স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ, যেখানে সবাই পালাতে চায়!

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৮

বংলাদেশে এখন একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে। আগে কে বিসিএস ক্যাডার হবে। এখন প্রতিযোগিতা একটাই। কে আগে বিমানবন্দরে পৌঁছাবে। পাসপোর্টে ভিসার সিল যেন নতুন যুগের স্বর্ণপদক। বিমানবন্দরে বিদায়ের কান্না এখন আর দুঃখের নয়। এটি পারিবারিক সাফল্যের অনুষ্ঠান। আত্মীয়স্বজনের অভিনন্দনের ভাষাও বদলে গেছে। ‘ছেলে ডাক্তার হয়েছে' শুনে মানুষ যতটা খুশি হয়, তার চেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস দেখা যায় ‘ছেলে কানাডায় সেটেল হয়েছে' শুনে।

এখন বন্ধুদের মধ্যে আলোচনার বিষয়ও বদলে গেছে। আগে আলোচনা হতো রাজনীতি, ক্রিকেট কিংবা নতুন সিনেমা নিয়ে। এখন আলোচনা হয়, আইইএলটিএস, কোন দেশে পিআর পাওয়া সহজ, এসব বিষয় নিয়ে। একসময় বন্ধুরা বিসিএসের বই ভাগাভাগি করত। এখন ভাগাভাগি করে কানাডার কলেজের লিংক, জার্মানির ব্লকড অ্যাকাউন্টের হিসাব, অস্ট্রেলিয়ার স্কিলড ভিসার নিয়ম। মনে হয়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়, বিদেশ যাওয়ার ট্রানজিট লাউঞ্জ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে—মাত্র ছয় বছরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৭৩ কোটি ডলারেরও বেশি হয়েছে। পুরো অর্থবছর শেষে তা ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। অর্থনীতির ভাষায়—এটি বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়—এটি আস্থার বহিঃপ্রবাহ। আর সাধারণ মানুষের ভাষায়—এটি ‘দেশে আর ভরসা নেই' নামক একটি নীরব গণভোট।

মজার বিষয় হলো—আমরা এখনো গর্ব করে বলি, আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আছে। অর্থাৎ বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদ প্রতিদিন নিজের পায়ে হেঁটে, কখনো স্টুডেন্ট ভিসায়, কখনো স্কিলড মাইগ্রেশনে, কখনো গবেষণার নামে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা বসে বসে গুনছি কত জন বিদেশে পড়তে গেল। আমরা তরুণদের প্রায়ই অভিযুক্ত করি। বলি, তাদের দেশপ্রেম নেই। তারা কষ্ট করতে চায় না। তারা বিদেশপাগল। কিন্তু একটু উলটো প্রশ্ন করা যাক—দেশ কি তাদের থাকার মতো উপযুক্ত পরিবেশ দিয়েছে? একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে দেখে চাকরির বাজারে তার ডিগ্রির দাম কম, পরিচিতির দাম বেশি। সিভির চেয়ে ভিজিটিং কার্ডের মূল্য বেশি। মেধার চেয়ে নেটওয়ার্ক শক্তিশালী। যোগ্যতার চেয়ে সুপারিশ কার্যকর। সে বুঝে যায়, এখানে জীবন একটি ম্যারাথন নয়। এটি অনেকটা ভিআইপি লেনের ট্রাফিক। যার পরিচয় আছে, সে আগে যাবে। বাকিরা জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকুক।

এমনিতেই দেশে চাকরির বাজার খুব ছোট। তাতে আবার অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি হয় না। আবার কোথাও অভিজ্ঞতার চেয়েও জরুরি হয়ে ওঠে পরিচয়। তখন তরুণরা বুঝে যায়, এখানে সিভির সঙ্গে আরেকটি অদৃশ্য কাগজও লাগে। সেটির নাম 'আমি কার লোক'। আমরা আবার অবাক হয়ে বলি, ‘ছেলেমেয়েরা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে কেন?'

একজন তরুণ যখন প্রথম চাকরিতে ৩০ হাজার টাকা বেতন পায়, তখন তাকে অর্থনীতির কঠিন সমীকরণ শেখার দরকার হয় না। বাসাভাড়া, বাজার, চিকিৎসা, যাতায়াত আর পরিবারের দায়িত্বের হিসাব কষতে কষতেই সে বুঝে যায়, মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতন শেষ হয়ে গেছে। অথচ একই যোগ্যতায় বিদেশে কয়েক গুণ বেশি আয়ের সম্ভাবনা সামনে ঝুলছে। তখন দেশপ্রেম আর মাসিক বাজেটের লড়াইয়ে কে জিতবে, সেটি অনুমান করতে অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকটা এমন একটি কারখানার মতো, যেখানে হাজার হাজার চাবি তৈরি হয়, কিন্তু কোন তালায় সেই চাবি লাগবে, সেটি কেউ জানে না। কনভোকেশনের দিন শিক্ষার্থীরা গাউন পরে ছবি তোলে। কয়েক মাস পর একই মানুষ চাকরির পরীক্ষার কোচিংয়ে বসে নতুন করে জীবন শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় যেন কর্মজীবনের প্রস্তুতি নয়, চাকরির প্রস্তুতির প্রস্তুতি। তারপর শুরু হয় নতুন জীবন। আইইএলটিএস, জিআরই, টোফেল। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর আবার আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি। পার্থক্য শুধু একটাই। এবার গন্তব্য বাংলাদেশের বাইরে।

আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার আলোচনা যত বেশি হয়, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এজেন্টদের ব্যবসাও তত বাড়ে। মনে হয়, আমরা শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সেমিনার করছি, আর পাশের কক্ষে কেউ বিমানের টিকিট কাটছে। ঢাকার কিছু এলাকায় বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেখে মনে হয়, এটাই বুঝি দেশের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান শিল্প। আমরা তরুণদের বলি—উদ্যোক্তা হতে। আবার উদ্যোক্তা হতে গেলে এমন জটিলতা তৈরি করি যে, অনেকেই শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তা না হয়ে অভিবাসী হয়ে যায়। ব্যবসা করতে গেলে অনুমতি, লাইসেন্স, নিয়ম, অনিয়ম, কর, হয়রানি, অনিশ্চয়তা। ফলে অনেকের কাছে কানাডার বরফ বাংলাদেশের ফাইলের চেয়ে সহজ মনে হয়। আমরা বলি, ‘নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করো।' তারপর এমন এক গোলকধাঁধা বানাই, যেখানে ব্যবসা শুরু করার আগেই উদ্যোক্তার উদ্যম শেষ হয়ে যায়।

বিদেশের জীবন নিয়েও আমাদের কল্পনার শেষ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, কেউ তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে। কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে। কেউ কফিশপে বসে ল্যাপটপ খুলে কাজ করছে। ছবির বাইরে থাকে শূন্য ডিগ্রির ঠান্ডায় বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা, তিনটি পার্টটাইম চাকরি, একাকিত্ব, মানসিক চাপ, সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ। অনেকেই সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করে, বিকেলে রেস্টুরেন্টে কাজ করে, রাতে লাইব্রেরিতে পড়ে। সপ্তাহান্তে কাপড় ধোয়া, রান্না আর হিসাব মেলাতেই ছুটি শেষ। তবু তারা থেকে যায়। কারণ সেখানে অন্তত একটি বিশ্বাস আছে। আজকের পরিশ্রম আগামী দিনের সম্ভাবনা তৈরি করবে। এখানে সেই বিশ্বাসটাই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এই বিশ্বাসের সংকটই আসল সংকট।

আমরা প্রায়ই মেধা পাচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করি। শব্দটি শুনতে খুব নাটকীয়। যেন কেউ রাতের অন্ধকারে মেধা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবে কেউ মেধা চুরি করছে না। মেধা নিজেই হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছে। একটি গাছ যদি শুকিয়ে যায়, পাখিকে দোষ দিয়ে লাভ কী? ইতিহাসও একই কথা বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপ থেকে বহু বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন। তাদের মেধাই পরে আমেরিকার প্রযুক্তিগত শক্তির ভিত্তি গড়ে দেয়। মেধা শেষ পর্যন্ত সেই দেশেই থাকে, যেখানে তাকে সম্মান করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো—সমাধান কী? সমাধান বিমানবন্দরে ব্যারিকেড বসানো নয়। বিদেশে পড়তে যাওয়া কঠিন করে তোলা নয়। দেশপ্রেমের বক্তৃতা দিয়ে তরুণদের অপরাধবোধে ভোগানোও
নয়। সমাধান হলো—এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে মেধা সুপারিশের কাছে হারে না। যেখানে গবেষণার জন্য আবেদন করলে প্রথম প্রশ্ন হয় না, 'আপনি কার লোক?' যেখানে চাকরি পাওয়ার জন্য যোগ্যতার সনদই যথেষ্ট। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেয় না, দক্ষতাও তৈরি করে। যেখানে একজন তরুণ জানে, পরিশ্রম করলে তার ফল সে পাবে।

সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে তরুণদের সঙ্গে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি করতে হবে। সেই চুক্তির ভাষা হবে খুব সহজ। তুমি তোমার মেধা দাও, আমরা তোমাকে ন্যায্য সুযোগ দেব। তুমি পরিশ্রম করো, আমরা তোমার পথ বন্ধ করব না। তুমি স্বপ্ন দেখো, আমরা সেই স্বপ্নকে উপহাস করব না।

যে দেশে সবচেয়ে মেধাবী তরুণরা ভবিষ্যৎ খুঁজতে বারবার আকাশের দিকে তাকায়, সেই দেশের উচিত শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করা নয়, এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে উড়ে যাওয়ার আগে মানুষ অন্তত একবার ভেবে দেখবে, “থেকেও তো হয়।'

কারণ দেশপ্রেম কখনো বক্তৃতায় জন্মায় না। দেশপ্রেম জন্মায় সুযোগে, ন্যায়বিচারে, মর্যাদায় এবং আস্থায়। যে রাষ্ট্র নিজের তরুণদের এই চারটি জিনিস দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র যত উন্নয়নের গল্পই শোনাক, শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে মূল্যবান রপ্তানি হয়ে দাঁড়ায় নিজের মেধাবী নাগরিক। আর তখন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে ওঠে কোনো সেতু নয়, কোনো মেট্রোরেল নয়, বরং একমুখী বিমানের টিকিট!

লেখক : রম্যরচয়িতা

ইত্তেফাক/এনএন