অর্থনীতির বিকাশ যাহা হইয়াছে, আরও যাহা হইতে পারিত
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৬
কৌতুক করিয়া বলা হয়, মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা ও পরিসংখ্যান। তবে ইহাও ভুল নহে যে, তুলনামূলক সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান আমাদের একটি সার্বিক দৃশ্যকল্পের আভাস দেয়। অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩-এর প্রাথমিক ফলাফলে বলা হইয়াছে, এক দশকে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র দ্বিগুণ হইয়াছে। অর্থাত্ ইহার তথ্য-উপাত্ত জানাইতেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি ক্রমশ শক্তিশালী হইতেছে, ধাবিত হইতেছে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে। স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও সময়ের ব্যবধানে বৃদ্ধি পাইয়াছে বিপুল সংখ্যায়। এমন কী প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গিয়াছে, গত এক দশকে পল্লী অঞ্চলে এই প্রবৃদ্ধি ১৫০ শতাংশের উপরে। বিপরীতে, শহরাঞ্চলে তাহা তুলনামূলক অনেক কম, মাত্র ৬৩ শতাংশের কাছাকাছি। সব মিলিয়া বলা হইতেছে, অর্থনীতির অফুরন্ত সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তব অর্জনও প্রভূত।
অথচ ৪২ বত্সর পূর্বে আমাদের অর্থনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। সদ্য জন্ম নেওয়া একটি অতি দরিদ্র দেশের নাজুক ও ভঙ্গুর আর্থ-সামাজিক অবস্থা দেখিয়া প্রবল আশাবাদী মানুষও বোধ করি চার দশক পরের বর্তমান উন্নতি ও উত্কর্ষের চিত্র কল্পনায় স্থান দিলে তাহাকে বায়বীয়-চিন্তা ভাবিয়া মনে মনে হাসিতেন। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সেই সময় বাংলাদেশকে শ্লেষ করিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অভিধায়। তবে ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা! বাস্তব চিত্রটি অন্যভাবে উপলব্ধি করিয়াছিলেন নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ফকল্যান্ড ও ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পারকিন্সন। তাহারা বাংলাদেশকে বিবেচনা করিয়াছিলেন ‘উন্নয়নের পরীক্ষাগার’ হিসাবে। ‘বাংলাদেশ : টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’ পুস্তকে তাহারা উল্লেখ করিয়াছিলেন—এইরূপ অবকাঠামো ও পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন করিতে পারে, তাহা হইলে পৃথিবীর যে কোনো দেশের পক্ষেই উন্নয়ন সাধন সম্ভবপর হইবে। তাহাদের এই শ্লেষ চার দশক শেষে আজ ইতিবাচক উদাহরণ হইয়া উঠিয়াছে।
উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করে অধিকতর উন্নয়নকে। সুতরাং অভাবিত প্রতিকূলতাকে ছাপাইয়া বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়নের চাকা হেলেদুলে চালিত করিয়া আজ যেই ত্বরণে নিয়া গিয়াছে তাহাতে বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদদের ভবিষ্যদ্বাণীর মিথ্যাপ্রমাণ করিয়া বাংলাদেশ হইয়া উঠিতেছে অর্থনীতির ‘রাইজিং টাইগারে’। সমপ্রতি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় ১১টি দেশের (‘নেক্সট ইলেভেন’) নূতন তালিকায় জায়গা করিয়া লইয়াছে বাংলাদেশ।
ইহা অনুমান করা কঠিন নহে, কেন আমরা বিকাশমান, উদীয়মান অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলের ‘মডেল’ হইয়া উঠিতেছি। আমাদের বিপুল জনসংখ্যার বেশির ভাগই তরুণ। তরুণদের প্রত্যয়, প্রযুক্তিপ্রিয়তা, চ্যালেঞ্জ লইবার স্পৃহা একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান খুঁটি। এখন বাংলাদেশের একটি গ্রামও বুঝি খুঁজিয়া পাওয়া মুশকিল, যে গ্রামের কিছু মানুষ বিদেশে কাজ করেন না। এক প্রতিবেশী দেখিতেছে, পাশের বাড়ির আলাল বিদেশে গিয়া সংসারের ‘অভাব’ শব্দটি নির্বাসনে পাঠাইয়াছে। এইরূপ লাখ লাখ আলালকে দেখিয়া আরও লাখ লাখ দুলাল বিদেশে যাইতে মরিয়া হইয়াছে চার দশক জুড়িয়াই। তাহারা বৈধ-অবৈধ—সব ধরনের পথে, এমনকী মৃত্যুকে শিয়রের নিকট রাখিয়া, পাড়ি জমাইয়াছে দূর দেশে। এখন তাই পৃথিবীর দেড় শতাধিক দেশে কাজ করিতেছেন বাংলাদেশের প্রায় ৮০ লাখ কর্মী। তাহাদের পাঠানো রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির জন্য অক্সিজেনতুল্য। দেশের ভিতরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির আসনে রহিয়াছে কৃষি খাত ও তৈরি পোশাক শিল্প। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ যখন মুক্তবাজার অর্থনীতির অবাধ প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করে তখন হইতেই অর্থনৈতিক বিকাশের গ্রাফ দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হইতে শুরু করে। মুক্তবাজার অর্থনীতির সুফল হিসাবে তৈরি পোশাকশিল্প, জনশক্তি, চিংড়ি ও চামড়াজাত পণ্যসহ কুটির শিল্প হইতে শুরু করিয়া হালে জাহাজ রপ্তনিকারক দেশের মর্যাদা পাইয়াছি আমরা। এই বাজার উন্মুক্তকরণের ফলে আমাদের অর্থনীতিতে যে বিপুল উদ্বৃত্ত তৈরি হয়, তাহার যথাযথ ব্যবহারে বিপুল সংখ্যক নূতন উদ্যোক্তাও সৃষ্টি হয়। বলা যায়, খুদে ও মাঝারি উদ্যোগের আশাতীত বিকাশ ঘটিয়াছে আমাদের দেশে। কেহ কাজের সুযোগ বা উপার্জনের নূতন পথ খুঁজিয়া পাইলে তাহার সাফল্য দেখিয়া অনুপ্রাণিত হইয়াছেন আরেকজন। এইভাবেই কর্মসংস্থানের স্রোতধারা ছড়াইয়া পড়িয়াছে সারাদেশে।
বাংলাদেশের এই সাফল্যের মূল কুশীলব আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারাই। প্রতিকূলতার শত কণ্টকের পথ মাড়িয়া তাহারা দেশকে সম্মুখপানে ধাবিত করিতেছে। এইসব উদ্যোগী ও পরিশ্রমী মানুষ যদি উপযুক্ত সহযোগিতা ও ন্যূনতম কর্মপরিবেশ পাইত, তাহা হইলে আমাদের উন্নতির চিত্র আরও অধিক চমত্কৃত করিত বিশ্ববাসীকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের সহিত যথার্থভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হইলে আমরা যে চমকাইয়া দেব, তাহাতে সন্দেহ কী!