চাপহীনতায় মুক্তি খুঁজছেন সাকিবরা
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০১৪, ২১:৪১
বাংলাদেশের অনুশীলন তখন শেষ হয়ে গেছে। এক বিদেশি সাংবাদিক তার সংবাদ-অনুষ্ঠানের আবেদন বাড়ানোর জন্য ক্যামেরার সামনে ক্রিকেটারদের মতো করে অনুশীলন শুরু করলেন। ফিল্ডিং কোচদের নিয়ে রীতিমতো প্রাণাতিপাত কষ্ট করছিলেন। লাফিয়ে লাফিয়ে ক্যাচ ধরছেন, থ্রো করছেন; ভদ্রলোকের এই লাফঝাপ দেখে ক্রিকেটাররাও অবাক।
মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুমিনুলরা মহা আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন সাংবাদিকের এই ক্রিকেটার হওয়ার চেষ্টা দেখতে। তামিম-মুমিনুলরা ‘সাবাস, সাবাস’ বলে উত্সাহও দিলেন। মাশরাফি সতর্ক করে দিলেন, ‘ইনজুরি থেকে সাবধান’!
সাকিব শুধু একবার বলে উঠলেন, ‘পারবেন, পারবেন। চাপ না নিলেই পারবেন।’
আহ! চাপ!
বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা অন্তত জানেন, চাপের কী অর্থ। তারা অন্তত বিশ্বাস করেন, চাপই সর্বান্তকরণে ভেঙে ফেলতে পারে একটা দলকে। আশার কথা, অবশেষে বাংলাদেশ চাপমুক্ত হয়েছে! হংকং, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ভারতের বিপক্ষে আত্মসমর্থনের পর এই দলের ওপর আর যাই হোক, প্রত্যাশার চাপটা আর থাকার কথা নয়।
গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসে সাকিব বললেন, এই চাপমুক্তিকেই এবার হাতিয়ার করে এগোতে চান তারা। যেহেতু আর কোনো চাপ নেই, তাই এবার শুধু উপভোগের জন্য অন্তত খেলতে চান; উপভোগের জন্য, আনন্দের জন্য খেললে, কে জানে ফলটাও পক্ষে চলে আসতে পারে!
বাংলাদেশের এখন সেমিফাইনালে যাওয়ার যে সম্ভাবনা আছে, এটাকে নিয়ে ভেবে আর সময় নষ্ট না করে সাকিব বরং এই চাপমুক্তিকেই বড় করে দেখিয়ে গেলেন, ‘গাণিতিকভাবে এখনো হয়তো আমাদের সেমিফাইনালে খেলার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু দুই ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে যাওয়া আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন হবে। বড় ব্যাপার হচ্ছে, এখন আর এই চাপটা থাকছে না। আশা করি, এটা আমাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলার আত্মবিশ্বাস যোগাবে।’
আসলে এখন খড়কুটো ধরে বাঁচার এক চেষ্টা চলছে। এছাড়া আর উপায়ও নেই। সাকিবও তাই এই আশা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সৌন্দর্য্যের ওপর সওয়ার হলেন। এই ফরম্যাটই যে তাদের ভরসার কারণ হতে পারে, মনে করিয়ে দিলেন, ‘আমরা দুটি ম্যাচে ভালো পারফরম করতে পারিনি। আত্মবিশ্বাস তো কমই। তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সৌন্দর্যই এটা, তুমি যে কোনো সময় ঘুরে দাঁড়াতে পার। আমার মনে হয় না কোনো দল বলতে পারে তারা জিতবে। এটাই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সৌন্দর্য।’
যতোই আশার কথা শোনান, সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে এসে আর চেপে রাখতে পারলেন না। খোলামেলাভাবে স্বীকার করেই নিলেন, এই সব হার এবং হারের ধরনের ফলে কেউই আসলে স্বস্তিতে নেই। দলের সবার সেই অস্বস্তি আর আত্মবিশ্বাসহীনতা ফুটে উঠলো দেশসেরা অলরাউন্ডারের কথায়, ‘ভেতরে ভেতরে সবাই খুবই হতাশ। যারা ড্রেসিংরুমে থাকে বা দেখে তারা সবাই বলতে পারবে। বাইরে থেকে বোঝাটা মুশকিল। সবাই অবশ্যই হতাশ, সবাই চায় দলের জন্য পারফরম করতে। যে পারফরম করবে তার জন্যও ভালো দলের জন্যও ভালো। স্বাভাবিকভাবেই কেউ চায় না খারাপ পারফরম করতে। হয়তো আমাদের প্রসেসটা কোনো না কোনো ভাবে ভুল হচ্ছে। আমি বলবো ভুলই হচ্ছে। তা না হলে আমরা আরো বেটার পারফরম করতাম। আমরা চেষ্টা করবো আমাদের প্রসেসটা যেন ঠিক পারি আর বেটার পারফরম করতে পারি।’
সাকিবের এইসব কথাবার্তার পরে দলের অবস্থা সম্পর্কে আর কিছু না বললেও চলে!
সাকিবের জন্য এই অভিজ্ঞতা অবশ্য প্রথম নয়। সেই ২০১১ সালে ঘরের মাটিতে ওয়ানডে বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবেই দেখেছিলেন দলের স্মরণকালের বৃহত্তম বিপর্যয়। আর এবার সাক্ষী হচ্ছেন আরেক চলমান বিপর্যয় পর্বের। তবু সেবার ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সান্ত্বনা পেয়েছিল বাংলাদেশ। এবার?
সাকিব দুটোর কোনোটাকেই সর্বনাশা বিপর্যয় বলে মানলেন না। বরং বলছেন যে, প্রাথমিক লক্ষ্য দুই বিশ্বকাপেই পূরণ হয়েছে। তবে হ্যা, কেন তারপরও এমন বিপর্যস্ত মনে হচ্ছে, সেটা তিনিও বোঝেন, ‘২০১১ সালে আমাদের একটি বড় দলকে হারানোর লক্ষ্য ছিল, সেটা আমরা করেছিলাম। এখানেও আমাদের লক্ষ্য ছিল কোয়ালিফাই করা, সেটা করেছি। এখন আরেকটা লক্ষ্য আছে অন্তত একটা ম্যাচ যদি জিততে পারি তাহলে সব মিলিয়ে এটা হবে ওকে টুর্নামেন্ট। আসলে হয়েছে কী, দু টুর্নামেন্টেই, আমরা যে ম্যাচ হেরেছি, সেটা খুব বেশি খারাপ করেছি। আরেকটু ভালো করা উচিত ছিল, ধারাবাহিকতা থাকা উচিত ছিল। আমরা আমাদের সেরা ক্রিকেট খেলতে পারিনি তাই এই সমস্যাগুলো আমাদের ফেস করতে হচ্ছে। শেষ দুই ম্যাচে, অন্তত আমি বিশ্বাস করি আমাদের ওপর চাপটা অনেক কম। চাপ কম থাকায় হয়তো আমাদের সেরা ক্রিকেটটা খেলতে সহায়তা করবে।’
আহ! চাপ!