মাদকের দানবীয় থাবা

খবরটি পাঠ করিয়া সকলেই শিহরিত হইয়াছেন। কল্পনাকেও হার মানাইয়াছে বাস্তবতা। মাদকাসক্তির পরিণাম আমাদের অজানা নহে। প্রতিনিয়তই আমরা তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া চলিয়াছি নানাভাবে। তবে গত বৃহস্পতিবার সিলেটের গোলাপগঞ্জে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে তাহা অবিশ্বাস্য শুধু নহে, সহ্যাতীতও বটে। মাদকের টাকার জন্যে ত্রিশোর্ধ্ব যুবক ফুরুখ নির্দয়ভাবে খুন করিয়াছেন নিজের মা, বোন ও বৃদ্ধা নানীকে। আপন সন্তানের জন্য মানুষ হাসিমুখে জীবন দিতে পারে— এমন দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি। অথচ ফুরুখের দানবীয় হিংস্রতা হইতে রক্ষা পায় নাই নিজের ৫ বত্সর বয়সী একমাত্র শিশুপুত্রও। কোনো মানুষের পক্ষে যে এই ধরনের বর্বরতা সম্ভব নহে তাহা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিবেন। তাহা হইলে কাঠমিস্ত্রি ফুরুখ কাজটি করিল কীভাবে? উত্তর সহজ। দৃশ্যত ফুরুখ মাদকসেবী হইলেও আসলে মাদকই ফুরুখকে খাইয়াছে। সম্পূর্ণ ধ্বংস করিয়া দিয়াছে তাহার ভিতরের প্রকৃত মানুষটিকে। তাহাকে পরিণত করিয়াছে মানুষ নামের এক দানবে। মাদক যে মানুষকে দানবে পরিণত করে সিলেটের ঘটনাটিই তাহার একমাত্র উদাহরণ নহে। মাত্র তিনদিন আগে, গত ১৮ নভেম্বর, বরিশালের গৌরনদীতেও কলেজপড়ুয়া মাদকাসক্ত তরুণের অনুরূপ বর্বরতার শিকার হইয়াছে ৪টি শিশু। তন্মধ্যে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারাইয়াছে ৯ বত্সর বয়সী একটি শিশু। রাজধানীতে মাদকাসক্ত কিশোরী কন্যার হাতে পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার সস্ত্রীক নিহত হইবার ঘটনাও বেশিদিন আগের নহে। এই ধরনের উদাহরণ অনেক। মহামারীর মতো দেশের সর্বত্রই ছড়াইয়া পড়িয়াছে মাদকের দানবীয় থাবা। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সারা দেশের মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইহার মারাত্মক বিষক্রিয়া অনুভব করিতেছেন দীর্ঘদিন যাবত্। ইহাতে দুইটি বিষয় স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। প্রথমত, মাদকের আগ্রাসন ইতিমধ্যে সর্বগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। দ্বিতীয়ত, এই দানবকে মোকাবিলার জন্য যেই ধরনের প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাদি প্রয়োজন ছিল হয় তাহা অনুপস্থিত অথবা অপ্রতুল ও অকার্যকর। প্রতিরোধের পথ মূলত দুইটি। প্রথমত, মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকানো। হাতের কাছে মাদকের প্রলোভন থাকিলে কোমলমতি কিশোর-তরুণরা সহজেই সেই ফাঁদে পা দিতে পারে। অতএব, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা ভাঙিয়া দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু কাজটি যে সহজ নহে তাহার অকাট্য প্রমাণ হইল, কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলিও হিমশিম খাইতেছে। অতএব, আমাদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বাস্তবতা হইল, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র, জনবহুল ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার দেশগুলিতে মাদকের অনুপ্রবেশ কার্যকরভাবে রোধ করা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। সেই ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার একমাত্র যে-পথটি খোলা থাকে তাহা হইল ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়িয়া তোলা। এই ক্ষেত্রে আমাদের সামর্থ্য ও দক্ষতা প্রমাণিত। জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য হইবে দুইটি। প্রথমত, মাদক ব্যবহারের মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা; দ্বিতীয়ত, মাদকাসক্তদের সুচিকিত্সা ও পরিচর্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রদান। পাশাপাশি, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী এই ধরনের বিশেষায়িত চিকিত্সা সেবা সমপ্রসারণ করাও অত্যন্ত জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। মাদকাসক্ত সন্তান বা স্বজনদের লইয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলির অসহায়তা আকাশচুম্বী। চিকিত্সার দুষপ্রাপ্যতা কিংবা ব্যয়বহুলতাজনিত প্রবল আর্থিক চাপ তো আছেই, পাশাপাশি অজ্ঞতাজনিত বিভিন্ন আত্মঘাতী পদক্ষেপের বিষয়টিও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হইয়া প্রতিকারের আশায় ফুরুখের পরিবার তাহাকে বিবাহ করাইয়াছে। পুলিশেও সোপর্দ করিয়াছে তিনবার। কিন্তু অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া তাহার স্ত্রী গৃহত্যাগ করিয়াছে। আর মাত্র কয়েকদিন আগে যেই মা জামিনে তাহাকে ছাড়াইয়া আনিয়াছিল সেই মাকেই জীবন দিয়া তাহার প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইয়াছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলিয়াছেন, বিবাহ কিংবা পুলিশে দেওয়া কোনো সমাধান নহে। তাহাদের দরকার সর্বোচ্চ ও যথাযথ চিকিত্সা। দরকার মানবিক সহূদয়তা ও পরিচর্যা। মনে রাখিতে হইবে যে, মাদকাসক্তদের নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কারণ মাদক তাহাদের ভয়ঙ্কর দানবে পরিণত করে।