[ রা জ নী তি ]
চরম নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে আবর্তিত বাংলাদেশের সবকিছু
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৫১
রাজনীতি বিকশিত না হয়ে শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির দিকেই যাচ্ছে। রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তির চাতুর্যায়ন ঘটেছে এ দেশে। সেই চাতুর্যায়ন শানিত ও বিস্তৃত হতে হতে সর্বগ্রাসী হয়ে পুরো জাতিকেই আশ্রয় করেছে। এখন পুরো জাতিই চাতুর্যায়িত। বুদ্ধিবৃত্তির ভেতর নৈতিকতার একটি জায়গা থাকে। চাতুর্যে সেই জায়গাটি থাকে না। নৈতিকতাই সামাজিক দায়বদ্ধতার পূর্বশর্ত। চাতুর্যে সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে না। সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকলে সামাজিক সংহতি থাকে না। সমাজের অন্তঃসার ফুরিয়ে যায়। তখন একটি আপাতসমাজে বিরাজমান থাকে। ব্যক্তি তখন অন্তর্গতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; সমাজের সঙ্গে অভিনয় সম্পর্কিত হয়। সমাজের ক্ষয়ে যাওয়া অন্তঃসারহীন আচার আনুষ্ঠানিকতা তখন প্রবলভাবে আদৃত হয়। সেইসব ক্ষয়ে যাওয়া অন্তঃসারহীন আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে অর্থনীতির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তৈরি হলেও ব্যক্তি, (সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি এ ক্ষেত্রে, যা বর্ণিত হল উপরে, সমাজ বিচ্ছিন্ন্ ও আত্মকেন্দ্রিক হওয়ায়) ঐসবের আদৃতির মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে সমাজে দৃঢ়তর করে এবং সেই ধারায় সামাজিক এলিটে পরিণত হবার চেষ্টায় রত হয়। প্রভাবশালী ও নেতৃত্বশালী হয়। তারাই পরিচালনা করে রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। ফলে রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হয় নৈতিকতা বর্জিত ও সমাজস্বার্থ বিপরীত। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এমনই।
নৈতিকতাহীন আত্মকেন্দ্রিকতা একই সঙ্গে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। সব্ ধরনের বিধান ও সংবিধানের সঙ্গে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। এটি একাকী ব্যক্তির আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থবাদী, আগ্রাসী, আহরণবাদী, স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী প্রকৃতি ও আচরণের সঙ্গে স্ঙ্গতিপূর্ণ। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে কিছু একটা করে ফেলা কারো উচিত নয়। যার দৃষ্টান্ত দেখেছি অতীতে। তখন ন্যায়নীতি বিবর্জিত একটি চরম নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র অভ্যন্তরে উপস্থিত ও অবস্থিত সব প্রতিষ্ঠান তখন বন্ধ্যায়িত হতে বাধ্য। তখন রাষ্ট্র একটি কারাগার আর প্রতিষ্ঠানগুলো গণবিরোধী অক্টোপাসে পরিণত হয়। এগুলোর গন্তব্য ও লক্ষ্য গণবিরোধী, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ঘটনা ঘটে থাকে। তখন ব্যক্তি একা ও সকল সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোয়। তখন ব্যক্তি স্বৈরাচার হয়ে যায়। কারণ, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ আপোষী ও কৌশলী। ব্যক্তি স্বৈরাচারের জায়গা ও অধিষ্ঠান এখানে ভুল ও বিভ্রান্তিকর মূল্যবোধের কারণে কোন চতুর ও অভিনয় কুশলী মানুষ যখন কোন কারণে নেতৃত্বে এসে পড়ে তখন সে এরকম পরিপার্শ্বে সহজেই নেতৃত্বের আপেক্ষিক স্থায়ী জগদ্দল তৈরি করে ফেলতে পারে। আর আপোষী ও কৌশলসর্বস্ব মানুষের সমাগম তাকে ঘিরে ঐ বিকৃত স্বৈরাচারী নেতৃত্বের জগদ্দলকে উত্তরোত্তর শক্ততর করে।
নৈরাজ্য ও সামাজিক অনিরাপত্তা পরস্পরের সঙ্গী ও সহযাত্রী। তখন যেমন সামজিক নিরাপত্তার নীতি ও রসদের প্রচার ও প্রকাশ অবারিত তেমনি তা মিথ্যে ও প্রলাপ বৈ নয় ; মিথ্যে ও প্রলাপ ছাড়া অন্য কিছু নয়। বাংলাদেশ এখন এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজিত। বাংলাদেশে গণজাগৃতি সনাতন মূল্যবোধকে ছাড়িয়ে যায়নি। ঘন ঘন রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলশ্রুতিগত কারণে গণজীবনে আত্মকেন্দ্রিক অধিকারবোধ জাগ্রত হলেও সিভিক সংস্কৃতি থেকে দূর বিচ্ছিন্ন থাকায় অন্যের প্রতি দায়বোধ বিকশিত হয়নি। ফলে প্রতিক্রিয়াশীলতার নতুন রূপ সৃষ্টি হয়েছে যা দৈনন্দিন জীবনে সংঘাতপ্রবণতাকে অবাধ ও অব্যাহত করেছে । সামন্তকালের প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে এটি স্পষ্টতই আলাদা এবং অধিকতর অসহনীয় ও বিকৃত। সামন্তকালের স্থবির শৃংখলা কাঠামোর মধ্যে বিরাজিত প্রতিক্রিয়াশীলতার একটি নির্ধারিত ধারা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘন ঘনত্বগত এ প্রতিক্রিয়াশীলতা যেমন বহুমুখী তেমনি অনির্ধারিত এবং দিকনির্দেশনাহীন। এরকম নৈরাজ্যিক দিকনির্দেশনাহীন প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিপার্শ্বে সনাতন রাজনৈতিক রূপকের ব্যবহারের অবসর বিস্তৃত ও গভীর হয়ে থাকে। পোস্ট কলোনিয়াল এলিটিস্টিক গোষ্ঠিতা অধ্যুষিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এটির ব্যবহার তাই অবাধ ও উত্তুঙ্গ হওয়ার মত করে বিরাজ করে। এর ফলে বার বার গণবিভ্রান্তি যেমন অনিবার্য হয় তেমনি ভয়াবহভাবে আত্মবিরোধী হয় এবং রাজনৈতিক কৌশলসর্বস্বতার ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করে রাখে । আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং দেশীয় গোষ্ঠী রাজনীতি এ কারণে সনাতন রাজনৈতিক রূপক (যেমন ভাষা, যেমন ধর্ম) এ দেশে নিয়মিত ব্যবহার করে থাকে। একই কারণে গণবিভ্রান্তি বিচিত্র ও তীব্র হয়ে থাকে। উন্নয়ন কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতির বাইরে এই বিস্তৃত পরিপার্্শ্ব নিয়ত মন ধ্বংসশীল একটি ধারাকে অব্যাহত করে রেখেছে। জাগৃতির জায়গাগুলোকে তা উল্লম্ফনময় ও ঝড়ো করে রাখছে। ফলত, চেতনার সুস্থ বিকাশ কৃত্রিম অতিতাত্ত্বিকতায় আক্রান্ত হচ্ছে। সামাজিক সংহতি ও জাতীয় সংহতি যা জাতীয়তাবাদ অধ্যুষিত স্বাধীনতার পূর্বশর্ত তা বার বার ভূলুণ্ঠিত ও বিপর্যস্ত হচ্ছে। ফলে নির্বাচনে গণজাগৃতির প্রতিফলন ঘটে না। গণবিভ্রান্তি ও নির্বাচন একাকার হয়ে যায়। জনপ্রিয়তার এক ধরনের প্রহসন পরিলক্ষিত হয় এতে। যথার্থ গণতন্ত্রে নির্বাচন গণজাগৃতির গুণগত মান ও নির্বাচনের গুণগতমান পরস্পরের সমান হয়। বাংলাদেশে এমনটা কোনদিনই হয়নি। নির্বাচন বরাবর সনাতন রাজনৈতিক রূপক দ্বারা অবরুদ্ধ ও অর্থহীন থেকে গেছে। এরকম টানাপোড়েনের মাঝেও বাংলাদেশে সামাজিক গণতন্ত্র প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশ অগ্রসর যদিও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র এখনো সুদূরপরাহত। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র আটকে আছে উ্দ্দেশ্যমূলকতার কাছে্। এই উদ্দেশ্যমূলকতা রকমভেদে একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র যথার্থভাবে অর্জিত হবার পূর্বশর্ত হচ্ছে সনাতন রাজনৈতিক রূপক থেকে মুক্তি। যত দিন তা না হচ্ছে তত দিন বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র যতটা শ্লোগানের উচ্ছ্বাস হয়ে থাকবে ততটাই থাকবে শূন্যগর্ভ হয়ে। আর তার মাশুল গুনতে হবে প্রধানত সাধারণ নাগরিককে। বাংলাদেশে রাষ্ট্র এখনো অপরিণত ও দোদুল্যমান। সামাজিক অনিরাপত্তা ও রাষ্ট্র একই সঙ্গে বিরাজ করছে এখানে। একই কারণে বাংলাদেশে রাষ্ট্র এ থেকে মুক্ত নয়।
বাংলাদেশে নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক গণজাগৃতির সমান স্তরে আনবার পথের বাধাগুলো নিশ্চিহ্ন করতে না পারলে এ দেশে গণতন্ত্র কোনদিনই ফলপ্রসূ হবে না। এর জন্যে প্রয়োজন আপেক্ষিক আনুষ্ঠানিকতা সমৃদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক গণপ্রক্ষ প্রশিক্ষণের ভারসাম্যময় ধারাবাহিকতা, অনানুষ্ঠানিক শক্তির আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তর। নৈর্ব্যক্তিক নেতৃত্ব কাঠামো সৃষ্টি, ব্যক্তিক অন্ধ ভক্তির চূড়ান্ত নির্বাসন, সর্বমাত্রিক যুক্তির অধ্যুষণা, সামাজিক স্তর নির্বিশেষে সর্বত্র বিবেচনা ও বিশ্লেষণের অবাধ ও অনবরত ব্যবহার। এগুলো আপাতচোখে খুব জটিল ও দুর্বোধ্য মনে হলেও স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল প্রক্রিয়াকে নিশ্চিত ও সচল করতে পারলে এসবই একই প্রক্রিয়ার অধীন হয়ে সফল গণতন্ত্রের পথের উপাদান হতে পারে। এবং এ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা স্বতঃস্ফূর্ত ও নিশ্চিত হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্র উপমহাদেশীয়তার একটি দ্বন্দ্ব আছে যা তার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যুদস্ত করে চলেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তর রাজনীতি এই দ্বন্দ্বশাসিত। সেজন্যে বাংলাদেশের রাজনীতিকে উপমহাদেশীয় রাজনীতির নিগড় থেকে মুক্ত হয়ে ব্যাপ্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্তরে উপনীত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সার্ককে শক্তিশালীকরণ একটি বিকল্প হতে পারে অথবা আরো এ ধরনের অন্য বিকল্প চিহ্নিত করা যেতে পারে। উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক কাঠামোয় কোন জাতীয় রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব আত্মঘাতী সম্ভাব্যতায় ভুগতে থাকবে। এরফলে স্বাধীনতা ও স্বস্তি বাংলাদেশে কখনই পরস্পর সম্পৃক্ত হবে না। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বল্গাহীন দ্রুতায়ন অব্যাহত থাকবে, গণজাগৃতির ভারসাম্য আসবে না। ফলে সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তি ও সুস্থ বুদ্ধিজীবী রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব করবে না। বহু ব্যক্তিত্বের স্বৈরাচার অব্যাহত থাকবে এবং তারা অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে থাকবে। এ দেশের মেধায় ঘাটতি আছে এমন রাজনীতিক ও রাজনৈতিক নেতৃেত্বর (?) একটি বড় অংশ তাদের নেশায় বুঁদ হয়ে সৃজনশীলতাহীন অনুসরণের রাজনীতি চর্চায় অন্ধ হয়ে আছে। তারা দেশ পরিপ্রেক্ষিতের বাইরে একটি ঔদ্ধত আচরণ ধারার আঙ্গিকে রাজনীতিকে বুদ্ধিবৃত্তি শূন্য করে রাখার বিষয়ে স্বতত সক্রিয়। এ দেশের মডারেট নাগরিকদের তটস্থ করে রাখাই যেন তাদের ব্রত যাতে করে নক্সা মত কাজ চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়।্ এদের হাত থেকে মুক্তি দেশের স্বাধীনতাকে চরিতার্থ ও স্বস্তির বিষয় করে তুলতে পারবে।
লেখক:প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান
রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও গণবিশ্ববিদ্যালয়।