনীতি বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রাজনীতি আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের সম্ভাবনাকে থামিয়ে দিতে চাচ্ছে। তাদের সংঘাতময় রাজনীতি বিশেষ করে হরতালের রাজনীতি অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দিতে চাচ্ছে, হাসি-খুশি মানুষগুলোকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনা বন্ধ করে দিতে চাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জীবন বিপন্ন করে দিতে চাচ্ছে এবং সর্বোপরি অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশকে পিছনের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন রাজনীতি আরও গণমুখী হওয়া প্রয়োজন।  লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা