[ আ লো ক পা ত]

হাওয়া ভবনের অনেকগুলো কেন্দ্র

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত হেরি কে থমাস তার প্রথম পরিচিতির সাক্ষাত্কালে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হাওয়া ভবন কি? সত্যি বলতে কী, হাওয়া ভবন সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। সে কারণে আমার উত্তর ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। তা হল— ‘জনগণ ভাবে এটি একটি ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র।’ অত্যন্ত জ্ঞানী ও বাংলা কথোপকথনে বেশ দক্ষ থমাস বাংলাদেশের সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী সমাজ সম্পর্কেও জানতে চেয়েছিলেন। এখানে আমার উত্তর ছিল বেশ যুতসই । হাওয়া ভবন সম্পর্কে মাঝে মাঝে কৌতূহল সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও এ সম্পর্কে আমি কখনই বেশি কিছু জানিনি কিংবা এর পিছনে কোন সময়ও ব্যয় করিনি। আমাকে আমার কিছু সরকারি কর্মকর্তা বন্ধু বলেছিলেন, তাদের উপলব্ধি হলো, চাকরিতে তাদের পদোন্নতি পাওয়া কিংবা মন্ত্রীকে প্রভাবিত করে ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে হাওয়া ভবনের হস্তক্ষেপ কখনো কখনো কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে জানালেন যে, তাদের একজন ডেপুটি গভর্নর ২০০৫ সালে সস্ত্রীক হাওয়া ভবনে যান এবং উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষপদে আসীন হওয়ার প্রতিযোগিতায় হাওয়া ভবনের সমর্থন লাভ। ২০০৮ সাল। আমরা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টে বাংলাদেশ কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলাম। টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন অধ্যাপক হাওয়া ভবন সম্পর্কে আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। যেমন—১। হাওয়া ভবনে অনৈতিক কাজ কি ঘটছিল? ২। সেখানে কি টর্চার কিংবা যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ সেল ছিল? ৩। লোকজন কি সেখানে মাদক গ্রহণ করত? ৪। কোন অসামাজিক কার্যকলাপ কি হতো সেখানে? তাকে দেয়ার মত আমার কাছে কোন উত্তর ছিল না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার সঙ্গী-সাথীসহ চট করে উত্তরে বললেন, ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র এই হাওয়া ভবন কিছু মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করত, দলের নেতা-কর্মী ও মন্ত্রী কিংবা মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি করত এবং একই সময়ে সরকারি বড় কোন কেনাকাটা দলীয় নেতা-কর্মীদের দেবার জন্য সুপারিশ করা হতো কিংবা প্রভাব বিস্তার করা হতো। ইদানীং যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন নতুন ধারার সরকার গঠন করার ব্যাপারে তার প্রাথমিক পরিকল্পনার কথা জানালেন; তখন টেলিভিশন টকশোতে আমি কিছু সাংবাদিক বন্ধুকে বলতে শুনলাম, ‘আমরা হাওয়া ভবনের কার্যক্রম আর দেখতে চাই না।’ আমি কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী নই। কোন সময় যখন টেলিভিশন টকশোর নিমন্ত্রকরা আমাকে রাজনৈতিক কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করে তখন আমি তালগোল পাকিয়ে ফেলি কিংবা তা ঝগড়ার মাধ্যমে শেষ হয়। যা হোক, টকশোতে কিছু নেতৃস্থানীয় সাংবাদিকের নিকট থেকে শুনে আমি নিজে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, এখন হাওয়া ভবন নেই, নেই ব্যাপকভাবে ক্ষমতার বিকল্প কোন কেন্দ্র, শুধু নামে মাত্র গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের অফিস ব্যতীত। এমতাবস্থায় কে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প কিংবা ঠিকাদারি কাজগুলোতে প্রভাব বিস্তার করছে? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে কে? বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালক এমন কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে, নতুন সরকার আসার সাথে সাথে তদবির বা সুপারিশ বন্ধ হয়ে গেছে? এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে, বড় বড় ঠিকাদারি প্রকল্পগুলো যদি বিরোধী দলের লোকজনদের অধিকারে চলে যায় তবে দলের বড় বড় নেতারা কিছুই মনে করবেন না? অথবা সোনালী কিংবা অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে অর্থমন্ত্রণালয় যাকে বাছাই করে সরকার তাকেই অনুমোদন করে? আমি জানি, আমার পাঠক শব্দ করে না হাসলেও মুচকি হাসি হাসছেন। সংবাদপত্রের রিপোর্ট দ্বারা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বিগত প্রায় পাঁচ বছরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় আজ্ঞাবহ লোকপ্রীতি বিভিন্নভাবে ব্যাপকহারে বেড়ে গিয়েছে। বড় বড় অফিসের রাঘব বোয়ালদের সন্তুষ্টি বা সম্মতি ছাড়া জ্বালানি খাতের কোন প্রকল্পের ব্যাপারে সিদ্ধান্তই নেয়া যায়নি। এই সরকারের আমলে জনপ্রশাসনের প্রত্যেক অফিসে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রত্যেকটি ফাইল বা ডায়েরি তত্ত্বাবধায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশে এটা বহুল প্রচলিত একটি কথা যে, যদি তুমি সম্পূর্ণভাবে দলের আজ্ঞাবহ না হতে পার তাহলে তোমার জীবনে ভাল কিছু ঘটবে না। এমন কি বিশেষ বাহিনী— যাদের নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদেরকেও দলীয় লোকের মত ব্যবহার করা হয়েছে বা হচ্ছে বলে আলোচনা রয়েছে। নিয়মানুযায়ী আদেশের ক্রমধারা কাজ করেনি। ব্যাপকভাবে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর আনুকূল্য ছাড়া টেলিকম খাত সংক্রান্ত কোন ব্যবসাই কেউ পায়নি। এটা শুনতে অদ্ভুত লাগবে কিন্তু বাস্তবে মনে হয়, জনগণ বর্তমান সরকারের সময়ে একটি হাওয়া ভবনের বিপরীতে এখন অনেক হাওয়া ভবন দেখছে। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। মন্ত্রণালয় কিংবা মন্ত্রীদের তাদের কাজ করার জন্য অবশ্যই ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং তারা তাদের কাজের জন্য দায়ী থাকবেন। দল এবং সরকার অবশ্যই সমান্তরালভাবে চলা উচিত। দলের নেতা-কর্মীদের অবশ্যই দল এবং সরকারের মধ্যে একটি নিরাপদ দূরত্বও বজায় রাখতে হবে। তাদের সকলেরই উচিত তৃণমূলের অংশগ্রহণে একটি শক্তিশালী এবং ভবিষ্যত্ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দল গঠনে অবদান রাখা। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের প্রত্যেকটি বড় রাজনৈতিক দল এই দূরত্ব বজায় রাখতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। আরো দুঃজনক হলো, প্রায়শই দল সরকারের মতই ভিন্ন খাতে চলছিল। সরকার রাষ্ট্রকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করল, রাষ্ট্র পরিণত হলো ভোতা অস্ত্রে। রাষ্ট্র শুধু প্রভাব বিস্তারকারী মাস্তান এবং দলের তহবিলে অনুদান দাতাদের সহায়তাকারীর ভূমিকায় পর্যবসিত হলো। দলীয় কিংবা ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে কেউ চিন্তা করতে পারে না। এটির নাম নতুন সরকার হতে পারে না। সর্বোচ্চ হতে পারে ‘নতুন বোতলে পুরনো মদের মত।’ বিশ্বাস করুন, এটা আমাদের স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করতে পারে না কোনভাবেই। আমাদের অবশ্যই আমাদের চিরাচরিত রীতি-নীতির বাইরে গিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করতে হবে। যেতে হবে বহুদূর। লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক