স্মরণ
নোবেলবিজ্ঞানী আবদুস সালাম:স্মৃতি অম্লান
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৭
প্রফেসর আবদুস সালাম। এই উপমহাদেশের অসাধারণ এক প্রতিভা। ১৯৭৯ সালে প্রফেসর সালাম পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনিই প্রথম পাকিস্তানি যিনি নোবেল জয়ের খ্যাতি অর্জন করেন। বিজ্ঞান সাধনা ও গবেষণায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবদুস সালাম আদমস পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারের গৌরবে মণ্ডিত হন।
আবদুস সালাম জন্মেছেন তত্কালীন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের জং শহরে ১৯২৬-এর ২৯ জানুয়ারি। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৪৬ সালের গণিতে এম এ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণির স্নাতক সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। এতে মর্যাদাপূর্ণ রাঙলার (wrangler) আখ্যায়িত হলেন। গণিতচর্চায় তিনি ছিলেন তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম প্রধান পুরুষ। কেমব্রিজের পিএইচডি (১৯৫২)। আবদুস সালাম লাহোর সরকারি কলেজ ও কেমব্রিজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৫৭-তে ৩১ বছর বয়সে লন্ডন ইম্পিরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রফেসর নিযুক্ত হন। তারই নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৬৪ সালে ইতালির ত্রিয়েস্তে আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি হলেন এ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।
আজ ২১ নভেম্বর। বিজ্ঞানজগতের এক বেদনাবিধুর দিন। ১৯৯৬-এর এই দিনে প্রফেসর সালাম অক্সফোর্ডে মৃত্যুবরণ করেন। দিবসটি তার সপ্তদশ মৃত্যুবার্ষিকী। বিশ্বখ্যাত এই বিজ্ঞানীর মৃত্যুর পর ত্রিয়েস্তের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়েছে The Abdus Salam International Centre for Theoretical Physics.
আবদুস সালাম আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে বহুবিধ কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ আমার হয়েছে। অধিকন্তু, Long-term visiting mathematician (১৯৯০) ও Associate member (১৯৯০-৯৫) হিসেবে সেখানে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। এভাবেই ওই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রায় দেড় দশককালের আমার নিবিড় যোগসূত্র।
এক সত্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে প্রফেসর সালামের মানসিকতা ও মহত্ত্বের যে লক্ষণ পরস্ফুিট হয়ে ওঠে এখানে তা তুলে ধরা থেকে বিরত থাকতে পারছি না। প্রফেসর সালাম এক মনোরম অপরাহ্নে (আগস্ট ১৯৮৬) ত্রিয়েস্তে আগত বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি বিজ্ঞানীদের চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন। বৈঠকে জনৈক বিজ্ঞানীর এক প্রশ্নের উত্তরে, লক্ষ্য করলাম, প্রফেসর সালাম স্মিতহাস্যে ও অসংকোচে বললেন: Sorry, I do not know this thing. কেউ সর্ববিদ্যা বিশারদ নন। তাই প্রকৃত জ্ঞানতাপসের মধ্যেই এ ধরনের অকপট স্বীকৃতি সম্ভব।
বাংলাদেশে বিজ্ঞানের উত্কর্ষ সাধনে আবদুস সালাম দৃষ্টিগ্রাহ্য অবদান রাখেন। এই নোবেলবিজ্ঞানীর অকৃপণ সহযোগিতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে (১৯৮৮)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৩-এ আবদুস সালামকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে। ওই বছরই প্রফেসর সালামের শেষ বাংলাদেশ সফর।
সুঠামদেহী শ্মশ্রুমণ্ডিত পুরুষ আবদুস সালাম ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র স্বভাবের মানুষ। সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবদুস সালামের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাকে কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করছি এবং নিবেদন করছি তার প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।
লেখক:সাবেক গণিত প্রফেসর,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়