আলোকপাত
প্রেসিডেন্ট কেনেডির প্রয়াণের ৫০ বছর
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৫০
১৯৬৩’র ২২ নভেম্বরের এক ঝকঝকে সকাল। টেক্সাসের ডালাস নগরী। রাজপথের দু’পাশে উল্লাসমুখর জনতার হর্ষধনিকে সাথী করে খোলা গাড়িতে স্ত্রী জ্যাকুলিন, গভর্নর কোনালিও অন্যদের নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি। হঠাত্ আততায়ীর পরপর তিনটি গুলি কেড়ে নিল প্রেসিডেন্টের প্রাণ। তারপরের কাহিনী ইতিহাস।
ভাইস প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান রিচার্ড এম নিক্সনকে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে ডেমোক্র্যাট দলীয় জন কেনেডি ১৯৬০-এর নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ৪৩ বছরের কেনেডি ছিলেন কনিষ্ঠতম এবং একমাত্র পুলিত্জার পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট যার রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য বই হলো ‘প্রোফাইলস ইন কারেজ’ ও ‘হোয়াই ইংল্যান্ড স্লেপ্ট’।
ক্যাথলিক ধর্মমতের কেনেডি ছিলেন প্রথম অ-প্রটেস্টান্ট প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ষাট দশকের প্রথমদিকের উত্তাল বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল। তার মধ্যে আছে বে অব পিগসের ব্যর্থ অভিযান। কিউবান মিসাইল সংকট (যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশংকা সৃষ্টি করেছিল) মহাশূন্য জয়ের প্রতিযোগিতা যা অ্যাপোলো প্রকল্প থেকে শুরু হয়ে ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে অ্যাপোলো ১১’র চাঁদে অবতরণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে, বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ, মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রো আমেরিকানদের নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রথম পর্যায়। স্নায়ুযুদ্ধের সূচনাকালও ছিল সেটা।
১৯১৭ সালের ২৯ মে ম্যাসাচুসেটসে জন্মগ্রহণকারী জন কেনেডির পিতা জোসেফ পি কেনেডি ছিলেন ব্রিটেনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। বড় ভাই জোসেফ কেনেডি জুনিয়ার ১৯৪৪-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লড়াইয়ে নিহত হন ছোট ভাই রবার্ট কেনেডি (১৯২৫-১৯৬৮) ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও এডওয়ার্ড কেনেডি (১৯৩২-২০০৯) ছিলেন সিনেটর ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একনিষ্ঠ সমর্থক। কেনেডির পূর্বপুরুষেরা আয়ারল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন।
কেনেডি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নৌবাহিনীতে যোগ দেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাকে প্যাট্রল টর্পেডো পিটি) নৌযানের লেফটেন্যান্টের পদমর্যাদায় অধিনায়কত্বের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৪৩’র ২ আগস্ট কেনেডির নৌযান পিটি ১০৯, পিটি ১৬২ ও পিটি ১৬৯’র সঙ্গে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের নিউ জর্জিয়ার কাছে নৈশকালীন জাপানী ডেস্ট্রয়ার আমাগিরি পিটি ১০৯ কে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়। কেনেডি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ সাঁতরিয়ে অবশিষ্ট নাবিকদের উদ্ধার করেন এই অসাধারণ বীরত্বের জন কেনেডিকে নেভি ও মেরিন কোর পদকে ভূষিত করা হয়।
প্রেসিডেন্ট হিসাবে কেনেডিকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় ১৯৬২’র কিউবার মিসাইল সংকটের সময়। তার হুমকিতে তখনকার সোভিয়েট প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ কিউবার মাটি থেকে মিসাইল সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। পৃথিবী রক্ষা পায় এক অবশ্যম্ভাবী পরমাণু যুদ্ধ থেকে।
সারাজীবন ধরে কেনেডিকে ভুগতে হয়েছে যন্ত্রণাদায়ক ব্যাক পেইন ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতায়। এসব রোগব্যাধি কখনও কখনও কেনেডিকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তেও নিয়ে যায়। একাধিকবার তাকে রোমান ক্যাথলিক চার্চের Last rites (আসন্ন মৃত্যুর ধর্মীয় আচার) দেয়া হয়েছিল।
এছাড়া কেনেডির জীবনের একটা কৃষ্ণ অধ্যায় ছিল তার নারীঘটিত প্রণয়লীলা। খ্যাতিমান অভিনেত্রী মেহিলিন মনরো থেকে শুরু করে এই লীলায় জড়িয়েছেন বহু নারী। ১৯৬৩ তে মৃত্যুর পর থেকে এসব কেচ্ছাকাহিনী আরও বেশি করে গণমাধ্যমে ও বইপত্রে প্রকাশিত হতে থাকে। মাফিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। এসব সত্ত্বেও কেনেডি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে আমেরিকান ও বিশ্ববাসী নির্বিশেষে সবার মনে দাগ কাটতে সক্ষম হন। বিত্তবান পরিবারের কেনেডি ছিলেন সুদর্শন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন ‘গ্র্যান্ড রোমান্টিক।’ কেনেডি পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকটা রাজ পরিবারের মত মর্যাদা দেয়া হয়।
১৯৬১’র ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণের ভাষণে তিনি বলেছিলেন ‘Ask not what your country can do for you; ask what you can do for your country. সে ভাষণে তিনি মানুষের অভিন্ন শত্রু স্বৈরাচার দারিদ্র্য, রোগ ব্যাধি ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে একত্রে লড়াই করার জন্য বিশ্বের জাতিসমূহের বিরুদ্ধে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
লেখক: সাংবাদিক