দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা
ইঞ্জিনিয়ার মো. কুদ্দুছুর রহমান
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০৫
আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (আমেরিকা) প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। তিনি ছিলেন আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক। [উল্লেখ্য যে, ১৭৮০ সালে প্রথম ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা ব্রিটেনের নিকট হতে স্বাধীনতা লাভ করে]। তিনিই আবার পর পর ২ মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট (১৭৮৯-১৭৯৭) ছিলেন। তারপর একমাত্র দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন এডামস ছাড়া পরবর্তী ৪ জন প্রেসিডেন্টের প্রত্যেকেই পর পর ২ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সব মিলে এ পর্যন্ত ৪৪ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর মধ্যে ১৪ জনই পর পর ২ মেয়াদের প্রেসিডেন্ট। ১ জন আবার (ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট) পর পর ৩ মেয়াদে অর্থাত্ ১২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। অর্থাত্ ১৭৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রচনার পর থেকে বর্তমান ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২২৪ বত্সরের মধ্যে ১২০ বত্সরই শাসন করেছেন দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্টরা। যা আমেরিকার জন্মের মোট সময়ের প্রায় ৫৪ ভাগ। আবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক হুসেইন ওবামাও দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন এবং তার মেয়াদ ২০১৭ সাল পর্যন্ত। এই হল আমেরিকার গণতন্ত্রের মোটামুটি ইতিহাস। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমেরিকায় যে রাজনীতি সর্বদা সরল রেখায় চলেছে তাও নয়। অনেক বক্র ও জটিল সমীকরণও এর মধ্যে রয়েছে।
আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রধান দিক হলো তাদের দেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা একেবারে কম। তার উপর সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কোন পরিবর্তন হয় না। হয়তো সময়ের প্রয়োজনে পররাষ্ট্র নীতির দৃষ্টিভঙ্গি ও কিছু রুটিননীতির পরিবর্তন হয়। তাছাড়া আমেরিকাতে বেশীরভাগ সময়েই (৫৪%) দীর্ঘকালীন প্রেডিসেন্ট ছিলেন। বিশেষ করে সংবিধান রচনার প্রথম দিকে এই হার আরও বেশী ছিল। আমি আগেই বলেছি, আমেরিকার গণতন্ত্র ও উন্নতির পথও যে সব সময় মসৃণ ছিল এমন নয়। সেখানে হয়তো দুই একজন প্রেসিডেন্ট আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যকে উস্কে দিয়ে যে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের মাধ্যমে ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার মিলে যে ১৮ জন (শিশু রাসেলসহ) এবং তত্পরবর্তী জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়- তার নজির কি বিশ্বের কোন দেশে আছে?
এই মেয়াদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে উন্নয়ন করেছে তার ১টি উল্লেখ করলেই বুঝা যাবে, এর পরিধি কত ব্যাপক। সেটি হল মিয়ানমারের সাথে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ। এতে প্রায় আরেক বাংলাদেশের সমান জায়গা আমাদের ভাগে পড়েছে। এতে আমাদের অমিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হলো। তাছাড়া মোটা দাগের কয়েকটি উন্নয়ন হল- বিদ্যুত্ উত্পাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি, ভারত থেকে স্বল্প খরচে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের (১০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন) জন্য রাশিয়ার সাথে চুক্তি, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গে আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি যখন (২০০৬ সালে) বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের আজীবন সদস্য নির্বাচিত হই তখন প্রায়ই পরিষদের মিটিং থাকত শেখ হাসিনার সুধাসদনের বাড়ীতে। আমরা ১০-১৫ জন প্রকৌশলী একদিন শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত্ করি। তখন তিনি একেবারে সাধারণ মানুষের মতোই আমাদের সাথে গল্প করলেন। একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে উনি বললেন, এখনতো আমার বয়স ৬০, আর কতদিন বাঁচি কে জানে ! তাঁর এই কথায় আমি খুব চিন্তিত ও আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম। আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই এই মানুষটির ক্ষমতার মোহ নেই। তাহলে উনি কিসের আন্দোলন করছেন। তখনি নিজেকে নিজে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলাম এবং সেখান থেকে অনেক উত্তর বেরিয়ে এল। আমি বুঝতে পারলাম, তিনি আসলেই রাজনীতি করছেন জনগণের প্রকৃত কল্যাণের জন্য। জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকারের বাতাবরণে সমস্ত সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে আমৃত্যু সম্পৃক্ত রাখতে এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির ভিত্তি মজবুত করতেই তাঁর সমস্ত প্রয়াস। ব্যক্তি শেখ হাসিনা অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, ধর্মভীরু এবং সত্। তিনি সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণ রাখেন কিন্তু মৃত্যু ভয়ে কাতর নন। যার জন্য অনেকবার নিশ্চিত মৃত্যু থেকে ফিরে এসেও ভুলে যাননি জনগণের সাথে কমিটমেন্ট -এর কথা। তিনিই প্রকৃতপক্ষে আপসহীন নেত্রী।
যাক সেসব কথা। এবার আগের কথায় ফিরে আসি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে শেখ হাসিনার আরেকটি বড় সাফল্য হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। যে দেশে এই কয়েক বছর আগেও খাদ্য আমদানি করতে হতো সে দেশ এখন বিদেশে খাদ্য রপ্তানি করে। এটা সম্ভব হয়েছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করে উন্নত বীজ উদ্ভাবনে যুগান্তকারী সাফল্যের কারণে। আজ পাটের জীবন রহস্য উন্মোচিত হয়েছে, যা থেকে অমিত সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচিত হল। তাছাড়া গণমাধ্যমেও কৃষি ও কৃষকের জীবন; সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে।
আমার জন্ম ১৯৬৯ সালে। আমার স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা মনে নেই। কেননা আমার বয়স তখন মাত্র ২ বত্সর। কিন্তু আমার ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগষ্ট এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা স্পষ্ট মনে আছে। তখন আমি চট্টগ্রামে আমার বাবার চাকরি সূত্রে অবস্থান করছি। সকাল আনুমানিক ১০টায় আমার বাবা আমাকে আফসোস করে বললেন- আহা! ওরা শেখের পরিবারকে একেবারে শেষ করে দিয়েছে। আমি খবরটি ভালমতো বুঝে তারপর মনে মনে চিন্তা করতে থাকলাম, একজন দেশ নায়কের পরিবারকে কিভাবে এমন করুণভাবে হত্যা করা যায়। কিন্তু সময় কিছু না যেতেই রাস্তায় দেখতে পেলাম মুষ্টিমেয় কিছু লোক মিছিল করছে, “শেখ মুজিব মরছে, চালের দাম কমছে”। আমি অবাক হয়ে যাই আমার বাবার চরম আফসোস এবং এই মিছিলের শ্লোগানের ভাষার বৈপরীত্যে। কি জিঘাংসার শ্লোগান! তাই আমার বাঙ্গালি জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন- “কারা ছিল ঐ মিছিলে? কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন ঐ মিছিলে স্বাধীনতা বিরোধীরা কিংবা যুদ্ধাপরাধীরা ছিল না?” -তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আজ সময়ের দাবি। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে অবশ্যই এ বিচারের রায় বাস্তবায়ন করে এ অধ্যায়ের সুন্দর সূচনা ঘটাতে হবে। যুদ্ধাপরাধীরা যে দলেরই হোক না কেন আইনের আলোকেই তাদের সর্বোচ্চ সাজা আমার কামনা। এ প্রসঙ্গে আমি শুধু বলতে চাই- বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারকে ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে আরেকবার নির্বাচিত করা দরকার। তাহলেই আমাদের ইতিহাসের ক্ষত চিহ্নগুলো মুছে দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক :প্রকৌশলী