রক্ষা হোক গণতন্ত্র, ধ্বংস হোক ষড়যন্ত্র
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৮
বর্তমান সময়টা জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচন ও রাজনীতির সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। দেশের মানুষের নানা শংকা ও উত্কণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এ সংকট সৃষ্টিতে অনেকে মনে করেন বর্তমান সরকার দায়ী। অর্থাত্ যে কাজটি করলে পুনরায় ক্ষমতায় আসা যাবে জোট সরকার সে কাজটি কৌশলে করে রেখেছে। অন্য দিকে বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার জন্য তাদের মনমত বা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যা করার তাই করছে। এতে দেশ ও দশের কি অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে তা ভাবার সময় নেই। সাধারণ মানুষের ভাবনা নির্বাচনে এক পক্ষ হারবে-অন্য পক্ষ জিতবে। ক্ষমতায় এক পক্ষকে আসতেই হবে। সরকার গঠন করতে হবে, দেশ চালাতে হবে। আর ক্ষমতায় আসার জন্য বা নির্বাচনে জেতার জন্য সব দলই তাদের নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করবেই। কিন্তু সাধারণ ভোটার, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তারা আজ অত্যন্ত উত্কণ্ঠায় এ কারণে যে, নানা কৌশলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পতন ঘটানো বড়, নাকি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বা স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ক্ষমতায় আসার পথকে সুগম করে দেয়াটা বড়? রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কিংবা সাধারণ ভোটারদের ধুম্রজালে ফেলে অথবা অস্বচ্ছ নির্বাচনের কারণে যদি স্বাধীনতা বিরোধীচক্র ক্ষমতায় আসে তাহলে আজ দেশবাসিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা যোগাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধরে সামাজিক যুদ্ধ শুরু করতে হবে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতায় আঘাত আনার অপচেষ্টায় যারা আজ মেতে উঠেছে তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। স্বাধীনতা ও মূল্যবোধের সংগে কোন আপোষ নেই।
দেশ এখন নির্বাচন সংকটে। সামনে নির্বাচন আর পেছনে ক্ষমতা লোভ। এ দু’ এর হিসাব মেলাতে দেশে চলছে নানা অস্থিরতা, চারদিকে ভাংচুর আর আগুন। আগুনে পুড়ছে দেশের শত শত কোটি টাকার সম্পদ, মরছে নিরীহ মানুষ, বাড়ছে পুড়া মানুষের সংখ্যাও। জনগণের উপর এ নিপীড়ন, নির্যাতন, জান-মালের ক্ষতির দিক বিবেচনা করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রি বিরোধী দলীয় নেত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন একত্রে বসে সমস্যা সমাধানের পথ বের করতে। কিন্তু বিরোধী নেত্রী আমন্ত্রণ রক্ষা করেনি। এমনকি প্রধানমন্ত্রির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণের দোয়ার খোলা থাকলেও বিরোধী দলীয় নেত্রী এখন পর্যন্ত সাড়া দিচ্ছেন না। মনে হয় সমস্যা একটাই। সেটা হলো শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী-ফোবিয়া। অনেক বিশ্লেষকগণের মতে শেখ হাসিনাই প্রধান সমস্যা। কিন্তু শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান কে দেবে? দেশ ও জনগণের কথা বিবেচনা করে কিছু দিন আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত। এ কথাটিও প্রাধান্য পায়নি। এখানেও সংশয়। সর্বোচ্চ ছাড় বলতে কি বুঝায় তা নিয়ে বিএনপি তথা ১৮ দল হিসাব মিলাতে পারেনি। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবারো বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষনা করেন, “প্রধানমন্ত্রীত্ব নয়, আমি শান্তি চাই” (ইত্তেফাক-১১/১১/১৩)। বিরোধী দলের ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন তা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রনায়কচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এত কিছু বলার পরও মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী জ্বালাও-পোড়াও, অবরোধ-ভাংচুর নীতিতে অটল। কারণ, বাংলাদেশে যে মহলগুলো ও তার মিডিয়া আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাচ্ছে তারাই প্রকারান্তরে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে আড়াল করে রেখেছে, ছড়িয়েছে সহিংসতা।
সংবিধান একটি দেশের পবিত্র আমানত। আর এ আমানত জনগণের জন্য। জনগণের কল্যাণে একটি স্বচ্ছ সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার Elastic and Flexible Features. Elastic-because it stretches the power of government and Flexible-because it can be formally changed when necessary as the needs of the people in the country. প্রতিটি দেশের জন্য তার Constitution এ Flexible feature টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ যেমন আমাদের দেশের নির্বাচন সংকট। এ সংকটে the executive power অর্থাত্ সরকারকে বুঝতে হবে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন আছে কিনা। একজন ডাক্তার যেমন Stethoscope দিয়ে রোগীর স্পন্দন বুঝতে পারে তেমনি বর্তমান সরকারের অভিজ্ঞতা ও মেধা দিয়ে বুঝতে হবে বর্তমান সংকটকে। তাছাড়া বর্তমান সরকার প্রধানকে বুঝতে হবে যে, Your actions would set a precedent , that is, what your do today for the nation as the Head of the state would become either a model or worse history. আপনি অবশ্যই একটি আদর্শের, একটি ত্যাগের, একটি নেতৃত্বের মডেল রেখে যাবেন সে বিশ্বাস আমাদের আছে। দেখুন, ১০ জানুয়ারি ১৭৭৬ সালে আমেরিকা বিপ্লবে Thomas Paine সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে একটি Pamphlet ছেড়েদিলেন ‘Common Sense’ নামে। এ Pamphlet এ ছোট একটি মেসেজ ছিল ........ to fight for American independence from Great Britain. যা পরবর্তীতে আমেরিকা স্বাধীনতা লাভে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের সাধারণ জ্ঞান বা ‘Common Sense’ যে বার্তা বহন করে তা কিন্তু অসাধারণ। এ ‘Common Sense’ এর বার্তাটাকে অসাধারণ পান্ডিত্য দিয়ে বুঝতে না পারার কারণেই নির্বাচনে জয় কিংবা পরাজয়, সরকারের উত্থান বা পতন অথবা জনগণের মঙ্গল বা অমঙ্গল।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সংবিধান অনুসারে আপনি যে সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেছেন তা যথার্থ, আইনানুগ। কিন্তু এ নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় কিংবা বিএনপি এর মত বড় দল অংশ গ্রহণ না করে তাহলে বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে হয়তো বা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট একটি সরকার গঠন করতে পারে যা সংবিধান মোতাবেক। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে হলেও তা দেশের, বর্তমান প্রেক্ষাপটে, স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না। আর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ চালাতেও ব্যর্থ হবে।
বর্তমানে দেশে গণতন্ত্রের নামে চলছে ষড়যন্ত্র, নির্বাচনের নামে অরাজকতা, চলছে ক্ষমতা লাভে যুদ্ধাবস্থা। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত, জনপদ শংকিত। পুড়ছে মানুষ, মরছে মানুষ। বিপর্যস্ত রাজনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি। চারদিকে অনিশ্চয়তা, হাহাকার আর অস্থিরতা। সাধারণ মানুষ এর পরিত্রান চায়, বাঁচতে চায়। সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণে সমস্ত সমস্যার সমাধান চায়। চায় ধর্মান্ধতা ও অপসংস্কৃতির উর্দ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চেতনায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার অধিকার।
এ দেশকে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের হাত থেকে রক্ষা করা, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা, গতিশীল অর্থনীতি ও সুষ্ঠু রাজনীতির পরিবেশ রাখা, স্থিতিশীল সরকার গঠন করা, ধর্মভীরু মানুষের ধর্ম পালন ও নিরাপত্তা দান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদান দেশের জন্য বড়- নাকি সংবিধান বড়? ক্ষমতা বা মন্ত্রিত্ব বড় নয়, বড় দেশের জনগণ, তাদের স্বাধীনতা, সাম্য ও ঐক্য। এ দেশের অস্থির রাজনীতি বিপর্যস্ত করছে গণতন্ত্র। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া হচ্ছে জটিলতর আর চ্যালেঞ্জ আসছে স্বাধীনতা রক্ষার। আজ এ স্বাধীনতার রক্ষা-কবজটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রি, আপনার হাতেই অর্পণ করছি। রক্ষা হোক গণতন্ত্র-ধ্বংস হোক ষড়যন্ত্র।
(লেখক : ভিসি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়)
dmsi1963@yahoo.com