ই-বর্জ্য : দায়িত্বহীনতার মূল্য কে দিবে?

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৬

আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার ইতিহাসের বৃহৎ একটি অংশ উপভোক্তার পণ্য ব্যবহারের ইতিহাস; কিন্তু আগামী শতাব্দীর ইতিহাস সম্ভবত বর্জ্যের ইতিহাস হইবে। আজ আমরা স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ কিংবা ল্যাপটপ কিনিয়া নিজেদের আধুনিক বলিয়া মনে করি; কিন্তু এই যন্ত্রগুলি নষ্ট ও অকার্যকর হইবার পরে তাহাদের মাধ্যমে যেই বিষাক্ত পৃথিবী জন্ম লয়—তাহা লইয়া আমরা, বিশেষ করিয়া তৃতীয় বিশ্বের মানুষ খুব একটা চিন্তাভাবনা করি না। এইভাবে প্রযুক্তির আলো উপভোগ করিতে করিতে আমরা অদৃশ্য অন্ধকারের ভিত রচনা করিতেছি। অথচ জাতিসংঘের ‘গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪'-এর তথ্য বলিতেছে, ২০২২ সালে পৃথিবীতে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য সৃষ্টি হইয়াছে। পুনঃপ্রক্রিয়াজাত (রিসাইকেল) হইয়াছে মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ পৃথিবী এখন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের চেয়ে দ্রুতগতিতে ইলেকট্রনিক কবরস্থান নির্মাণ করিতেছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন মূল্যবান ধাতু, প্লাস্টিক ও কাচ অপচয় হইতেছে, অন্যদিকে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নীরবে মাটি, নদী ও মানুষের শরীরে প্রবেশ করিতেছে। ইহা কেবল পরিবেশগত ক্ষতি নহে, অর্থনীতিরও এক অপূরণীয় অপচয়।

বাংলাদেশেও দৃশ্যটি ভিন্ন নহে। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ই-বর্জ্য উৎপন্ন হইলেও আনুষ্ঠানিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নগণ্য। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বর্জ্যের মধ্যেই লুকাইয়া আছে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ—স্বর্ণ, রুপা, তামা ও বিরল ধাতু। আমরা যেন এমন এক জাতি, যাহারা স্বর্ণের খনি আবর্জনা ভাবিয়া ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে। আরো দুঃখজনক এই যে, ই-বর্জ্যের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে বিচ্ছিন্ন করা হয়, যেইখানে পরিবেশ ও শ্রমিক—উভয়েই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষেত্রে সমস্যাটি প্রযুক্তির নহে, সমস্যাটি রাষ্ট্রচিন্তার। যেই রাষ্ট্র-সমাজ পুরাতন প্রযুক্তির বিদায় আয়োজন করিতে জানে না, সেই রাষ্ট্র কেবল ভোক্তার রাষ্ট্র। ভোগের সহিত দায়িত্বের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হইলে সভ্যতা অগ্রসর হয় না, কেবল আবর্জনার স্তূপ উঁচু হয়।

উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা এই সত্যই শিক্ষা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ডব্লিউইইই নির্দেশনা' (WEEE Directive) প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করিবার দায় প্রদান করিয়াছে। এই নীতিকে বলা হয় ‘বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা' (এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি)। জাপানে পুরাতন ফ্রিজ বা টেলিভিশন যত্রতত্র ফেলিয়া দেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিটি যন্ত্রের জীবনচক্র পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রহিয়াছে। অর্থাৎ উন্নত দেশগুলি বুঝিয়াছে, বর্জ্য আসলে অর্থনীতির শেষ অধ্যায় নহে— ইহাই পরবর্তী উৎপাদনের প্রথম অধ্যায়। এই ধারণাকেই বলা হয় ‘চক্রাকার অর্থনীতি' (সার্কুলার ইকোনমি)। সেইখানে বর্জ্যকে ব্যয় নহে, বিনিয়োগ বলিয়া বিবেচনা করা হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা এখনো ই-বর্জ্যকে আবর্জনা বলিয়াই দেখি। ফলে হাজার হাজার অনিয়ন্ত্রিত কর্মশালায় শিশুশ্রমিক ও দরিদ্র শ্রমিকেরা খালি হাতে সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ধাতুর সংস্পর্শে আসিতেছে। পরিবেশ দূষিত হইতেছে, মানুষ অসুস্থ হইতেছে, অথচ রাষ্ট্রের নথিপত্রে সকল কিছুই যেন শৃঙ্খলাবদ্ধ।

বাংলাদেশে ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১' রহিয়াছে; কিন্তু আইন যদি প্রয়োগ না হয়, তাহা হইলে আইন গ্রন্থাগারের অলংকারমাত্র। প্রয়োজন বাধ্যতামূলক পণ্য-ফেরত (টেক- ব্যাক) ব্যবস্থা, উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, ডিজিটাল অনুসরণ (ট্র্যাকিং) ব্যবস্থা, নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং নাগরিক সচেতনতা। বিদ্যালয় হইতে শুরু করিয়া স্থানীয় সরকার পর্যন্ত সর্বত্র ই-বর্জ্য পৃথক সংগ্রহের সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিতে হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি খাতকে একই নীতিমালার অধীনে সমন্বিতভাবে কাজ করিতে হইবে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, কোনো সমাজ নিজের বর্জ্য সামলাইতে না পারিলে সেই সমাজ নিজের ভবিষ্যৎও সামলাইতে পারিবে না। ই-বর্জ্য আজ কেবল পরিবেশের প্রশ্ন নহে—ইহা রাষ্ট্রবোধ, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন। প্রযুক্তি যদি উন্নতির প্রতীক হয়, তাহা হইলে তাহার পরিণতিও উন্নত হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় আমরা যন্ত্রের যুগে প্রবেশ করিব; কিন্তু সভ্যতার যুগে নয়।

ইত্তেফাক/এনএন