বনকে বন হিসেবে থাকতে দিন
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৬
এখানে জলমগ্ন বরুণ, হিজল ও করচ বৃক্ষের প্রগাঢ় ছায়া এক মায়াময় অপার্থিব ভুবন সাজিয়ে রেখেছে মানুষের চোখের আড়ালে। আর সেই ভুবনের বাসিন্দা নানাজাতের পশুপাখি ও মাছেরা। প্রকৃতিবিদেরা ভালোবেসে এই বনের নাম দিয়েছেন প্রকৃতির জাদুঘর। বলছি রাতারগুলের কথা। পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকটি মিঠাপানির জলাবনের (ফ্রেশ ওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট) মধ্যে সিলেটের পূর্বাঞ্চলের গোয়াইন নদী তীরে অবস্থিত চিরসবুজ রাতারগুল উল্লেখযোগ্য। ৫০৪ দশমিক ৫০ একর আয়তনের এই সংরক্ষিত বন পার্শ্ববর্তী চেঙ্গির খালের সাথে সংযুক্ত। ভরা বর্ষায় এটির কিছু কিছু এলাকা ২০/৩০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং বছরের বাকি সময় পানির গভীরতা ১০ ফুটের বেশি হয় না। রাতারগুলে প্রাকৃতিকভাবে হিজল, করচ, বরুণগাছের পাশাপাশি বেত, ইকরা, মূর্তা (শিতলপাটি বানানোর প্রধান উপকরণ) ও শনজাতীয় গাছ রয়েছে। এছাড়া এই বন ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সাথে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি এবং নয় প্রজাতির উভচর প্রাণীর আবাসস্থল। ভ্রমণপিপাসুরা রাতারগুলের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ। এর লুকানো আরণ্যক বৈভব উপভোগের জন্য তারা উদগ্রীব।
ভ্রমণপ্রেমীরা যেন সহজে রাতারগুল পরিভ্রমণে যেতে পারেন সেজন্য সমপ্রতি পাহাড়, নদী আর হাওর মিলিয়ে এই চিরসবুজ জলার বনটিকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত করার ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকারের বনবিভাগ। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক রয়েছে। এতে করে রাতারগুলের নিজস্ব যে বৈশিষ্ট্য তা হুমকির মুখে পড়ছে। তবে পরিবেশবাদীদের তীব্র আপত্তির মুখে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য বাদ দিয়ে রাতারগুলকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে সেই পরিকল্পনার আওতায় গৃহীত প্রকল্পের অধীনে নির্মাণ ও পূর্তখাতে ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে টাওয়ার, বিশ্রামাগার ও রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। সেখানকার চিরিঙ্গি থেকে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৫ ফুট চওড়া রাস্তা নির্মিত হবে। বনের গভীরের প্রাকৃতিক মেঠো পথটি পাকা রাস্তায় রূপান্তরিত হবে এবং এই উদ্যোগের ফলে কাটা পড়বে রাস্তার দুইপাশের অনেক গাছ। সরাসরি বনবিভাগের ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড নেচার কনজারভেশন সার্কেল এর মাধ্যমে এসব অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। রাতারগুলের উন্নয়নে এসব কর্মকাণ্ড হচ্ছে বলে বনবিভাগ জানিয়েছে। বনরক্ষা ও পর্যটনকেন্দ্র একইসঙ্গে গড়ে তোলা এই দুই উদ্যোগ প্রায় বিপরীত দুই প্রকল্প বলা যেতে পারে। পর্যটনকে প্রাধান্য দেয়া হলে রাতারগুলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকবে না।
কারণ অসংখ্য মানুষ বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো সেখানে ভ্রমণে যাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পর্যটকদের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংক্রান্ত সচেতনতা খুব একটা নেই। এখনই ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে মানুষ রাতারগুলে যাচ্ছে, কোলাহল করছে নির্জনতা উপভোগের পরিবর্তে। আর এসবে ভীত সেখানকার আদিবাসিন্দা প্রাণীরা পালানোর পথ খুঁজছে।
পর্যটকদের প্রবল প্রতাপে লাউয়াছড়া প্রাকৃতিক বনটি ইতোমধ্যে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছে খানিকটা। পিকনিক পার্টির অব্যাহত আগমন, মাইক বাজিয়ে উচ্চনাদে গান-বাজনা বনের আসল বাসিন্দাদের দিশেহারা করে চলছে প্রতিনিয়ত। একইকথা খাটে অন্যান্য বন যেমন মধুপুর, সুন্দরবন ইত্যাদির বেলায়ও। যদিও এসব বনে চোরা কাঠশিকারীদের উপদ্রব কমাতে তেমন সফল হয়নি বনবিভাগ। রাতারগুলে উন্নয়নের নামে গৃহীত এসব পদক্ষেপ এখনি বন্ধ করা উচিত। এই চিরসবুজ বনটিকে ওয়াইল্ডারনেস অর্থাত্ বুনো সৌন্দর্য নামে অভিহিত করে আইনগতভাবে যে অবস্থায় এটি আছে তেমনি এটিকে থাকতে দেওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট এই ওয়াইল্ডারনেসকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এভাবে, লিভ ইট এ্যাজ ইট ইজ। ইউ ক্যাননট ইমপ্রুভ ইট। দেশটির ওয়াইল্ডারনেস সোসাইটি সুপারিশ করেছে কোন একটি দেশের বন্য এলাকা ৪,০০০ বর্গমাইলব্যাপী হওয়া উচিত। নতুবা এটি মনুষ্যসৃষ্ট বায়ু, বালি বা শব্দ দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই নিবন্ধে তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পের আরেকটি উদাহরণ দেয়াটা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দুইবছর আগে চট্টগ্রামের ভূজপুরে সেচকাজে সহায়তার জন্য নির্মিত ক্রস-রাবার ড্যাম হালদা নদীতে নোনাপানি প্রবেশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দি ডেইলি স্টারে এ সর্ম্পকে ৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে গতবছর মা মাছের ডিম উত্পাদনের পরিমাণ ১,৫৫৯ কেজি থেকে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৬২৪ কেজি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, চলতি বছর এই ডিম উত্পাদনের পরিমাণ আরো হ্রাস পাবে, যা দেশের সামগ্রিক মত্স্য খাতকেই হুমকির মুখোমুখি করবে। উল্লেখ্য, এই হালদা নদীই দেশের একমাত্র মিঠাপানির মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হালদার লবণাক্ততা ২০০০ পিপিএম পর্যন্ত পৌঁছেছে যেখানে স্বাভাবিক লবণাক্ততার পরিমাণ ৬৫০ থেকে ১০০০ পিপিএম বলে চট্টগ্রাম ওয়াটার সাপ্লাই ও সুয়ারেজ অথরিটি জানিয়েছে।
তাহলে এ থেকে প্রতীয়মাণ হয় যে, সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনে না। পৃথিবীজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ আহরণ, আহরণকালে অন্যান্য জীবজন্তু ও বৃক্ষরাজির বিনাশ এসবই মানুষের দানবীয় আকাঙ্ক্ষার কাছে প্রকৃতিকে অসহায় করে তুলেছে। মানুষ বনে ভ্রমণ করতে যাবে, অভ্যন্তরীণ পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ জরুরি। উভয় কাজেই বনরক্ষা ও পর্যটনের সমন্বয় ঘটাতে হবে। পরিবেশবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী রাতারগুলকে কেন্দ্র ও প্রান্ত এভাবে ভাগ করে প্রান্তকে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খোলা রাখা দরকার। আর কেন্দ্রকে রাখতে হবে পর্যটনের আওতামুক্ত। এছাড়া বনে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনচালিত নৌকা পুরো নিষিদ্ধ করতে হবে যেন এর উচ্চ শব্দ ও পোড়া তেল বনটির জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতির কারণ না হয়। বনে প্রবেশের মুখে সাইনবোর্ডে মানুষকে পানির বোতল ও খাবারের প্যাকেট বহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। মার্কিন ঔপন্যাসিক ওয়ালেস স্টেগনার বলেছেন, প্রত্যন্ত অরণ্যভূমি রক্ষা করা জরুরি। এটা বিবেচ্য নয় যে, প্রতিবছর কত অল্পসংখ্যক লোক সেখানে ভ্রমণ করে। আমাদের এই উপলব্ধিটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের একটি বুনো অরণ্য রয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক।