স্মরণ
একুশের চেতনা ছড়িয়ে চলে গেলেন রফিকুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪২
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদ রফিকুল ইসলামের নামেই নাম রফিকুল ইসলাম যিনি মহান একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার দাবিকে সামনে এনেছিলেন, তিনি আর নেই। কানাডার ভ্যাঙ্কুভার জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ২০ নভেম্বর বুধবার মারা যান খ্যাতিমান এই প্রবাসী বাঙালি। তার বয়স হয়েছিলো ৬৩ বছর।
গত ১৮ বছর ধরে কানাডায় বসবাস করলেও তার হূদয় জুড়ে ছিলো বাংলাদেশ। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। ১৯৫৩ সালের ১১ এপ্রিল কুমিল্লা শহরে রফিকুল ইসলাম জন্ম গ্রহণ করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে তিনি লেখাপড়া করেন। তখনই তিনি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন ছিলেন। ১৯৭০-৭১ সালে ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ থেকে সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি ‘মেঘ কেটে সূর্য এবার হাসল’ শীর্ষক একটি সংকলন বের করেন। জানা যায়, তিনি বরাবর জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর অনুরাগী ছিলেন এবং ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগেরই রাজনীতি করেছেন।
১৯৮৮ সালের ৯ জানুয়ারি রফিকুল ইসলাম জাতিসংঘের তত্কালীন মহাসচিব কফি আনানকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে মহান একুশে ফেব্রুয়ারির তাত্পর্য তুলে ধরা হয়েছিলো, প্রস্তাব করা হয়েছিলো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দেয়া যায় কিনা। এই পত্রের উত্তরে কফি আনানের বাঙালি ইনফরমেশন অফিসার বলেছিলেন, এ ধরনের প্রস্তাব কোন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে করতে হয়। তাহলেই গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এর পর রফিকুল ইসলাম সাতটি ভাষার প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠন করেন A Group of Mother Language Lovers of the World.। এর প্রবক্তা হন রফিকুল ইসলাম। এই দলে ছিলেন দু’জন বাঙালি, দু’জন ইংরেজ, একজন জার্মান, দু’জন ফিলিপিনো, একজন কাচ্চি, একজন ক্যান্ডোনিস ও একজন হিন্দিভাষী। শুরু হয়েছিলো স্বাক্ষর অভিযান। এর একটি কপি জাতিসংঘে নিযুক্ত তত্কালীন কানাডার রাষ্ট্রদূতকে দেয়া হয়েছিলো নির্দিষ্ট ফোরামে উপস্থাপনের জন্য। প্রস্তাবপত্রটি কানাডার পররাষ্ট্র দফতরে আটকা পড়ে থাকে ৮/৯ মাস। হতাশায় দমে না গিয়ে রফিকুল ইসলাম ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের পরিচালক জোসেফ পলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যোগাযোগ করেন ইউনস্কোর সদর দফতরে। ইউনেস্কো রফিকুলের প্রস্তাবে সাড়া দেয়। ইউনেস্কোর প্রতিনিধি আনা মারিয়া মাইলফ তার তরফ থেকে পাঁচটি দেশের নাম দিয়ে ওই সব দেশকে গ্রুপের প্রস্তাব ইউনেস্কোতে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ করা হয়। পাঁচটি দেশ হলো, বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, ফিনল্যান্ড ও হাঙ্গেরি।
এর পর ইউনেস্কোর সদর দফতর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে জানানো হয়, এই পরিচালিত দেশগুলোকে এ ব্যাপারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায় করতে হবে। এতে প্রথম সাড়া দেয় হাঙ্গেরি ১৬ আগষ্ট, ১৯৯৯ সালে। এরপর শুরু হয় নির্দিষ্ট ফরমে প্রস্তাব-সমর্থন। তাও এক সময় আদায় হয়ে যায়। তারপর তত্কালীন বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব, বাংলাদেশস্থ ইউনেস্কো সচিব, ফ্রান্সের বাংলাদেশস্থ রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, ইউনেস্কোর সদর দফতরের কর্মকর্তা টনি হক প্রমুখের প্রচেষ্টায় এ মহত্ উদ্যোগটি অনেকদূর এগিয়ে যায়। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহশীল দ্রুত পদক্ষেপের কারণে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আকাঙ্ক্ষিত ঐতিহাসিক দিবসটি ঘোষিত হয়। বিশ্বে বাঙালির মর্যাদা নতুনভাবে স্বীকৃত হয়। এই বিজয়ের মুখ্য উদ্যোক্তা ছিলেন মাতৃভাষা প্রেমিক রফিকুল ইসলাম। তিনি আমাদের জাতীয় বীর।
গত শুক্রবার তার অবদানকে স্মরণ করে স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে মিলিত হন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
লেখক :প্রাবন্ধিক, গবেষক