[ রা জ নী তি ]
নির্বাচনের ট্রেন চলতে
শুরু করেছে
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০১৩, ২২:২৪
আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিকদের হাতে এখন গণতন্ত্রচর্চা ইচ্ছেমতির খেলা বা ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে। এদেশে দৃশ্যমান গণতান্ত্রিক আচরণ হিসেবে টিকেছিল শুধু নির্বাচন। রাজনীতির খেলুড়েরা একে নিয়েই এখন লোফালুফি করছেন। পাশাপাশি দেশবাসীকে অস্বস্তিতে ফেলছেন এবং হতাশ করছেন। নানা প্রশ্নের মধ্য থেকেও অনড় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকার গঠন করে নির্বাচনের দিকে প্রবেশ করেছেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে- তফসিল ঘোষণা করা হবে এ সপ্তাহের মধ্যেই। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন আঠারো দলীয় জোট জানিয়ে দিয়েছে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করলে সে মুহূর্ত থেকেই অচল করে দেয়া হবে দেশ। অর্থাত্ গণতান্ত্রিক আচরণের টিকে থাকা একমাত্র চিহ্ন নির্বাচন এখন দারুণভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি।
গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের নির্দেশিত পথ ধরেই হবে। সেখানে কোনো ছল-চাতুরির অবকাশ নেই। গণতন্ত্রকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করারও সুযোগ নেই। দুর্বুদ্ধি থাকলে অনেক রকম ছলই করা যায়। যেমনটি করেছিলেন এককালের লৌহমানবখ্যাত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইউব খান। সামরিক লেবাস খুলে গণতন্ত্রী হওয়ার ছল করেছিলেন। গণতন্ত্রের এক অদ্ভুত ভার্সন ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ চালু করেছিলেন। তাঁবেদার মৌলিক গণতন্ত্রী ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্টদের ঘাড়ে চেপে পাকিস্তানের বেসামরিক প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। তারপর বিক্ষুব্ধ গণমানুষের তীব্র জোয়ারে লৌহমানবকেও ভেসে যেতে হয়েছিল। ইতিহাসের কোনো শিক্ষাই আমরা গ্রহণ করি না। রঙিন কাঁচে বর্তমানকেই রঙিন দেখি। তাই আওয়ামী লীগ সরকার তাঁর অন্তিম সময়ে এসেও নির্বাচন নিয়ে নানা ছলে দাঁড়িয়াবাধা খেলে যাচ্ছে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে দলীয় ইচ্ছে পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে। অন্যদিকে অভিন্ন চরিত্রের ক্ষমতার রাজনীতিতে বিচরণ করা বিএনপিও দলীয় ইচ্ছে পূরণের জন্য গণতান্ত্রিক মননশীলতার বদলে আন্দোলনের নামে স্বেচ্ছাচারিতাকেই বেছে নিয়েছে। ইতিহাসের নির্দেশিত পরিণতি নিয়ে কেউ ভাবছে না।
গণতন্ত্রকে সুরক্ষা করার স্বার্থে নির্বাচনকে পরিচ্ছন্ন করা ও বিতর্কমুক্ত রাখা সকল পক্ষীয় রাজনীতিকদের জন্যই জরুরি কর্তব্য ছিল। এজন্য চাই একটি সমঝোতার পথে আসা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমরা আপোসহীন ও অনড় থাকাটাকেই গৌরবের মনে করি। আর এই গৌরবের অহংকার ধারণ করতে গিয়ে দেশ ও জাতি কতটা বিপন্ন হলো তা নিয়ে কোনো ভাবনা হলো না আমাদের জননেতা-নেত্রীদের। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকার সুবিধায় এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে সংবিধান ঘষে-মেজে যা করেছে একই সুবিধায় থাকলে বিএনপি যে হুবহু তাই করতো অতীত অভিজ্ঞতায় দেশবাসী তা বিশ্বাস করে। একারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই বিবদমান পক্ষ জনগণকে সামান্য মূল্য দিতে চাইলে যার যার অচলায়তন ভেঙে আপোস ফর্মূলায় পৌঁছতে পারতো। কিন্তু তা সম্ভব হওয়ার নয়। বিএনপি নেত্রী আপোসহীন খেতাবে ভূষিতা। খেতাবের অমর্যাদা সেখানে হবে না। তাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে গোঁ ধরে বসে রইলেন। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবিধায় সংসদে সংবিধান কাটা-ছেঁড়া করে এবং এর আইনী রূপ দিয়ে আওয়ামী লীগ বাতিল করে দিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা। বিএনপি ভালো করেই জানে তারা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেছে তাতে হাজার আন্দোলন সংগ্রাম করে, মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করেও এই পথে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগও জানে জোড়াতালির সর্বদলীয় সরকার দিয়ে নির্বাচন করে তৈরি সরকারকে স্থায়িত্ব দেয়া যাবে না। একারণেই দরকার ছিল মধ্যস্থতার। কিন্তু সে পথ মাড়ানোর কোনো প্রয়োজন মনে করলো না কোনো পক্ষ।
নানা সহিংস হরতাল অবরোধ দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলা হলো। দেশের অর্থনীতির মূলে আঘাতের পর আঘাত হানা হলো। এতকিছুর পরও যে সরকার নির্বাচনের ট্রেন প্রস্তুত করলো তার লাইনে এখন দারুণ দোদুল্যমানতা। আঁকাবাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ট্রেন আদৌ গন্তব্যে পৌঁছবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
গণতন্ত্র সুরক্ষা এবং দেশ ও জনগণের প্রতি ভালোবাসা থাকলে দলীয় লাভালাভের বৃত্তে থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে কিছুটা বেরিয়ে আসতে পারতেন আমাদের জননেতা-জননেত্রীরা। নানা কৌশলে না গিয়ে একটি সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারতেন। তা না করে সরকার পক্ষ সরকারি সুবিধা ও শক্তিতে সংবিধানের বাতাবরণে প্রধান বিরোধী দলকে ছাড়াই সর্বদলীয় সরকার করে ফেললো আর বিএনপি নেতা ঘোষণা দিয়ে দিলেন তফসিল ঘোষণার ক্ষণ থেকেই তারা অচল করে দেবে দেশ। অর্থাত্ জননেতারা নিজেদের বিজয় অর্জন করার জন্য দেশবাসীর ঘাড়ে নামিয়ে দেবেন খড়গ। আবার অরাজকতার অন্ধকারে ডুববে দেশ। এই অরাজকতার হরর ছবির পরিচালক প্রযোজক আমাদের দুই প্রধান দল। উভয়েরই লক্ষ্য সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার। এভাবেই বিপন্ন হবে মানুষ। গণতন্ত্রের শিখা দুর্বল হতে হতে অতি ক্ষীণ হয়ে পড়বে।
এই অবস্থার পরবর্তী পরিণতি কি আমাদের ক্ষমতান্ধ রাজনীতিকরা ভেবে দেখেছেন? অতীতে এদেশে বহুবার বহু অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গণতন্ত্রের পথ রুখে দাঁড়িয়েছে অরাজনৈতিক শক্তি। সেই অতীতের পুনরাবৃত্তি যদি ঘটে তাহলে পুরো দায় নিতে হবে বিবদমান স্বার্থবাদী রাজনীতির সাথে যারা জড়িত তাদের। সাধারণ জনগণ—আমাদের রাজনীতিকরা নির্বাচনের আগে যাদের একবার অন্তত মানুষ বলে বিবেচনা করেন তাদের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে রাজনৈতিক দলগুলোর এবং নেতা-নেত্রীদের। রাজনৈতিক দলগুলোতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। নির্বাচন বানচালের জন্য বিএনপি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ সামপ্রতিককালের হরতাল অবরোধ অনেক বেশি সহিংস হয়েছে। অনেক মর্মান্তিক জীবনহানি হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ। আর এর জন্য বিএনপি বেশি সমালোচিত হয়েছে জামায়াত প্রভাবিত হয়ে যাওয়ায়। সহিংসতার জঙ্গিরূপ জামায়াত সংশ্লিষ্টতার কারণেই হয়েছে বলে মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খালেদা জিয়ার জনসভায় জামায়াত শিবির প্রাধান্য আর বিএনপি নেতানেত্রীর জামায়াত তোষণ অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাই অরাজকতার ফলাফলে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা যদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয় তা হলে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়বে বিএনপি। দলের ভেতরে নানা স্তরের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হবে।
আওয়ামী লীগও যে খুব স্বস্তিতে থাকবে তা নয়। যদি জরুরি অবস্থার দিকে না যেতে হয় তবে জোড়াতালির সর্বদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করবে। প্রধান বিরোধী দল না থাকায় নিশ্চিত করে বলা যাবে না কত শতাংশ ভোটার উপস্থিত থাকবে। ফলে নির্বাচনী ট্রেন যে চলতে শুরু করেছে তার সঠিক গন্তব্য কি খুঁজে পাবে? যদি পায় তাহলে ভালো আর যদি না পায় তার কলঙ্ক গায়ে মাখতে হবে আওয়ামী লীগকে। আর সম্ভাব্য অরাজকতার দায় থেকে মানুষ আওয়ামী লীগকে ছেড়ে কথা বলবে না। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আমাদের ক্ষমতাশালী রাজনীতির নেতৃত্বের মনে যদি শেষ বেলায় দেশাত্মবোধ তৈরি হয় তবে বিপন্ন দেশবাসী আরেকবার নতুন আশা নিয়ে জাগতে পারে।
লেখক:অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com