ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াইতে হইবে

কিছুদিন আগে বরিশাল সদর উপজেলার চর কাউয়া ইউনিয়নের চর আইচা গ্রামে সংখ্যালঘু হিন্দু সমপ্রদায়ের উপর নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। ভাঙচুর ও লুটপাটের পর নিরীহ ও হতদরিদ্র মানুষের বাড়ি-ঘরে করা হয় অগ্নিসংযোগ। দুর্বৃত্তদের হামলায় ১৬টি বসত ঘর একেবারে পুড়িয়া ছাই হইয়া যায়। একটি সুতাও রক্ষা পায় নাই। ইহাতে পুড়িয়া যায় গবাদিপশুও। শুধু তাহাই নহে, দুইটি মন্দিরেও লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বরিশাল শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এমন একটি এলাকার এই নিষ্ঠুর ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। সন্ত্রাসীদের ঔদ্ধত্য ও দুঃসাহস দেখিয়া সাধারণ মানুষ হতবাক হইয়াছেন। সবচাইতে বড় কথা হইল, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি এখন নূতন করিয়া হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছেন। তাহারা সহায় সম্পদ ও ঘরবাড়ি হারাইয়া মানবেতর জীবন যাপন করিতেছেন। কিন্তু সেদিকে যেন কাহারও ভ্রূক্ষেপ নাই। পবিত্র আশুরার আগের দিন সামান্য ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করিয়া এবং আগের ক্রিকেট খেলার দ্বন্দ্বের জের ধরিয়া স্থানীয় দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ইহাতে ঘটনাক্রমে একজন মুসলমান যুবককে জবাই করিয়া হত্যা করা হয়। পরদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ও আহত এক ব্যক্তির মৃত্যুর গুজব রটাইয়া ঐ হিন্দু সমপ্রদায়ের উপর হামলা করা হয় ন্যক্কারজনকভাবে। যাহাদের উপর এই নগ্ন হামলা করা হয় তাহাদের বেশিরভাগ লোকই নির্দোষ। গতকাল বুধবার ইত্তেফাকের একটি খবরে বলা হইয়াছে যে, যাহারা হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়াছিল, তাহাদের বসতঘরসহ আত্মীয়ের বাড়ি সম্পূর্ণ অক্ষত রহিয়াছে। তাহা হইলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তদের আসল উদ্দেশ্য কি ছিল? সামপ্রদায়িক সহিংসতাকে উসকাইয়া দিয়া বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা হইতে ফায়দা হাসিলই যে তাহাদের মূল টার্গেট ছিল তাহা সচেতন মানুষের বুঝিতে কোন অসুবিধা হয় না। এই বিষয়টি উপলব্ধির পরও স্থানীয় প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিতেছে। বর্তমানে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হইয়াছে, যাহাতে ক্ষতিগ্রস্ত ঐ পরিবারগুলির সিংহভাগ পুরুষ সদস্যরা ভয়ে পালাইয়া বেড়াইতেছেন। তাহাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীসহ বার্ষিক পরীক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। যাহারা নিরপরাধ তাহাদের কেন পালাইয়া বেড়াইতে হইবে বা এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হইতে হইবে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। ইতোমধ্যে চর আইচা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের নারী সদস্যদের সহিত মতবিনিময় করিয়াছেন নাগরিক প্রতিনিধি দলের নেতৃবৃন্দ। জেলা প্রশাসনের টিমও গ্রামবাসীর সহিত মতবিনিময় করিতেছে। তাহার পরও অনেকে ভরসা পাইতেছেন না। আবার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি পাইতেছে না তেমন সাহায্য-সহযোগিতা। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার অব্যবহিত পর তাহাদের মাঝে সরকারিভাবে চাউল ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। ইহাছাড়া কয়েক বান্ডিল টিন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে আমাদের বক্তব্য হইল, সামাজিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সংহতি রক্ষায় এই ধরনের ঘটনার পর স্থানীয় গণ্যমান্য ও সহূদয় ব্যক্তিদেরও আগাইয়া আসিতে হইবে। শুধু সরকারের সাহায্যের উপর নির্ভর করিতে হইলে প্রকৃতপক্ষে কাহারও তেমন উপকার হইবে না। কয়েক কেজি চাউল ও সামান্য অর্থে একটি পরিবার কি আবার ঘুরিয়া দাঁড়াইতে পারে? আমাদের আশঙ্কা হয়, দুর্বৃত্তরা এতটাই প্রভাবশালী যে, তাহাদের ভয়ে কেহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানের কথাও ঘূণাক্ষরে ভাবিতে পারিতেছেন না। তাহাদের পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইতেও পারিতেছেন না। তাহাদের অভয় দান করিতে পারিতেছেন না। যদি এই আশঙ্কা সত্য হয়, তাহা হইলে সরকারকে প্রকৃত অপরাধীদের ব্যাপারে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। ঢালাওভাবে গ্রেফতারের প্রবণতা হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। সারাদেশের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের জান ও মালের নিরাপত্তায় আরও মনোযোগী হইতে হইবে। নাগরিক হিসাবে তাহাদের সহিত সমমর্যাদাপূর্ণ আচরণ করিতে হইবে। আমরা আশা করি, চর আইচা গ্রামের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হইয়া আসিবে।