শিশুদের দৈহিক সামর্থ্য কমিতে দেওয়া যাইবে না
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৫৪
পৃথিবীব্যাপী শিশুদের শারীরিক সামর্থ্য কমিয়া যাইতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে অনুষ্ঠিত আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক সম্মেলনে গবেষকরা গত মঙ্গলবার এই তথ্য জানাইয়াছেন। ১৯৬৪ হইতে ২০১০ সাল পর্যন্ত ২৮টি দেশের ৯ হইতে ১৭ বত্সর বয়সী দুই কোটি ৫০ লাখ শিশুর উপর পরিচালিত ৫০টি গবেষণার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করিয়া গবেষকরা জানিয়াছেন যে, এই যুগের শিশুরা মা-বাবার তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম শক্তি-সামর্থ্য ধারণ করে। সামর্থ্য হ্রাসের এই হার ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে প্রায় একই রকম। চীন ও জাপানেও শিশুদের সামর্থ্য কমিয়াছে। ছেলে ও মেয়েশিশুদের ভিতর এই সামর্থ্য হ্রাসের অনুপাত প্রায় সমান। পরিস্থিতি বুঝাইতে গবেষকরা এইরকম বলিয়াছেন যে, ৩০ বত্সর আগে এক মাইল দৌড়াইতে মা-বাবার যে সময় লাগিত, তাহাদের শিশুসন্তান এইকই দূরত্ব দৌড়াইতে এখন সময় নিতেছে গড়ে ৯০ সেকেন্ড বেশি। বর্তমান কালের শিশুদের এরূপ সামর্থ্য হ্রাসে গবেষকরা জীবনযাপনের ধরনকে কারণ হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন। এখনকার শিশুরা শারীরিক পরিশ্রমের তেমন একটা সুযোগই পাইতেছে না। টেলিভিশন দেখা ও ভিডিও গেমসে বেশি সময় ব্যয় করিবার কারণে শিশুদের নড়াচড়া কমিয়া গিয়াছে। খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্থূলতা একটি সঙ্কট হিসাবে যোগ হইয়াছে। বাড়ির আশপাশের পরিবেশ ক্রমশ অনিরাপদ হইয়া উঠিয়াছে। তাই নেইবারহুড তথা পাড়ায়-মহল্লায় বাহির হইয়া খেলাধুলা করিবার প্রবণতা কমিয়া গিয়াছে।
গবেষণার ক্ষেত্র হিসাবে বাংলাদেশ এই গবেষণায় বিবেচিত হয় নাই, ইহা অনুমানযোগ্য। কিন্তু যেই বাস্তবতা ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা চীন-জাপানে বিরাজ করিতেছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রায় একই বাস্তবতা দেখা যাইতেছে। রাজধানী ঢাকা অত্যন্ত জনবহুল ও অনিরাপদ একটি শহর। ফলে ঢাকার শিশুরাও টেলিভিশন, কম্পিউটার ও ভিডিও গেমস লইয়া পড়িয়া আছে। মহল্লা-সংস্কৃতি ঢাকা হইতে উঠিয়া গিয়াছে। স্কুলে যাওয়া ব্যতীত এই শহরের শিশুরা বাসার চার দেওয়ালে একরকম বন্দি জীবনই যাপন করিয়া থাকে। ঢাকার বেশিরভাগ স্কুলেই এমনকি খেলার মাঠ নাই— শহরে ইহার সংখ্যা কমিতে কমিতে এমন সংখ্যায় আসিয়া উপনীত হইয়াছে যে তাহা হাতে গুনিয়া উল্লেখ করা যায়। পার্কের অবস্থাও তথৈবচ। উন্নত দেশগুলির শিশুরা একরকম ভেজালমুক্ত খাবার পাইয়া থাকিলেও, বাংলাদেশে রহিয়াছে ভেজালের উত্পাত আর ফরমালিনের বিষ। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরের বাহিরে জেলা শহরগুলিতে যে নগরায়ণ প্রক্রিয়া দেখা যাইতেছে, তাহাতেও রহিয়াছে ঢাকার মতোই ঘনবসতিপূর্ণ নগরায়ণ-প্রবণতা। ফলে জেলা শহরগুলিতেও চলিতেছে পার্ক-মাঠবিহীন এক ঘিঞ্জি বৈশিষ্ট্যের উন্নয়নপ্রক্রিয়া। অন্যদিকে গ্রামের শিশুদের চলাচল অবারিত হইলেও তাহাদের রহিয়াছে অপুষ্টিজনিত সমস্যা। গ্রামীণ শিশুরা গরিব পরিবারের সন্তান হইবার কারণে সব ধরনের খাবারের ভারসাম্যপূর্ণ পুষ্টি হইতে তাহারা বঞ্চিত। এইসব দিক বিবেচনায় নিয়া বলা যাইতে পারে যে, ইউরোপ-আমেরিকাসহ অন্যান্য অঞ্চলের শিশুর ন্যায় বাংলাদেশের শিশুদেরও শারীরিক সামর্থ্য কমিতেছে।
এই পরিস্থিতির যাহাতে অধিক অবনতি না হয়, সেই দিকে নজর দিতে হইবে নীতিনির্ধারক মহলকে। শহরে যেই কয়েকটি পার্ক ও মাঠ অবশিষ্ট রহিয়াছে, তাহা যেন বিলীন না হইয়া যায়। বরং সেই পার্ক ও মাঠগুলি শিশুদের জন্য কীভাবে অধিক আকর্ষণীয় করিয়া তোলা যায় সেই জন্য পদক্ষেপ লইতে হইবে। পিতা-মাতাকেও ভাবিতে হইবে বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে টেলিভিশন ও কম্পিউটারের পাশাপাশি ভিন্ন কী কী বিকল্প শিশুদের জন্য হাজির করা যায়। জেলা শহরগুলিতে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হইতেছে তাহাতে ঘিঞ্জিভাব দূর করিয়া কীভাবে খোলামেলা পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহা লইয়া নীতি-নির্ধারকদের ভাবিতে হইবে। কারণ আজকের শিশুদের উপরই নির্ভর করে জাতির উন্নততর ভবিষ্যত্।