[ রা জ নী তি ]
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্, অতঃপর কী
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৭
যানজটের কথা ভেবেই বিরোধী নেত্রী বোধহয় একটু আগে রওনা হয়েছিলেন বঙ্গভবনের উদ্দেশে। নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যান তিনি এবং বঙ্গভবনের গেটে গাড়িতে বসে থাকেন অনেকটা সময়। তাকে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়েছিল বলে জানা যায় না। তেমন অভিযোগ করেনি বিএনপিও। করবে কীভাবে? অন্যরা তো আগেভাগেই বঙ্গভবনে ঢুকেছিলেন। নিবন্ধের শুরুতেই কথাটি তোলা হলো এজন্য যে, বেশ কিছুদিন ধরেই বিরোধী নেত্রীকে কিছুটা বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার নিষ্পত্তিতে সংলাপের ভালো বিকল্প আছে বলে কেউ মনে করেন না। কিন্তু এর প্রত্যক্ষ সুযোগ তিনি হারান টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীকে একগাদা কথা শোনাতে গিয়ে। উল্টোপাল্টা নানা প্রসঙ্গে তিনিই বেশি রাগান্বিত হয়ে কথা বলেন। আর প্রধানমন্ত্রী তাকে খুঁচিয়েছেন। এতে রেগে না গিয়ে বিরোধী নেত্রীর উচিত ছিল দ্রুত সংলাপে বসার বিষয়ে এগোনো। ৬০ ঘণ্টার হরতাল করতেই হবে বলে তিনি সংলাপের বিষয়টিকে দেন ঝুলিয়ে। ৬ বা ১২ ঘণ্টার একটা মুখ রক্ষার হরতাল করেও পরদিন রাতেই সংলাপে বসার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারতেন বিরোধী নেত্রী। সেটি না করায় দৃশ্যতই সংলাপে না যাওয়ার বিষয়ে ‘টাইট’ হয়ে যায় সরকার পক্ষ। জ্বালাও-পোড়াও হরতাল শেষে চিঠি লিখে বা ফোন করেও সরকারের দায়িত্বশীল কাউকে ধরতে পারেনি বিরোধী দল। ব্যবসায়ী নেতারাও মাঝে উদ্যোগী হয়েছিলেন এবং সংলাপের ‘প্রেক্ষাপট’ তৈরিতে দাবি করেছিলেন সাফল্য। মহাসচিব পর্যায়ে নাকি বৈঠক শুরু হবে। কিন্তু এর বদলে আমরা দেখতে পেলাম ক্ষমতাসীন মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টিকে (এরশাদ) বেরিয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ‘সর্বদলীয় সরকারে’ যোগ দিতে। এ নিবন্ধ তৈরির সময় টিভি স্ক্রলে দেখা যাচ্ছে, দ্রুতই এ মন্ত্রিসভার আকার ও দফতর বণ্টনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ছাড়া গঠিত সরকার সর্বদলীয় হয় কিনা, সেটি অবশ্যই প্রশ্ন। অনেকে একে ‘তামাশা’ বলেও অভিহিত করছেন। সেটি করুন; কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে এখন কিছুটা হলেও ‘কনফিডেন্ট’ দেখাচ্ছে। বিরোধী নেত্রী তার ‘লোকজন’ নিয়ে যেদিন বঙ্গভবনে গেলেন— সেদিন পায়রা সমুদ্র বন্দর উদ্বোধন করতে গিয়ে বরগুনায় প্রধানমন্ত্রী যে ভাষণ দেন, তার ভাষা লক্ষ্য করুন। বিরোধী নেত্রীকে তিনি বলছেন, গণভবনে আসুন। আলোচনা করে সংকটের নিষ্পত্তি করি।’ প্রকারান্তরে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, গণভবনেই রয়েছে সব ক্ষমতা ও সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ। বিরোধী নেত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় রাষ্ট্রপতিও কি বলেননি— আপনারা দু’জন তো অর্থপূর্ণ কোনো ক্ষমতাই রাখেননি আমার হাতে! বিএনপি তার কাছে সংকট নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে যে লিখিত বক্তব্য পেশ করেছে, তাতেও আছে এর স্বীকৃতি। ‘রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অভিভাবক’ বলে আবার দাবিটা করা হচ্ছে তার কাছে। দৃশ্যতই এক রকম দায়ে পড়ে ‘অভিভাবক’ বলে ডাকা হচ্ছে তাকে; অথচ বিএনপি রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন পর্যন্ত জানায়নি। রাজনীতি থেকে ন্যূনতম শিষ্টাচারও যে বিদায় নিয়েছে, এ হলো তার দৃষ্টান্ত। অবশ্য এমনটিও হতে পারে, বিরোধী দল ও জোট রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছিল জাতিকে দেখাতে— তারা আন্তরিকভাবেই চান সংলাপে বসতে। রাষ্ট্রপতি এখন তার পদের প্রভাব খাটিয়ে সরকার পক্ষকে রাজি করালে করাবেন। আর না করালে তো হরতাল-অবরোধের পথ খোলাই আছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই হয়তো রাজপথ আবার হয়ে উঠবে উত্তপ্ত।
এ সপ্তাহে যে তেমন কিছু হলো না, তার একটা কারণ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের বাংলাদেশে অবস্থান করাটা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ করে চলে যাওয়ার আগে তিনি যা বলে গেছেন, তাতে বোঝা গেল এখানকার সংকট নিষ্পত্তিতে তারা সংলাপ তো চানই; সঙ্গে চান সহিংসতাময় হরতাল আর না হোক। মিডিয়ায় ইউনিসেফের একটি বিবৃতি রয়েছে, যাতে উদ্বেগ জানানো হয়েছে এসব হরতালে শিশুদের ব্যবহার ও তাদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে। বিশ্বায়িত দুনিয়ায় আমাদের রাজনীতিকদের বুঝতে হবে, ন্যায্য দাবি আদায়েও তারা যা খুশি করতে পারেন না। ‘সার্বভৌমত্বের’ দোহাই দিয়েও পার পাবেন না তারা। যেমন পাচ্ছেন না এদেশের গার্মেন্টস মালিকরা। আগেকার মতো শ্রমিক ঠকিয়ে আর অস্বাভাবিক মুনাফা করতে পারবেন না তারা। রাজনীতিকরাও মনে হয় আর পারবেন না যেমন খুশি ব্যবহার করতে জনগণের সঙ্গে। দ্রুত সম্প্রসারিত মিডিয়ার কারণেও এখানে জনচেতনার মান বাড়ছে; বাড়ছে এমনকি বিকল্প রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা। রাজনীতির খেলোয়াড়রা কে কী করছেন, তা বোঝার ক্ষমতা বাড়ছে মানুষের। তবে দুটি প্রধান দল বা পক্ষ দেশের বিরাট জনগোষ্ঠীকে এক ধরনের গোত্রীয় বিভাজনেও ফেলে দিয়েছে বলতে হবে। তারা পরস্পরকে কেবল দোষারোপ করে আর নিজেদের সবকিছু ‘জাস্টিফাই’ করতে চায়। হীন-কৌশল অবলম্বন করেও সুবিধাজনক অবস্থায় যেতে পারলে আত্মপ্রসাদ লাভ করে তারা। নীতি-আদর্শের প্রশ্নটি এক্ষেত্রে হয়ে পড়ে গৌণ। সম্প্রতি যেমন প্রধানমন্ত্রীকে কিছুটা নিশ্চিন্ত দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকার সমর্থকদেরও বলতে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দল তথা এর নেত্রী বেকায়দায় পড়ে গেছেন। তাকে বাইরে রেখে নির্বাচন করে দেড়-দু’বছর ক্ষমতায় থাকা যেতেই পারে, এমন একটা মনোভাবও সরকার সমর্থকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এখন। তারা মনে করছেন, ব্যাপক ও কঠোর কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতা নেই বিরোধী দলের। তারা নির্বাচন ঠেকাতেও পারবেন না। কিন্তু লক্ষ্য করছেন না, এ ধরনের একটা নির্বাচনে কত শতাংশ মানুষ ভোট দিতে যাবে উত্সাহের সঙ্গে (ও ঝুঁকি নিয়ে)। প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনে জিততে চেয়ে নিজেদের মধ্যে হানাহানিও বেশি করে ফেলতে পারে সরকার পক্ষের লোকেরা। গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ভোট পড়েছে, বিশ্বকে এটিও দেখাতে হতে পারে নির্বাচনকালীন সরকারকে। তবে তার আগে মহাজোটভুক্তদের নিয়ে গঠিত সরকারটি টিকে থাকতে হবে। তাদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাতও কি উপস্থিত হবে না?
নির্বাচনকালে ‘নির্দলীয়’ সরকারের ধারণা বাদ দিয়ে বিএনপি এতে যোগ দেবে না, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এ অবস্থায় তার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ভাঙার চেষ্টা রয়েছে বলে খবর মিলছে। এটা সফল হবে— বিরোধী নেত্রী পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারলে। এটি রাখা তার পক্ষে সহজ হতো— প্রধানমন্ত্রী ফোন করার সুযোগেই সংলাপের বিষয়টি ফাইনাল করে ফেললে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় ‘মানুষ পুড়িয়ে মারার হরতাল’ করার পর সাক্ষাত্ চেয়ে বিরোধী নেত্রীকে এখন যেতে হচ্ছে সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতির কাছে। তিনি অবশ্য রাষ্ট্রপতিকে সঠিকভাবেই বলেছেন, দেশে একটা ক্রান্তিকাল চলছে। যেটি বলেননি তা হলো, পাঁচ বছর পরপর এক-একটা ক্রান্তিকাল ‘উপহার’ দিচ্ছেন তারা জাতিকে। নির্বাচনকালে নির্দলীয় বা ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ ধারণাকে তো বিএনপিই প্রথম বিনষ্ট করেছিল তার অনুগত রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রধান এর কবর রচনা করলেন সাংবিধানিকভাবে। বিএনপি ও তার জোট এখন বলছে, ‘সংকীর্ণ স্বার্থে’ করা হয়েছে এটি। এ পর্যন্ত ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ সংবিধানে কী সংশোধনী আনা হয়েছে, সেটি কি তারা বলতে পারবেন? বৃহত্তর স্বার্থে দৈনন্দিন আইনও তারা প্রণয়ন করছেন না এত কসরত্ করে বানানো সংসদে। দুদকসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার চেষ্টাও হচ্ছে সংসদকে ব্যবহার করে। এসব বিষয়ে আবার বিরোধী দলের কোনো বক্তব্য নেই। বক্তব্য শুধু নাকের কাছে থাকা জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এখন প্রধানমন্ত্রী তার অধীনেই এটি করে ছাড়বেন বলে মনে হচ্ছে। এত কথা ও কাজের পর ‘আন্দোলনের অংশ’ হিসেবেও বিরোধী দল তাতে অংশ নেবে বলে মনে হয় না। জোট ধরে রাখা ও নির্বাচন ঠেকানোর কাজেই হয়তো নামতে হবে তাদের। সরকার আরও টাইট হয়ে গেলে প্রশাসনও কঠোর হবে আন্দোলনকারীদের প্রতি। রাজপথে সংঘাত আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। তাতে জানমালের ক্ষতিই শুধু বাড়বে না; বিপাকে পড়বেন উদ্যোক্তা, ক্ষুদে ব্যবসায়ী ও উপার্জনকারীরা। এর মধ্য দিয়ে দুই দলভিত্তিক রাজনীতির সংকটও বাড়বে। দেশের আরও বেশি সংখ্যক মানুষ হয়তো তখন আরও বেশি করে সন্ধান করবে বিকল্পের। সেটি আবার গ্রহণযোগ্য হতে হবে সার্বিক বিচারে।
লেখক :সাংবাদিক
hmamun67@gmail.com