[ রা জ নী তি ]

নির্বাচন না সংঘাত

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ১৪ দলীয় মহাজোট আর ১৮ দলীয় জোটের মধ্যে চলছে সুদীর্ঘ ও তীব্র টানাপোড়েন। বিগত প্রায় তিন বছর ধরে ১৮ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালসহ নানা ইস্যুতে সরকার বিরোধী আন্দোলন করে যাচ্ছে ক্রমাগত। কখনো মহাসমাবেশ, কখনো ঢাকা অবরোধ, কখনো সচিবালয় ঘেরাও, কখনো মহাবিক্ষোভ, কখনো ধারাবাহিক হরতাল, আবার কখনো সরকার পতনের আল্টিমেটাম দিয়ে যাচ্ছে। বারবার সরকার পতনের আন্দোলন করে ১৮ দলীয় জোট দেশের জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও নিরাপত্তা ব্যাহত করছে। সরকার বারবার হরতাল, ভাঙন ও অগ্নিসংযোগের পথ পরিত্যাগ করে বিএনপিকে সংসদে এসে তাদের সাংবিধানিক ও ন্যায্য দাবি তুলে ধরার কথা বলেছে। জননিরাপত্তার স্বার্থে সরকার আন্দোলনের ভয়ঙ্কর পরিণতি থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য নাশকতার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে। পুলিশ রাজপথে সন্ত্রাসী তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে বারবার হামলা ও হত্যার শিকার হয়েছে। এমনকি সাংবাদিক-সংবাদপত্র, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, সংখ্যালঘু, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ কেউ রেহাই পায়নি সহিংস হরতাল ও রাজপথের বেপরোয়া আন্দোলন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির ভয়াবহ পরিণতি থেকে। সরকার বাধ্য হয়ে আইনগত অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। তারপরও নির্বাচিত ও সাংবিধানিক সরকারকে টেনে-হিঁচড়ে নামানোর, লেংড়া-লুলা বানানোর হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের রায়ে জাতীয় সংসদ কর্তৃক বাতিলকৃত বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত একযোগে চরম আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে; কিন্তু আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার সংবিধানের পক্ষে থেকে যাবতীয় সমস্যার সমাধান চেয়েছে। সেই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধী রক্ষা আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে থেকে এবং তাতে সম্মতি দিয়ে বিএনপি বারবার বিতর্কিত হয়েছে। এমনকি বিএনপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক জামায়াতে ইসলামী দল যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার পরও ত্যাগ করেনি জামায়াতকে। সরকারের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও যুদ্ধাপরাধী দলকে ১৮ দলীয় জোট থেকে বাদ দেয়া হয়নি। এবার নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল ঘোষিত হয়েছে। তারপরও চলছে বিএনপি-জামায়াতের যুগপত্ আন্দোলন। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বহু অপপ্রচার, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে চলেছে দেশে ও বিদেশে। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার মাত্র সাতচল্লিশ দিন পরে সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক রায় সম্পন্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইবুন্যাল গঠন করে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়েছে ঝুঁকি নিয়ে। বিগত সাড়ে চার বছরে দৃষ্টান্তমূলক ও রেকর্ড পরিমাণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসম্পন্ন করেছে মহাজোট সরকার। সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হতে চলেছে। এই প্রথম একটি সরকার সংবিধান ও গণতন্ত্রের পথে থেকে উন্নত দেশের ন্যায় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চাচ্ছে। সরকার, নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদ কর্তৃক নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষিত হয়েছে। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন করার জন্য সর্বাত্মক জোর প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যেই দেশে স্থানীয় পর্যায়ে ও সিটি করপোরেশনের সর্বমোট সাড়ে পাঁচ হাজারের অধিক নির্বাচন সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তারপরও নির্বাচন কমিশনকে অযথা বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে ১৮ দলীয় জোট। নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও নিরাপদভাবে করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের ভিত্তিতে প্রাপ্ত সুপারিশের আলোকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে নির্বাচন কমিশন বদ্ধপরিকর। আগামী নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের আশঙ্কায় সেনা মোতায়নের বিবেচনাও রয়েছে। জনগণ চায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে গণতন্ত্র ও সংবিধান সুরক্ষা হবে। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। এ দল অতীতে বিভিন্ন মেয়াদে ক্ষমতাসীন ছিল। এ দলের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনমুখী। সাধারণত গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ায় সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকটের মীমাংসা হয়। শর্ত দিয়ে সংলাপ হয় না, হরতাল বজায় রেখেও সমঝোতা হয় না। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার দেশ ও জনগণের স্বার্থে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সংলাপ ও সমঝোতার পথে সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন। বিএনপির নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেছেন, বিএনপি ছাড়া দেশে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেয়া হবে না। সরকার একতরফা নির্বাচন করতে চায়। এ নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। বাস্তবে নির্বাচনে অংশ নেয়া সকলের সাংবিধানিক অধিকার। এ নির্বাচন প্রতিহত করার হুমকি অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক। সরকার বারবার সর্বদলীয় সরকারে অংশ নেয়ার জন্য এবং আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপির প্রতি ধারাবাহিক আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপি জামায়াতের প্রভাবমুক্ত হতে পারছে না বলেই জামায়াত নিয়ন্ত্রিত হরতাল পরিত্যাগ করতে সক্ষম হননি খালেদা জিয়া। বিএনপির নেতা-কর্মীরা খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে দেখা করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চেয়েছিলেন। তিনি তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি নেতা-কর্মীদের। নেতা-কর্মীদের ক্রমাগত কঠোর আন্দোলনের পথে ঠেলে দেয়ায় বিএনপির প্রতি জনগণের সমর্থন ক্রমশ কমতে শুরু করেছে। কারণ জনগণ সহিংস হরতালে ক্ষতিগ্রস্ত, অনিরাপদ ও উদ্বিগ্ন। কঠোর হরতালে নেতারা নিরাপদে নিজের ঘরে ও দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে জনগণকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন সহিংস কর্মীবাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করে। এতে কর্মীরা ঘটনাস্থলে তাত্ক্ষণিক গ্রেফতার হলেও হরতাল আহ্বানকারী নেতারা থাকছেন নিরাপদ দূরত্বে। জনগণ এর জবাব দেবে আগামী নির্বাচনে। জনগণের সমর্থন কমে গেলেই নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে কোন দল আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে সে দলকে কিভাবে নির্বাচনমুখী করা যায়! সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে কোন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে তার দায় কে নেবে? সর্বদলীয় সরকারে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের জন্য বারবার আহ্বান করেও প্রধানমন্ত্রী তাতে সাড়া পাননি। সংসদীয় আলোচনায় ও সংলাপে বিরোধী দল কোনরূপ মীমাংসায় সচেষ্ট না হয়ে বরং রাজপথের উত্তপ্ত আন্দোলনে ও সরকার পতনের হুমকি প্রদানে ব্যস্ত। এভাবে গণতন্ত্র ও সংবিধানের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে এবং জনমতের বিরুদ্ধে সক্রিয় থেকে কোন রাজনৈতিক দল দীর্ঘস্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। সাংবিধানিক বিভিন্ন বিকল্প পন্থা থাকতেও বিএনপি কেন বারবার বাতিলকৃত ও অসাংবিধানিক নির্দলীয় সরকার পুনর্বহালে এমন মারমুখী অবস্থান নিয়েছে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ ও শঙ্কা। বিএনপি কি বিলুপ্তপ্রায় মুসলিম লীগের পরিণতি বহন করতে যাচ্ছে জামায়াত প্রভাবিত হয়ে! তা না হলে বিএনপি অংশ নিতে চাচ্ছে না। জামায়াত চাচ্ছে দেশে একটি বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে। জামায়াত চায় না দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। তাই তারা বিএনপিকে নির্বাচনের পথ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তা বিএনপি কেন অনুধাবন করছে না? এ জিজ্ঞাসা রয়েছে জনমনে। ক্রমাগত সরকার পতনের আন্দোলনে ব্যর্থ বিএনপির নেতা-কর্মীরা হতাশ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ অচল করার জন্য কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলের নেতা-কর্মী ও জনগণকে। ক্রমাগত হরতালে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, স্বাভাবিক জীবিকা অর্জনে বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরও আরো কঠোর আন্দোলন করার জন্য তার কথাকে গুরুত্ব দেবে এটা কিভাবে ভাবেন তিনি। গণতন্ত্র, সংবিধান, সংসদ ও নির্বাচন উপেক্ষা করে কোন রাজনৈতিক দল আর টিকে থাকতে পারবে না এ দেশে। বিএনপির জন্য এখনো সংলাপের আমন্ত্রণ বহাল আছে। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় এখনো সমঝোতার সুযোগ আছে। সহিংসতা এবং হরতালের নামে খুন করা কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়। জনগণের জানমাল রক্ষায় অপরাধভিত্তিক কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিহত করা সরকারের মহান দায়িত্ব। রাজনীতির নামে নিরীহ মানুষ খুন করা, বোমাবাজি করা, গ্রেনেড হামলা করা, অগ্নিসংযোগ করা, পরিবহন জ্বালিয়ে দেয়া জনগণ মেনে নেবে না। সুতরাং হরতালের বিপর্যয় ও আশঙ্কা থেকে জনগণকে মুক্ত করে সমঝোতার পথে আসতেই হবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করলে নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে। সবর্দলীয় সরকারের প্রধান বিষয়ে মীমাংসার জন্য সংবিধান ও রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ গৃহীত হতেই পারে। সরকারকে অবৈধ বলে বিরোধী দলের নির্বাচিতরা নিজেদেরও অবৈধ করে তোলে। এ হুঁশ-জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতেই ক্ষমতা অর্পণ করার রীতি। নির্বাচন ছাড়া সরকার বদলের পন্থা সাংবিধানিকভাবে বৈধ নয়। সংবিধানে যাবতীয় সংকটের সমাধান থাকতে রাজনৈতিক দলগুলো কেন নতুন করে সংকট তৈরি করে এবং জনজীবনের ক্ষতি ডেকে আনে তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। জনগণ অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা পরিবর্তন চায় না। অনির্বাচিত ও অসাংবিধানিক তৃতীয় পক্ষের সরকার চায় না জনগণ। সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় সামঞ্জস্য বিধান করেই বিএনপিকে টেকসই হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা এড়াতে পারেন না কোন রাজনৈতিক দলের সদস্যগণ। দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলকে সাংবিধানিক পন্থায় সংলাপ ও সমঝোতার পথে যেতেই হবে। সর্বদলীয় সরকার ও নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য বিএনপির প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী পক্ষ ও ব্যক্তি। তাই প্রক্রিয়াধীন সর্বদলীয় সরকার এবং আগামী নির্বাচনে অংশ না নেয়া বিএনপির জন্য হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। অবশেষে গতকাল সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন ৫ জানুয়ারী। তিনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সকল রাজনৈতিক দলকে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য তারা অপেক্ষা করতে পারলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে সিইসি আর বিলম্ব করতে পারছেন না। তিনি বলেন, মনোনয়ন জমাদানের শেষ তারিখ ২ ডিসেম্বর। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই হবে ৬ ডিসেম্বর। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৩ ডিসেম্বর। তিনি আরও বলেন নির্বাচনের আচরণবিধি প্রয়োগে কোন ছাড় দেয়া হবে না। ভোটারদের নিরাপত্তার জন্য অন্যান্য বাহিনী সঙ্গে সেনাবাহিনীও থাকবে। এদিকে বিএনপি এখন কী করে সেটাই দেখার বিষয়। লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক E-mail : ratantanukc@yahoo.com