প্রশ্নপত্র ফাঁস : নূতন প্রজন্ম হতাশ

সারাদেশে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা গত বুধবার হইতে শুরু হইয়াছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠিয়াছে। প্রথমদিন ছিল গণিত বিষয়ের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পঞ্চগড়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮০ নম্বরের প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ইতোমধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সহিত জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হইয়াছে কয়েকজনকে। তবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রথমদিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নাকচ করিয়া দেন। তাহার বক্তব্য ছিল, সাজেশন হইতে কিছু প্রশ্ন এমনিতেই মিলিয়া যাইতে পারে। অবশ্য সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সরকার এই ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করিয়াছে। ইহার আগে এই বত্সর জেএসসি বা জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। আগে কেবল স্কুল বা কলেজ পর্যায়ে সাময়িকী বা বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হইত সীমিত আকারে। ইহা লইয়া তেমন হৈচৈ পড়ে নাই। তবে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ব্যবসায়িক স্বার্থে মেডিক্যাল, বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সহিত জড়াইয়া পড়িলে ইহার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এইভাবে শক্তিশালী চক্র বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকুরি-বাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস করিয়া যাইতেছে। তাহারই ধারাবহিকতায় এখন বড় বড় পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হইয়া যাইতেছে। ইহার চাইতে বড় দুর্ভাগ্য ও দুঃখজনক ঘটনা আর কি হইতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার আশিভাগ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর প্রথমদিকে কর্তৃপক্ষ হুবহু বা শতভাগ মিলে নাই এই অজুহাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারটিকে উড়াইয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু ইহাকে সংঘবদ্ধ চক্রের কৌশল হিসাবেও দেখা যায়। ইতোপূর্বে বিসিএস ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে, কোন কোন এলাকায় আশিভাগ বা আবার কোথাও কোথাও ৯০ হইতে ৯৫ ভাগ প্রশ্নপত্র ফাঁস হইয়াছে। তাহার মানে শতভাগ মিলে নাই বলিয়াই যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় নাই তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। গত রবিবার ছিল ইংরেজি পরীক্ষা। এই বিষয়ের ৯৫ ভাগ প্রশ্নপত্র ফাঁস হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। অন্যদিকে কাহারও কাহারও সাজেশনের আশি বা ৯৫ ভাগ মিলিয়া যাইতে পারে। কিন্তু যখন তাহা লইয়া ব্যাপক প্রচারণা ও রাতের অন্ধকারে লেনদেন চলে এবং তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ছড়াইয়া দেওয়া হয় সারাদেশে, তখন তাহার দুইটি কার্যকারণ থাকিতে পারে। হয় প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হইয়াছে নতুবা প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব তুলিয়া কেহ অনৈতিক ও প্রতারণামূলক বাণিজ্যে লিপ্ত আছে। এইক্ষেত্রে ইহার হোতাদের গ্রেফতার করিয়া জিজ্ঞাসাবাদ করিলেই প্রকৃত ঘটনা বাহির হইয়া আসিবে। আমরা আশা করি, তদন্ত কমিটি এই ব্যাপারে সফল হইবে। আমাদের বক্তব্য হইল, দারিদ্র্যের কারণে যেখানে আমাদের দেশে দুর্নীতি ও অনিয়ম দিন দিন প্রাতিষ্ঠানিকতার রূপ লাভ করিতেছে, সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রবণতা বাড়িবে ইহাই যেন স্বাভাবিক। কেননা ইহাও এক প্রকার দুর্নীতি। যাহারা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ বা বিতরণ প্রক্রিয়ার সহিত জড়িত, তাহারাই কোন না কোনভাবে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়া নগদ নারায়ণের কাছে পরাজিত হইতেছে। তাহাছাড়া আমরা এমন একটি বিশ্বসমাজে বসবাস করিতেছি যেখানে মোবাইল, ইন্টারনেট এমনকি কূটনীতিক তারবার্তাও গোপন থাকিতেছে না। আবার অর্থ দিয়া যদি সরকারি সিদ্ধান্ত ক্রয় করা যায়, তাহা হইলে সামান্য প্রশ্নপত্র কেনা যাইবে না কেন? আমাদের মধ্যে স্বার্থপরতা বৃদ্ধি ও ন্যূনতম আদর্শ না থাকিবার কারণে এই পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করিতেছে। কিন্তু যখন কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও ইহার শিকার হয়, তখন আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত্ নিয়া শংকিত না হইয়া পারা যায় না। যাহারা নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পড়াশুনা করিতেছে তাহাদের জন্য এই পরিস্থিতি সত্যিই অস্বস্তিকর, বেদনাদায়ক ও হতাশাজনক। এইভাবে সমৃদ্ধ জাতিগঠন ও শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হইতেছে এবং অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িতেছেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে যাহাতে বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সেইজন্য স্কুল-কলেজ পর্যায়ের যে কোন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। এইজন্য ইহার উত্সমূলে আঘাত হানার কোন বিকল্প নাই।