স্মরণ
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কবি সাইফুল বারী
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০১৩, ২২:২৫
কবির ভাষায় ‘‘চলে যাওয়াটা একটা স্বাভাবিক বিষয়, মানুষ চলে যায় ফেলে যায় এই প্রকৃতির মায়াবন ছেড়ে’’। দেশের মিডিয়া জগতের ব্যক্তিত্ব কবি সাইফুল বারীও চলে গেলেন এই সমাজ, সংস্কৃতি, ইলেক্টোনিক মিডিয়ার নিত্যদিনের কোলাহল ছেড়ে। নিরিবিলি, নির্মোহ, কাজের মানুষ ছিলেন সাইফুল বারী। কাজ ও দায়িত্বকে তিনি বেশি প্রাধান্য দিতেন। নিজে যেমন কাজের মধ্যে ডুবে থাকতেন, অপরকেও বলতেন।
১৯৩৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কবি সাইফুল বারী বগুড়া শহরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাষ্টার্স ডিগ্রী লাভ করে ১৯৫৭ সালে তদানীন্তন এপিপিতে যোগ দিয়ে শুরু করেন সাংবাদিকতা জীবন। তারপর ইনফরমেশন সার্ভিসে যোগদান করেন। দেশে-বিদেশে নানা কাজে কর্মরত থাকার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ বেতারের রেডিও নিউজের পরিচালক এবং পরে ১৯৭৫ সালে উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) হন। তারপর কুটনৈতিক দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮১ সালে অ্যাডমিনেস্ট্রেটিভ স্টাফ কলেজ, ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতির প্রেস সেক্রেটারী, ১৯৮৫ সালে জাতীয় সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক এবং চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। লেখার জগতে প্রবেশ করেন ১৯৫২ সালে। প্রথমে ছোট গল্প দিয়ে শুরু এবং পরে কবিতা। নাট্যকার হিসেবেও সুনাম অর্জন করেন। বিটিভিতে আশির দশকে প্রচারিত তার লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘‘জোনাকীরা জ্বলে’’ দর্শক-শ্রোতাদের কাছে সুনাম অর্জন করেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘‘দুই বিপরীত মেরুতে’’। এছাড়া তিনি ‘‘একটি জীবন জীবনের দৃষ্টিকোণ’’ ছাড়াও বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ তার রয়েছে। জাতীয় পত্র-পত্রিকায় তার বহু কবিতা ও লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় তিনি নিয়মিত উপ-সম্পাদকীয় লিখতেন। ১৯৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি এটিএন বাংলার প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।
আমার সাথে তার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৮৫ সালে। শাহবাগে বেতারের সদর দপ্তরে তার সাথে দেখা করতে গেলে তিনি আমাকে বাংলাদেশ টেলিভিশন নিউজ রুমে চুক্তিভিত্তিক অতিথি প্রযোজক হিসেবে কাজ করতে পাঠান। প্রতিদিন এই কাজের মানুষটির সাথে আমার নিউজ সংক্রান্ত বিষয়ে টেলিফোনে ও সরাসরি কথা হত। তিনি আমাকে জুনিয়র হিসেবে কোন বিষয়ে ফেলে দিতেন না, গুরুত্ব সহকারে শুনতেন ও সমাধান দিতেন। ওই সময়ে দেশে একমাত্র ভিজ্যুয়াল মিডিয়া ছিল বিটিভি। তিনি নিউজ এবং অনুষ্ঠান বিভাগে ব্যাপক সংস্কার করেন। নিজউও অনুষ্ঠানকে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন। সে সময়ে অনুষ্ঠান বিভাগে বাঘা বাঘা মানুষ ছিলেন প্রয়াত আবদুল্লাহ আল মামুন, আতিকুল হক চৌধুরী, কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী এবং মোস্তফা কামাল সৈয়দ ও আলী ইমাম। বর্তমানে দেশে শক্তিশালী আকাশ ছোঁয়া মিডিয়া জনগণকে প্রভাবিত করেছে একথা যেমন সত্য। অন্যদিকে দেশের ক্ষুধা-দারিদ্র্যপীড়িত, অশিক্ষা-কুশিক্ষা রোধকল্পে, শিশু ও গর্ভবতী নারীর পরিচর্যায় মানুষকে এই স্যাটেলাইট মিডিয়া বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মানুষ চলে যায়। কিন্তু রেখে যায় তার কর্ম-সাধনা-অবদান। আমরা আমাদের স্মৃতিতে, মননে, কর্মে তাদের এই অবদানকে স্মরণ করি বারে বারে, ক্ষণে ক্ষণে।
লেখক :মিডিয়া কর্মী