স্মরণ
বেগম সুফিয়া কামাল
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০২
সেকালের সামন্ত জমিদার পরিবারে ‘পুণ্যাহ’ বলে একটা উত্সব অনুষ্ঠিত হতো। বেগম সুফিয়া কামালের জন্মও হয়েছিল তেমন একটি উত্সবের দিনে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদে নানার বাড়িতে ১৯১১ সালের ২০ জুন। কবির পৈতৃক নিবাস ছিল ত্রিপুরা জেলার শিলাউর গ্রামে।
কবির শৈশব ও কৈশোর পারিবারিক পরিবেশেই কেটেছে। পর্দানশিন পরিবারের মেয়ে সন্তান হওয়ার কারণে বাল্যকালে তিনি মুক্তাঙ্গনের কোনো বিদ্যাপীঠে গমন করার সুযোগ পাননি। ঘরের মধ্যেই আরবির পাশাপাশি শিখতে শুরু করেন বাংলাভাষা। আর তখন থেকেই শুরু হয়েছিল কবিতা লেখা ও পড়ার ঝোঁক।
এসম্পর্কে তিনি তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘এমনি কোনো বর্ষণমুখর দিনে মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘হেনা’ পড়ছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, মিলন এসবের মানে কি তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যাথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এরপর প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোন্ অজানা রাজ্যে নিয়ে যেতো। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন লিখছেন, বেগম সারা তাইফুর। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখা খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া গল্প। কিন্তু কোনোটাই কি মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই শরমে সংকুচিত হয়ে উঠি।’
মাত্র সাত বছর বয়সে ১৯১৮ সালে কবির বিয়ে হয় তাঁরই জ্ঞাতিভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে। কিন্তু দুঃখের বিষয় অকালেই নেহাল হোসেন মৃত্যুবরণ করলে ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম জেলার চুনতি গ্রামের কামালউদ্দিনের সঙ্গে কবির দ্বিতীয় বিবাহ হয়। বিয়ের পর তিনি স্বামীর সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন।
কাজী নজরুল ইসলাম তখন কৃষ্ণনগরে থাকতেন। ইতিমধ্যেই ‘অভিযান’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি সুফিয়া কামাল সম্পর্কে জেনেছেন এবং পত্রালাপের মাধ্যমে পরিচয়ও হয়েছে। তবে সরাসরি দেখা হয়নি। নজরুল যখন শুনলেন সুফিয়া কামাল কলকাতায় এসে বসবাস করতে শুরু করেছেন, তখন তিনি নিজেই এসে তাঁর সাথে সাক্ষাত্ করেন। এভাবেই কবি সুফিয়া কামাল কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ লাভ করেন। নজরুলের মাধ্যমেই এক সময় ‘সওগাত’ পত্রিকা ও তার সম্পাদক মোহম্মদ নাসিরউদ্দিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সময় থেকেই তিনি কবি খান মোহাম্মদ মইনুদ্দিন ও কবি বেনজীর আহমদের সঙ্গেও পরিচিত হন। কবি বেনজীর আহমদের সহযোগিতা ও উত্সাহেই বেগম সুফিয়া কামালের প্রথম কবিতার বই ‘সাঁঝের মায়া’ এবং পরে আরো একটি গ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয়।
তাঁর জীবনের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভ। তিনি বিশ্বকবির জন্মদিনে একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। এর কিছুদিন পরই পত্রের উত্তর এলো তেমনি আরেকটি কবিতার মাধ্যমে। বিশ্বকবির কবিতা পাওয়া এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি খুবই খুশি হলেন। তারপর একদিন সত্যি সত্যি বিশ্বকবির সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। কবিগুরু তাঁকে ‘গোরা’ উপন্যাসটি উপহার দেন। এরপরও তিনি রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাত্ সান্নিধ্য পেয়েছিলেন একাধিকবার।
তিনি ছিলেন সকলের ‘সাহসিকা জননী’। সারাজীবন ১৬টি সংগঠনের সভানেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। পদক পেয়েছেন ৩২টি। তাঁর প্রধান প্রধান কবিতাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ঃ সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, দিওয়ান, প্রশান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, স্বনির্বাচিত কবিতা সঙ্কলন। গল্পগ্রন্থ ঃ কেয়ার কাঁটা, মোর দাদুদের সমাধির পরে। ভ্রমণকাহিনী ঃ সোভিয়েটের দিনগুলো । স্মৃতিচারণ ঃ একাত্তরের ডায়েরী। শিশু-কিশোর রচনা ঃ ইতলবিতল, নওল কিশোর এবং একমাত্র উপন্যাস অন্তর।
তাঁর প্রাপ্ত ৩২টি পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঃ বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিন পদক ও চেকোস্লোভাকিয়ার সংগ্রামী নারী পুরস্কার। এই মহীয়সী নারী ও মহত্প্রাণ কবির মহাপ্রয়াণ ঘটে ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর আজকের এইদিনে।
লেখক : গবেষক