হিমালয় দুহিতা কোন পথে
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৩
সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচন লইয়া নূতন দুর্বিপাকের সূচনা হইয়াছে হিমালয় দুহিতা নেপালের রাজনীতিতে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচনের ফল গণনা বন্ধ করিবার দাবি জানাইয়াছেন মাওবাদী নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্পক কুমার দাহাল ওরফে প্রচন্ড। বৃহস্পতিবার প্রদত্ত এক বিবৃতিতে তিনি নির্বাচনী ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্নীতিপূর্ণ ছিল বলিয়া অভিযোগ উত্থাপন করেন। নির্বাচনের ফলাফল তাহার দল মানিয়া লইবে না বলিয়াও জানাইয়া দিয়াছেন প্রচন্ড। এমতাবস্থাতে গত সাত বত্সর ধরিয়া এক ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে থাকা দেশটির পরিস্থিতি আরও এক দফা জটিল হইয়া উঠিল বলিয়া মনে হইতেছে।
নূতন শতাব্দী কি দারুণভাবেই না সূচনা করিয়াছিল নেপাল। প্রথম কয়েক বত্সর মাওবাদীদের সহিত সরকারি বাহিনীর সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে চলিলেও, ২০০৫ সাল হইতেই দেশটিতে অদৃষ্টপূর্ব রাজনৈতিক উন্নয়ন দৃশ্যমান হইতে থাকে। উল্লেখিত বত্সরটিতেই বহু প্রাচীন রাজতন্ত্র ছাড়িয়া প্রজাতন্ত্রের পথে পা বাড়ায় নেপাল; দুই বত্সর পরে যাহা কার্যকর হইয়া যায়। পরের বত্সরেই নূতন চুক্তির বরাতে মাওবাদীরা অস্ত্র সম্বরণ করিলে থামিয়া যায় সশস্ত্র সংঘাত। ২০০৭ সালের শুরুতে মাওবাদীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও যোগ দেয়, যাহা ছিল ইতিপূর্বে অচিন্তনীয় একটি বিষয়। নেপাল ছিল পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। রাজনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতাতে একই বত্সরে রাজনীতি হইতে ধর্মকে সরাইয়া লইবার ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করে দেশটি। সেই বত্সর নেপাল নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ ঘোষণা করে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন, যাহা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সংযোজন। কিন্তু এতকিছু হইয়াও যেন কিছু হইল না নেপালে। রাজনীতির এলিটেরা কিছুতেই পরস্পরকে মানিয়া-বুঝিয়া লইতে পারিতেছেন না। গত সাত বত্সরে ছয়টি সরকার আসিয়াছে কিন্তু এখন অবধি জাতিকে একটি সংবিধান উপহার দিতে পারিতেছে না রাজনীতিকেরা। ইহাকে কেবল নীতি-আদর্শের লড়াই বলিয়া চালাইয়া দেওয়া মুশকিল।
নির্বাচনের পূর্বে নানান স্থানে ভোট বাক্স ও ব্যালট পেপার হাওয়া হইয়া যাইবার অভিযোগ আনিয়াছেন প্রচন্ড। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগ গুরুত্বের সহিত লইতে হইবে। আবার নির্বাচনে হারিবার আলামতের সহিত এই অভিযোগের কোন সংযোগ আছে কিনা তাহার দিকেও দৃষ্টি দেওয়া যাইতে পারে। উল্লেখ্য, জরিপে নেপালী কংগ্রেস ও ইউনাইটেড মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট পার্টিকে মাওবাদীদের অপেক্ষা অগ্রগামী দেখানো হইয়াছে। ঘটনা যাহাই হউক পরিস্থিতি নেপালে অবনতির দিকেই যাইতেছে। ইহার পরিণতিতে পৌনে তিন কোটি নেপালীর জীবন যে আরও এক দফা অনিশ্চয়তাতে পড়িবে সন্দেহ নাই। নেপাল টিকিয়া থাকে পর্যটন, রেমিট্যান্স ও বিদেশী সাহায্যের উপরে। রাজনীতির অনিশ্চয়তা এই দিকগুলিকেও দিনকে দিন অনিশ্চিত করিয়া তুলিতেছে। রাজনীতির অনিশ্চয়তার সুযোগে উগ্রবাদী ও নানা ধরনের অরাজনৈতিক সশস্ত্র গ্রুপের তত্পরতা বাড়িয়া চলিয়াছে দেশটিতে। পরিস্থিতি উন্নয়নের ব্যাপারে রাজনীতিকেরা দ্রুত সহমত না হইলে নেপাল নূতন নূতন ঝঞ্ঝাটের মধ্যে পড়িতেই থাকিবে। মাত্র পাঁচ-ছয় বত্সর পূর্বেই আমাদের নিকট-প্রতিবেশী এই দেশটি রাজনৈতিক উন্নয়নের দিক হইতে সারা পৃথিবীর কাছে উদাহরণ হিসাবে পরিগণিত হইতে শুরু করিয়াছিল। অথচ একই দেশ এখন আবার সকল অর্জন বিসর্জন দেওয়ার পথে হাঁটিতেছে বলিয়া মনে হইতেছে। ইহা অতি আক্ষেপের বিষয়। নেপালী রাজনীতিকেরা নেপালী জনগণের দিকটা বুঝিতে শুরু করিবে কিনা তাহা কে বলিতে পারে?