অস্ট্রেলিয়ার আরেক হিলি

পরনে অস্ট্রেলিয়ার চিরচেনা হলুদ জার্সি, হাতে গ্লাভস, নামের শেষে হিলি; আর কী চাই! ক্রিকেটের সামান্যতম খোঁজখবর রাখেন, এমন মানুষটিরও এটুকু বর্ণনা শুনে লাফ দিয়ে ওঠার কথা—আহা, ইয়ান হিলি। এখনই বুঝি আরেকটা ক্যাচ নিয়ে তারস্বরে চিত্কার করে আম্পায়ারের বিরক্তির কারণ হবেন, এখনই বুঝি আরেকবার চিত্কার করে উঠবেন—বোলিং, ওয়ার্নি; বোলিং! কিন্তু সমস্যাটা হল, এটা যে ২০১৪ সাল। ৪৯ বছর বয়সে কমেন্ট্রি ছেড়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা উইকেটরক্ষক ইয়ান হিলি আবার হলুদ জার্সি পরে মাঠে নামবেন, এটা কল্পনা করা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। তাহলে? তাহলে কী আমরা ভুল দেখলাম! এই যে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সেমিফাইনালে হারিয়ে দেয়ার পথে অসাধারণ একটা ইনিংস খেললেন, উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে সেইভাবে মাঠ মাতিয়ে চললেন; তিনি কী হিলি নন? অবশ্যই তিনি হিলি; তবে ইয়ান হিলি নন, অ্যালিসা হিলি; ইয়ান হিলির ভ্রাতুস্পুত্রী অ্যালিসা হিলি। অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তী ইয়ান হিলির ভাইয়ের মেয়ে, অ্যালিসার বিখ্যাত হয়ে ওঠার এই কারণটাই হয়তো যথেষ্ঠ ছিল। আবার কারো কারো কাছে তার পরিচয় হতে পারে অস্ট্রেলিয়া ছেলেদের দলের তারকা বোলার মিচেল স্টার্কের প্রেমিকা। কিন্তু এসব পরিচয় দিয়ে অ্যালিসাকে কার্যত ছোটই করা হবে। কারণ এই অস্ট্রেলিয়ান উইকেটরক্ষক-ব্যাটারের নিজের জীবনই এতোটাই বর্ণময় যে, তাতেই অ্যালিসাকে ক্রিকেট ইতিহাসের মনে রাখা দরকার। শুরুতে শুধু একটা কথাই বলে নেয়া যাক—রীতিমতো সর্বঅস্ট্রেলিয়ান বিতর্ক তুলে অ্যালিসা তার প্রথম বড় ম্যাচ খেলেছিলেন একটি ছেলেদের দলের মূল একাদশের হয়ে! এই একটা ব্যাপারেই বুঝতে পারছেন যে, কতোটা ক্রিকেটীয় দক্ষতা নিয়ে এই ধরায় এসেছেন অ্যালিসা। এই প্রসঙ্গ এলে অ্যালিসা হেসে বলেন, আসলে ক্রিকেট তার রক্তেই ছিল, ‘আমি জন্মাবার আগেই আমার পরিবার ক্রিকেটের জন্য বিখ্যাত ছিল। বাবা খেলতেন, চাচা তো আপনারা জানেনই। ফলে আমি স্কুলে যাওয়ার আগেই অনেকে মজা করে বলতো—তুমি ক্রিকেটারই হবে। তবে আমি আসলে এরকম কোনো পরিকল্পনা কখনো করিনি। একবার এক বন্ধুই কাঙ্গা ক্রিকেটে খেলতে নিয়ে গেল। ৭ নম্বরে ব্যাটিং করেছিলাম। সত্যি কথা বলতে, খেলতে নেমেই আমি টের পেয়েছিলাম, খেলাটার প্রতি আমার একটা ভালোবাসা আছে।’ এই ভালোবাসা খুব দ্রুত অ্যালিসার পরিচয়ে পরিণত হয়ে পড়ে। অন্তত স্কুল পর্যায়ে অ্যালিসা বেশ বড় ক্রিকেটার হিসেবেই বিবেচিত হতে শুরু করেন। ব্যাটিং তো আছেই, আছে রক্তে মিশে থাকা উইকেটরক্ষণও। কিন্তু সমস্যাটা হল, তখনও পৃথিবীতেই মেয়েদের ক্রিকেট সেভাবে বিকশিত হয়নি। ১৫ বছর বয়স থেকে যদিও অ্যালিসা মেয়েদের ক্রিকেটে যুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু বড় খেলার সুযোগ তার সতীর্থরাও খুব একটা পেত না। সেই সুযোগটা এলো বেকার কলেজ দল থেকে। হ্যা, কলেজ দল; মেয়েদের নয়, ছেলেদের দল। অ্যালিসার দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা থাকা বেকার কলেজ টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে মূল একাদশে খেলতে নামিয়ে দিলেন। ব্যাপারটা শুনতে খুব সিনেমাটিক শোনালেও; আসলে তা নয়। একদিকে তো অ্যালিসার জন্য শারীরিকভাবে খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল শক্তপোক্ত ১৭ বছর বয়সী ছেলেদের সঙ্গে খেলাটা। তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো সমালোচকদের সামলানো। শুরুটা হল নাম গোপন রেখে এক বেকার কলেজেরই ছাত্রের পাঠানো মেইল থেকে। সেই ছাত্র দাবি করলেন, ইয়ান হিলির প্রভাবে এমন ‘নোংরা ও অবাস্তব’ একটা কাজ করেছে বেকার কলেজ। তার মতে মেয়েদের কিছুতেই এইরকম সুযোগ পাওয়া উচিত না। এই বিতর্কে স্বয়ং ইয়ান হিলিকেও কথা বলতে হয়েছিল সংবাদ মাধ্যমে। তবে এতো বছর পর এইসব নোংরামি, এই সব কুিসত সমালোচনা আর মনে করতে চান না অ্যালিসা। তার কাছে বরং ওই ছেলেদের সঙ্গে খেলাটাকে ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলেই মনে হয়, ‘খুবই মজার ব্যাপার ছিল ওটা। ওই বয়সী শক্তপোক্ত ছেলেদের সঙ্গে খেলতে অনেক দক্ষ হতে হয়। আমাকে নিজেকে সেভাবে তৈরি করতে হয়েছে।’ তা যে অ্যালিসা পেরেছেন, সেটা আজ আর তর্কের দাবি রাখে না। সেই পর্যায় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে চিনিয়েছেন। দুই দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন, হয়তো আরও একটা জিতবেন। অস্ট্রেলিয়ার জার্সি করে ১৬টি ওয়ানডে, ৪১টি টি-টোয়েন্টি খেলে ফেলেছেন; একটি টেস্টও খেলেছেন মেয়েদের অ্যাশেজে। জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার আরেক তারকা স্টার্ককে। তবে এতো কিছুর পরও অ্যালিসার নামের পেছনে ৩৮৫ ডিসমিসালের মালিক সর্বকালের অন্যতম সেরা উইকেটরক্ষক চাচার নামটা সেঁটেই আছে। চাচা যে কতো বড় ক্রিকেটার স্বাভাবিকভাবেই সেটা না বুঝেই বড় হয়ে উঠেছেন অ্যালিসা। চাচা তার চাচাই ছিলেন। ছোটবেলার সেই না বোঝা সময়ের কথা মনে করে এখন বরং লজ্জা পেয়ে যান অ্যালিসা, ‘একবার এসসিজিতে চাচা টেস্ট খেলছেন, আমি আরও কয়েক বান্ধবীর সঙ্গে খেলা দেখতে গেছি। ফেন্সিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আমি চাচা-চাচা বলে চিত্কার করছিলাম। এখন ভাবলে লজ্জা লাগে যে, কী করেছি! তবে চাচা কিন্তু বিরক্ত হননি। ঠিক ওভারের ফাঁকে এসে হ্যালো বলে গেছেন। এতেই বুঝতে পারেন, এই মানুষটার ভাতিজি হতে পেরে আমি কতোটা সৌভাগ্যবান। আসলে ছোটবেলায় আমরা বুঝতাম না, তিনি কতো বড় ক্রিকেটার, কতো বড় তার অর্জন। অনেক পরে বুঝেছি, ততোদিনে তিনি খেলা ছেড়ে দিয়েছেন।’ খেলা ছেড়ে দিলেও ইয়ান হিলির স্নেহমাখা হাত কখনোই অ্যালিসার মাথার ওপর থেকে সরে যায়নি। সে কথারও প্রমাণ অ্যালিসার কণ্ঠে, ‘আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল, আমি যে কোনো টেকনিক্যাল ব্যাপার নিয়ে সমস্যায় পড়লেই তার পরামর্শ নিতে পারি। কল্পনা করতে পারেন যে, আমার ছোটখাটো সমস্যাতেই ফোন করলেই সর্বকালের সেরা একজন উইকেটরক্ষকের পরামর্শ পাই! আমি কৃতজ্ঞ সৃষ্টিকর্তার প্রতি, এমন পরিবারে পাঠানোর জন্য।’ * অ্যালিসা হিলির কথা ‘দ্য আইল্যান্ড’ পত্রিকা থেকে গৃহিত।