বিকেন্দ্রীকরণ আর কাহাকে বলে
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২০
যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, প্রশাসন সেই দলের লোকজনের কথা অনুযায়ীই চলে। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় প্রশাসনিক নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করা হয় না। বিশেষত রাজধানী ঢাকার বাহিরে এই অবস্থা অধিক পরিলক্ষিত হয়। সেখানে সবকিছু ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মর্জিমাফিক চলে। প্রশাসন বলিয়া যে কিছু আছে তাহা অনেক সময় বোঝাই যায় না। যিনি জেলার দায়িত্ব্বে থাকেন, তিনি জেলার অধীনস্থ সকল উপজেলা নিয়ন্ত্রণ করেন। তাহার অঙ্গুলি হেলনে এখানে সবকিছু হয়। অনেক সময় মুখের জোরে আবার কখনো পেশির জোরে তাহার নির্দেশ মানিতে বাধ্য করা হয়। তাহাদের কথামত প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উঠবস করিতে হয় এবং তাহাদের নির্দেশ অনুযায়ী ন্যায়-অন্যায় না করিলে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ইহার মধ্যে বদলি করিয়া দেওয়ার প্রবণতাই অধিক। এমনকি দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকিয়াও কেহ কেহ প্রশাসনের লোকেদের বদলি করিয়া দিবার ক্ষমতা রাখেন বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। অথচ বদলির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকারের নির্দিষ্ট বিভাগ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যিনি আছেন তিনি সরকার প্রধানও বটে। শেষপর্যন্ত সকল ন্যায়-অন্যায়ের দায়-দায়িত্ব তাহার উপর বর্তায়। কিন্তু দলীয় নির্দেশে বা তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কথায় কথায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলি করার এই অপসংস্কৃতি কি বন্ধ হইবে না? সরকার বাছ-বিচারহীনভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপর এইভাবে খড়গহস্ত হইবে কেন?
অন্যদিকে আমাদের দেশে এক শ্রেণীর এনজিও কর্মী, সমাজসেবী ও সুশীল সমাজের লোক আছেন যাহারা সুযোগ পাইলেই নসিহত খয়রাত করেন। তাহারা প্রায়শ যে কথা বলিয়া থাকেন তাহা হইল, আমাদের প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করিতে হইবে। তাহাদের অনেকে বিদেশি অর্থের পৃষ্ঠপোষকতায় চলিলেও এসব দাবি তুলিবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবস্থা ও আইন-কানুনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন বলিয়া মনে হয় না। প্রকৃতপক্ষে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনার যে বিধি-বিধান রহিয়াছে তাহা অনুত্তম নহে। কিন্তু ঐসব সুন্দর সুন্দর বিধি-বিধান কেবল কাগজে-কলমেই আছে, বাস্তবায়ন নাই বলিলেই চলে। ফলে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা এক বা সীমিত সংখ্যক ব্যক্তির হস্তে কুক্ষিগত হইয়া গিয়াছে। যেমন-উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি আছে। এই কমিটিগুলিতে হাইস্কুলের প্রধান ও এনজিও প্রতিনিধিসহ স্থানীয় সত্, নিষ্ঠাবান ও জনহিতকর কাজে উত্সাহী ব্যক্তির উপস্থিতিও লক্ষণীয়। এমনকি এসব কমিটির সদস্য মনোনয়নে জেলা প্রশাসকের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। টিআর-কাবিখা কোন্ কমিটির মাধ্যমে এবং কিভাবে বন্টন করা হইবে তাহার ব্যাপারেও নির্দিষ্ট বিধান আছে। ইহার আরও উত্তম বিকেন্দ্রীকরণ কীরূপ হইতে পারে! সুশীল সমাজ কিন্তু সে ব্যাপারে নিশ্চুপ।
স্থানীয় প্রশাসনের দুর্গতি ও স্থানীয় সরকারের হতাশাজনক পরিস্থিতি দেখিয়া বলা যায়, দোষ আসলে নিয়মের নহে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থার। আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মনেপ্রাণে চাহিলেও আমাদের মন-মানসিকতায় তাহা আমরা আজও ধারণ করিতে পারি নাই। আমরা এতদিন এই সমাজটাকে আধা-সামন্তবাদি বলিয়া দাবি করিয়া আসিয়াছি। কিন্তু স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়াছে, তাহাতে মনে হয় এই সমাজ এখনও মোড়লিপনা বা তালুকদারি প্রথায় চলিতেছে। এখানে এক বা দুইজনের কথাই যেন শেষ কথা। আমাদের সমাজ আধুনিক বা কসমোপলিটন হয় নাই। ফলে কোন নিয়ম-শৃঙ্খলা কার্যকরী হইতেছে না। এই অবস্থা সৃষ্টির অন্যতম কারণ, যাহারা যেইসব কমিটি বা পদ-পদবীতে আছেন তাহারা বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করিতেছেন না। বরং তোষামোদী কিংবা নিস্পৃহ থাকিবার নীতিই তাহারা অবলম্বন করিয়া চলিয়াছেন। তাহাছাড়া স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নহে। বাজেট ও উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষি। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে স্থানীয় সরকার কাহারও উপর নির্ভরশীল নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোন প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট হইতে অর্থ ধার করিলেও একসময় তাহা পরিশোধের চেষ্টা করা হয়। আমাদের দেশে এরূপ ব্যবস্থা গড়িয়া উঠিলে এবং স্থানীয় সংস্থাগুলি আইন অনুযায়ী ও গণতান্ত্রিক পথে চলিতে পারিলে তৃণমূলের প্রশাসনের মুক্তির পথও খুলিয়া যাইবে বলিয়া আমরা মনে করি।