দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে ছানি অপারেশন
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫৯
লিয়ন, মারুফ, রাজা মিয়া, নাজমুল, মনিষা, আনোয়ারা, নাসের সাতজন বিভিন্ন বয়সের শিশু। তারা বাস করে গাইবান্ধা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সকলেই চোখের ছানি নিয়ে স্বচ্ছ এই পৃথিবীকে আবছা দেখতো। তাদের চোখের আলো ফিরে পাওয়া নিয়ে নানা শঙ্কা ছিল পরিবারের। তারা অনেকে এতই দরিদ্র যে শিশুদের চোখের ছানির বিষয়টি পর্যন্ত জানা ছিল না। তারাই আজ বাংলাদেশ আই হসপিটালে ছানি অপসারণের মধ্য দিয়ে নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
২০১০ সালে বাংলাদেশের শিশুর স্বাস্থ্য বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় দেখা যায় , দেশের ৪০ হাজার অন্ধ শিশুর এক তৃতীয়াংশরই মূল কারণ ছানি। ছানিজনিত অন্ধত্ব রোধ করতে ২০০৫ সাল থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র শিশুদের বিনা মূল্যে ছানি অপসারণ করছে বাংলাদেশ আই হসপিটাল। এ কাজে তাদের আর্থিক সহায়তা করছে একটি বেসকারি ব্যাংক। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের চোখের ছানি আক্রান্ত শিশুর সন্ধান দিচ্ছে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা।
চিকিত্সক জানান অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে ছানি আক্রান্ত এই সকল শিশু এক সময় অন্ধত্ব বরণ করে অন্যের বোঝা হতে বাধ্য হয়। অথচ অতি সহজে অপারেশন করে পেতে পারে স্বাভাবিক জীবন, নিতে পারে পরিবারের দায়িত্ব।
গাইবান্ধা থেকে ঢাকা : শুক্রবারের সকাল থেকেই ধানমন্ডিস্থ বাংলাদেশ আই হসপিটালের অপারেশন থিয়েটারে ব্যস্ত অপারেশন-ক্রু। পেডিয়াট্রিক অফথালমোলজি বা শিশু চক্ষুরোগ বিভাগের প্রধান ডা সাব্বির আনোয়ারের নেতৃত্বে অপারেশন হয় ছোট্ট লিয়নের। ওর বয়স সবে দেড় বছর । দুই চোখে ছানি আছে তার। নাসের (১০) এবং রাজা মিয়ার (১৬ ) একই অবস্থা। তাদেরও দুই চোখেই ছানি।
ডা সাব্বির আনোয়ার বলেন, আমরা ওদের আজ এক চোখের অপারেশন করলাম। এক মাস পরে অন্যটি করা হবে। এক সাথে দুই চোখের অপারেশন হয় না। কারণ কোন ভাবে এক চোখে ইনফেকশন হলে তা দ্রুত অন্য চোখে ছড়াতে পারে। রাজা মিয়ার বয়স ষোল বছর। সাতজনের মধ্যে সেই বড়। রাজা জানায়, অপারেশনের পর সে চোখে দেখতে পাবে বলে জানিয়েছে চিকিত্সক। এতদিন সে দুই চোখেই আবছা দেখতো। একই কথা জানান, ছয় বছরের অটিস্টিক শিশু আনোয়ারার দাদি নূরি বেগম।
ছানিযুক্ত শিশুদের খুঁজে বের করা এবং তাদের ঢাকা নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ফিল্ড ফেসিলেটেটর লাবনী দত্ত। তিনি জানান, অভিভাবকরা বলেন, অপারেশন করলে যদি এর চেয়ে খারাপ হয়। কেউ বলেন মায়ের পেটে থেকে হওয়া ছানি দূর হয় না। এসব নানা কুসংস্কার দূর করে আগের ভাল হওয়া শিশুদের উদাহরণ দিয়ে নানাভাবে বুঝানো হয়েছে। পরে তাদের বিনা মূল্যে অপারেশন, ওষুধ, আর যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থার কথা নিশ্চিত করে তাদের আনা হয়েছে।
ছানি কি, কেন হয়: ডা সাব্বির আনোয়ার জানান, ধারণা করা হয় তীব্র সূর্যের তাপ, অপুষ্টি, মাতৃ অপুষ্টি, গর্ভকালীন মায়ের রুবেলা ভাইরাস ইনফেকশনের কারণে শিশুর ছোখে ছানি হতে পারে। তিনি আরও জানান, চোখের লেন্সের স্বচ্ছতা হারিয়ে ঘোলা হলে তাকে ছানি বলে।
ডা সাব্বির আনোয়ার জানান, ২০০৫ সালের শুরুর দিকে ব্যাংকের সাথে তাদের দরিদ্র শিশুদের চক্ষু সেবা দান কর্মসূচি শুরু হয়। সেময় প্রথম চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৪ জন শিশুর ছানি অপসারণ করা হয়। দেড় বছর নানা কারণে তাদের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ২০১১ সালে গাইবান্ধার ১৫ জন শিশুর ছানি অপসারণের মাধ্যমে আবার তা শুরু হয়। এযাবত্ ১১ শতাধিক শিশুর ছানি অপারেশন করেছে বাংলাদেশ আই হসপিটালে। এখানে দরিদ্র শিশুদের বিনা মূল্যে অপারেশনের যাবতীয় সহযোগিতা (দূরের হলে অভিভাবকদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়াসহ) করা হবে এবং যারা ব্যয়ভার বহন করতে পারবে, তারা নিজ খরচে আমাদের সেবা গ্রহণ করবে।