উচ্চতর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বাণিজ্য ব্যবস্থার সহজীকরণ

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে পারার কারণে অর্থনীতির আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের নানা প্রসঙ্গই এখন গুরুত্বের সঙ্গে ওঠে আসছে। আর এসব আলোচিত প্রসঙ্গের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং শিক্ষিত তরুণদের বর্ধিত সংখ্যায় চাকরি বহির্ভূত পেশায় যুক্ত হওয়ায় মতো ইতিবাচক দিকগুলো যেমন রয়েছে, তেমনি আবার রয়েছে দক্ষতার সাথে শিল্প ও ব্যবসায় পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানা প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার মতো নেতিবাচক অনুষঙ্গগুলোও এবং বলা হচ্ছে যে, শেষোক্ত এ প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা সম্ভব হলে কিংবা নিদেনপক্ষে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বর্তমানের বার্ষিক ৬-৭ শতাংশের বলয় অতিক্রম করে সহসাই দু’অঙ্কের স্তরে পৌঁছে যেতে পারবে বলে আশা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু শিল্প ও ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতাসমূহের বিস্তারিত আলোচনা একটি দীর্ঘ পরিসরের বিষয়। তাই এখানে বস্তুতঃ বাংলাদেশের বাণিজ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রক্রিয়াগত জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি ও প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিয়ে অতি সংক্ষেপে খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা করা হলো। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সিংহভাগই এখনো মূলত স্থানীয় বাজারনির্ভর। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দ্রুত বিকাশমনতার প্রেক্ষিতে এর আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণও দ্রুত হারে বাড়ছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের পরিমাণ যেখানে ছিল ১৭ হাজার ১৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ৫ বছরের ব্যবধানে তা দিগুণেরও বেশি বেড়ে ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৫১৬ মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ যেখানে ছিল ১২ হাজার ১৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এ ক্ষেত্রেও বৃদ্ধির হার প্রায় দিগুণ। ধারণা করা যায় যে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও সেই সুবাধে ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগপ্রবণতার স্ফীতির কারণে উল্লিখিত সব ধরনের বাণিজ্যের পরিমাণই দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাবে এবং নিকট ভবিষ্যতের দিনগুলোতে বৃদ্ধির এ হার আরো বাড়তি গতি লাভ করবে। বাংলাদেশের প্রচলিত বাণিজ্য ব্যবস্থার সহজীকরণের লক্ষ্যে এর নানা বিধিবিধান ও নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রে সংস্কার সাধনের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন এ ক্ষেত্রে প্রতিপালনীয় বা অনুসরণীয় আইন, বিধিবিধান ও আনুষঙ্গিক নিয়ম-কানুন সম্বলিত বিজ্ঞপ্তি ও প্রজ্ঞাপনসমূহের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা। বিষয়টির সাথে একাধিক বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দফতর ও সংস্থা জড়িত বিধায় কাজটি অনেকটাই কঠিন বৈকি! তবে এ কঠিন কাজটি পূর্ণাঙ্গভাবে করা সম্ভব হলে তা শুধু বাণিজ্য সহজীকরণের জন্যই নয়- আরো বহুবিধ কাজের ক্ষেত্রেই তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাত্ত ভিত্তি (ডাটা বেইজ) হিসেবে কাজে আসবে বলে আশা করা যায়। বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নয়নে স্ট্যাকহোল্ডারদের কথা বিবেচনায় রেখেই এ প্রসঙ্গে এখানে অতি সংক্ষেপে ছোট্ট কয়েকটি মন্তব্য তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করছি। বলা প্রয়োজন যে, দেশের দু’টি সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম ও মংলার বিপুল বাণিজ্য সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ দু’টির কোনোটিরই অবকাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার স্তর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রথম দিকেতো নয়ই—মাঝামাঝি পর্যায়েও নেই। তদুপরি মংলা বন্দরের স্থাপিত সামর্থ্যের সিংহভাগই আবার অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। অথচ ঘটনা হচ্ছে যে, এ দুটি বন্দরকে পরিপূর্ণ দক্ষতার সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব আমদানি-রফতানি বাণিজ্যই-যে শুধু বাড়তি গতিশীলতা খুঁজে পাবে, তাই নয়। এ বন্দর দু’টির সেবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের কাছে বিক্রি করে ব্যাপকভাবে লাভবান হওয়ারও সুযোগ রয়েছে। আর ঐ দেশ তিনটিকে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের সুযোগদানের বিষয়টিকে বাংলাদেশ তাদের সাথে বাণিজ্যিক লেনদেনের দর কষাকষিতেও চমত্কার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করি। অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে রেলপথকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ব্যবহার করতে না পারার বা না করার ব্যর্থতা। চট্টগ্রাম ও মংলা উভয় বন্দর থেকেই রেলযোগে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকলেও সেটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে যে, এর সাথে সড়ক পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ীদের অস্বচ্ছ গোপন যোগসাজশ ও কারসাজি রয়েছে। অবশ্য রেলের ব্যাপারে এটাই একমাত্র অভিযোগ নয়। রেলের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি ও অদক্ষতা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি রয়েছে রাষ্ট্রের অঙ্গীকারাবদ্ধ নীতিগত সমর্থন। বাণিজ্য ব্যবস্থায় বর্ধিত গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে রেলযোগে সহজে ও তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে হলে এই নীতিগত সমর্থন শুরু জরুরিই নয়— বস্তুত এর কোনো বিকল্পও নেই। বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আচরণ ও সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এসব বিষয় সম্পর্কে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই পর্যাপ্ত জানাশোনার অভাব। অর্থাত্ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের রীতি-নীতি, বিধিবিধান, সুযোগ-সম্ভাবনা, ন্যায্যতা-অন্যায্যতা ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের হাতে থাকা তথ্য-উপাত্ত ও ধারণার পরিসর অনেকটাই সীমিত। ফলে এ সীমিত জানাশোনার ভিত্তিতে ব্যবসায়ের আন্তর্জাতিক শরীকদের সাথে চিতিয়ে দর কষাকষি করার মতো দক্ষতা, যোগ্যতা ও সামর্থ্য এখনো পরিপূর্ণ মাত্রায় গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তদুপরি এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকেও বর্ধিত আগ্রহ উদ্যম ও মনোযোগ সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে। বলা হচ্ছে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ খুবই ভালো করছে। এ ক্ষেত্রে আরো দু’টি অভিমত যুক্ত করা যেতে পারে, যার একটি হচ্ছে এই যে : বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে গতিতে সামনের দিকে এগুচ্ছে, এ ক্ষেত্রে প্রকৃত সম্ভাবনা তারচেয়েও অনেক বেশি। অতএব সে সম্ভাবনাগুলোকে দ্রুত চিহ্নিত করে এসবের সমাধানপূর্বক এগুতে পারলে বাংলাদেশ অচিরেই আরো বহু ক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতির রেফারেন্স হিসেবে গণ্য হতে পারবে। দ্বিতীয়ত: দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে যেসব কাঠামোগত ত্রুটি ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে যদি সেগুলো অর্ধাংশও দূর করা সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার আগামী এক দশকের মধ্যে অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়ে যাবে বলে আশা করা যায়। আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার এই কাঠামোগত ত্রুটি ও প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের তালিকায় সর্বাগ্রেই আসতে পারে বাণিজ্য ব্যবস্থা সহজীকরণের বিষয়টি। আর সম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেটি করা সম্ভব হলে (যা করতে না পারার কোনোই কারণ নেই), তা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকেই উঁচুতে নিয়ে যাবে না—দেশের অর্থনীতির উপযোগকে এর সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বার্থের অনুগামী করে তুলতেও সহায়ক হবে। জবাবদিহিতাপূর্ণ দায়িত্বশীল সংস্কার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধীনেও বাণিজ্য ব্যবস্থার গণমুখী রূপান্তর অনেকাংশেই সম্ভব বলে মনে করি। [লেখক:পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন]