স্মরণ
বিচারক ‘জগন্নাথ-সোহেলে’র মৃত্যুদিবস
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০২
অনেকটা নীরবে নিভৃতে চলে গেল ১৪ নভেম্বর ২০১৩। ২০০৫ থেকে ২০১৩। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল আট বছর। জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতা ‘আট বছর আগে একদিন’। কবিতাটি পড়লে অসম্ভব মন খারাপ হয়। কবি লিখেছেন-‘শোনা গেল লাশকাটা ঘরে/ নিয়ে গেছে তারে; / কাল রাতে- ফাল্গুনের রাতের আঁঁধারে / যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ....../’’। ঠিক ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের বিচার অঙ্গন থেকে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল দু’টি উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশবাসী দেখেছিল বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনে নেমে এসেছিল এক গভীর ক্রান্তিকাল। দু’টি তরুণ তাজা প্রাণ সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে এবং সিনিয়র সহকারী জজ শহীদ সোহেল আহমেদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা সেদিন মুহূর্তেই জেনেছিল বিশ্ববাসী।
১৮বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে ২৪ জুন ১৯৯৮ সালে জগন্নাথ এবং সোহেলসহ আমরা ৯৯ জন সহকারী জজ পদে দেশের বিভিন্ন জজশীপে যোগদান করেছিলাম। একই ব্যাচে চাকরির কারণে বিভিন্ন সময় একসাথে ট্রেনিং করেছি আমরা। জগন্নাথ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। সোহেল এসেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফল করে। জগন্নাথের জন্ম হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা পদ্মা গ্রামে। সোহেল জন্মেছিলেন ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোলা জেলায়। জীবদ্দশায় জগন্নাথের স্ত্রী ‘রীতা’ এবং একমাত্র পুত্র ‘শ্রেষ্ঠ’কে নিয়ে ছিল সুখের সংসার। সোহেলও স্ত্রী ‘কান্তা’ এবং একমাত্র পুত্র ‘ইফতি’কে নিয়ে ছিল এক আনন্দময় জীবন। কে জানতো ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঠিক সকাল ০৮.৫৫ মিনিটে তাদের মৃত্যু পরওয়ানা নিয়ে হাজির হবে এক জমদূত!
জগন্নাথ এবং সোহেলের ওপর বোমা হামলার প্রথম খরবটি পাই হবিগঞ্জে কর্মরত অবস্থায়। সকাল সাড়ে নয়টায় যুগ্ম জেলা জজ সুকুমার বড়ুয়া (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) বোমা হামলার সংবাদটি জানান। সুকুমার দাদা হবিগঞ্জ জজ আদালতের নতুন ভবনের তিনতলায় বসতেন। আমি সদর সিনিয়র সহকারী জজ হিসাবে পুরাতন আদালত ভবন থেকে সবে নতুন ভবনের নিচতলায় বসা শুরু করেছি। সুকুমার দাদা উপর থেকে চিত্কার করছেন। তাড়াতাড়ি দোতলায় জেলা জজ স্যারের কাছে আসেন। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হবিগঞ্জের তত্কালীন জেলা জজ মোঃ আজিজুল ইসলাম (বর্তমানে টাঙ্গাইলের জেলা জজ) নিজ উদ্যোগে আমাদের দ্রুত তাঁর খাস কামরায় ডেকে নিলেন। পরম যত্নে নিজ সন্তানের মতো সব অফিসারকে নিরাপদ স্থানে বসিয়ে তিনি খাস কামরার দরজার সামনে কলাপসিবল গেটে তালা লাগিয়ে দিলেন। পুলিশ সুপার এবং জেলা প্রশাসককে জরুরি ভিত্তিতে তাঁর কাছে আসবার জন্য ফোন করলেন। বাংলাদেশের সব জেলা জজ আদালতে একই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল সেদিন। ১৭ আগষ্ট ২০০৫ সালে জেএমবি ৬৩ জেলা সদরের আদালত এলাকায় বোমা হামলা করবার পর আদালতগুলোতে নেয়া হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর মধ্যেই ১৪ নভেম্বর ২০০৫ সালে আমরা হারালাম আমাদের দুই সহকর্মী ‘জগন্নাথ’ এবং ‘সোহেল’কে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হল। ঝালকাঠির তত্কালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজা তারিখ আহমদ ২০০৬ সালের ২৯ মে ‘জগন্নাথ’-‘সোহেল’ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। ১.শায়খ আবদুর রহমান, ২.বাংলা ভাই সিদ্দিকুর রহমান, ৩.আল মামুন, ৪.আতাউর রহমান সানী, ৫.আবদুল আউয়াল, ৬.খালেদ সাইফুল্লাহ ও ৭.আসাদুল ইসলাম আরিফ নামের সাত জঙ্গীকে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ডাদেশ। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এবং আপীল বিভাগ সেই মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখলে মামলার শুরু থেকে পলাতক আসামি আসাদুল ইসলাম আরিফ ব্যতীত সব আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তবে উদ্বেগের বিষয় এই যে- ‘জগন্নাথ-সোহেল’ হত্যা মামলা সাহসিকতার সাথে পরিচালনাকারী পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট হায়দার হুসাইনকে ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল রাতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠি নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে। নিয়তির পরিহাস এই যে সেই বিচার আজ পর্যন্ত শেষ হয়নি!
নিরপরাধ জগন্নাথ পাঁড়ে এবং শহীদ সোহেল আহমেদকে যত সহজে সেদিন হত্যা করা গেছে তা কোনো রূপকথাতেও মিলবে না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানীরা এবং তাদের এদেশীয় দোসররা বাংলাদেশের সর্বত্র লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে কীভাবে হত্যা-নির্যাতন করেছে তা আমরা এখন অনুমান করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত অপশক্তি এদেশে এখনো ঘাপটি মেরে বসে আছে। সেই অপশক্তি এখনো ভুলে যেতে পারেনি তাদের সেই পরাজয়ের দিনগুলোর কথা। ১৯৭১ সালের দুঃসহ স্মৃতি নিয়েই তারা আজ জঙ্গী সেজেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করা সত্ত্বেও বাংলাদেশকে তারা জঙ্গীবাদী রাষ্ট্র বানাবার স্বপ্ন দেখছে। আমরা আমদের ‘প্রাণপ্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশ’কে ভীষণ ভালোবাসি। আমরা চাই না আর কোনো ‘জগন্নাথ’- ‘সোহেল’ বা অন্য কেউ এসব উগ্র জঙ্গীবাদীর নির্মম হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হোক।
লেখক : অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, কুষ্টিয়া