শাহবাগ আন্ডারপাস কি ফলকেই ঝুলিয়া থাকিবে

শাহবাগে একটি আন্ডারপাস নির্মাণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হইয়াছিল ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর। সেই ঘোষণাটিও এমনি এমনি আসে নাই। ইহার পিছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষার্থীর করুণ আত্মদান আছে। আছে স্বজনের অশ্রু আর সহপাঠীদের সহিংস প্রতিবাদ-বিক্ষোভের দীর্ঘ ইতিহাস। রাজধানীর ব্যস্ততম এই সংযোগস্থলটিতে বাসের চাকায় পিষ্ট হইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করিয়া বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করিয়াছিল। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছিল। বন্ধ করিয়া দিয়াছিল বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সকল সড়ক। অব্যাহত আন্দোলনের মুখে সিটি কর্পোরেশনের তত্কালীন মেয়র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের উপস্থিতিতে তখনই শাহবাগে আন্ডারপাস নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয় নাই। এমনকী আরেকজন শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরিয়া না পড়িলে হয়তো সেই প্রতিশ্রুতির কথাও বিস্মৃত হইতেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ ২০১২ সালের ২৮ আগস্ট এই শাহবাগেই সড়ক দুর্ঘটনার বলি হইতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তৌহিদুজ্জামানকে। ইহার প্রতিবাদে আবারও উত্তাল হইয়া ওঠে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। এই প্রেক্ষাপটে তত্কালীন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক শাহবাগ আন্ডারপাসের উদ্বোধন করিয়াছিলেন। একই সাথে মোট ৩ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই আন্ডারপাস নির্মাণের ঘোষণাও দেওয়া হইয়াছিল। সিটি কর্পোরেশনের সিডিউল অনুযায়ী, ইহার নির্মাণ কাজ ২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর শুরু হইয়া পরবর্তী ছয়মাসের মধ্যে সমাপ্ত হইবার কথা। দুর্ভাগ্যের বিষয় হইল, ইতিমধ্যে প্রায় এক বত্সর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এখনও নির্মাণকাজই শুরু হয় নাই। তাই বলিয়া তো আর দুর্ঘটনা থামিয়া নাই। একের পর এক মর্মান্তিক মৃত্যুর সাক্ষি হইয়া নির্মম পরিহাসের মতো নামফলকটিই কেবল ঝুলিয়া আছে শাহবাগের চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই চৌরাস্তায়। কাজটি কতোখানি জরুরি ও অপরিহার্য তাহা নূতন করিয়া ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। প্রশ্ন হইল, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এই গাফিলতি কেন? ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলিয়াছেন যে, ওয়াসা, তিতাস, বিটিসিএল, বিটিআরসি ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয় নাই। প্রথম কথা হইল, এইগুলি কোনো জটিল বা সমাধান অযোগ্য সমস্যা নহে। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের সমস্যা যে হইতে পারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাহা অজানা থাকিবার কথা নহে। সদিচ্ছা ও সংকল্প থাকিলে তাহার সমাধানও কঠিন ছিল না। কিন্তু উদ্বোধন যিনি করিলেন তিনি বা তাহারা যথাসময়ে সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নিলেন না কেন? ভুক্তভোগীরা বলিতে পারেন যে, ইহাতে বিস্মিত হইবার কী আছে। ফলক উন্মোচন কিংবা উদ্বোধনে তাহাদের যতো আগ্রহ, কর্মসম্পাদনে তাহার সিকি ভাগ মনোযোগ থাকিলে তো আজ জনগণকে পদে পদে এতো দুর্ভোগের সম্মুখীন হইতে হইত না। মন্ত্রীরা অপ্রয়োজনেও যে যত্রতত্র বহু ব্যয়বহুল প্রকল্পের উদ্বোধন করিয়া থাকেন তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। তবে শাহবাগের বাস্তবতাটি একেবারেই ভিন্ন। দুই-দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল-সংলগ্ন এই স্থানটিতে ইতিমধ্যে অকালে বহু প্রাণ ঝরিয়া পড়িয়াছে। আর অনভিপ্রেত এইসব মৃত্যুকে কেন্দ্র করিয়া কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে— তাহাও এতো তাড়াতাড়ি বিস্মৃত হওয়া উচিত নহে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শুধু যে অসংখ্য গাড়ি ভাঙচুর হইয়াছে তাহাই নহে, ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যস্ততম সংযোগস্থলটি অবরুদ্ধ থাকিবার কারণে স্থবির হইয়া পড়িয়াছে জনজীবন। অনুরূপ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি নিশ্চয় কাহারও কাম্য হইতে পারে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা থাকিতেই পারে। তাহা সমাধান করাই তো কর্তৃপক্ষের কাজ। আমরা অনতিবিলম্বে শাহবাগ আন্ডারপাসটি মূর্তমান ও সচল দেখিতে চাই।