টার্গেট বাগদাদ
প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৪, ২১:৩০
ইরাকে শিয়া-সুন্নি দাঙ্গা আসন্ন। অনেকে এটাকে বলছেন গৃহযুদ্ধ। সুন্নিপন্থি সাদ্দাম হোসেনের পতন এবং বাগদাদে শিয়া শাসন কায়েমের পর কোণঠাসা মানুষেরাই হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। যাদের বলা হচ্ছে, সুন্নি বিদ্রোহী। এসব অস্ত্রধারীদের অনেকেই সাদ্দাম গঠিত সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত কমান্ডো আর সদস্য। তবে বাগদাদ তাদের জঙ্গিবাদী আখ্যা দিতেই অধিক আগ্রহী। আল-কায়েদার সাথে এসব বিদ্রোহীদের যোগসূত্র এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে আল-কায়েদার কাছ থেকেই তারা যে এমন লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা পেয়েছে, সেটা নিশ্চিত। তাদের বিরুদ্ধে বাগদাদের শিয়াপন্থি সরকার এমনকি প্রতিবেশী ইরানের ধর্মীয় নেতারাও হুংকার দিচ্ছেন এক সুরে। তাদের সম্মিলিত আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার শিয়া যুবক গেরিলা প্রশিক্ষণে নাম লিখিয়েছে। সুন্নি গেরিলাদের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নামবে শিয়া গেরিলারা। আর তা নিশ্চয়ই চেয়ে চেয়ে দেখবে না যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক ছেড়ে চলে গেছে, তাতে কি? আবার ফিরতে তো বাধা নেই। তাই ইরাকী সেনাবাহিনীর সামরিক ও কৌশলগত সাহায্য দেয়ার কথা বলে ইরাকে তিনশ’ সেনা অফিসার পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি অবশ্য বলেছেন, তিনশ’ জনই সামরিক উপদেষ্টা।
মসুল, তিকরিত, রামাদি, ফাল্লুজাসহ বিভিন্ন শহর-নগরী আগেই দখলে নিয়েছে সুন্নি চরমপন্থিরা। রাজধানী বাগদাদ থেকে মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার দূরে রামাদির অবস্থান আর ফাল্লুজা বাগদাদের মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার পশ্চিমে। শনিবার তারা সিরিয়া সীমান্তবর্তী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কায়িম শহর এবং রাওয়া দখল করে নেয়। দীর্ঘ লড়াইয়ে মারা যায় ত্রিশজন ইরাকি সেনা। এরপর কায়িম শহর তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সেখানে ইরাকি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক হেড কোয়ার্টারও তারা নিয়ন্ত্রণে নেয়। পালিয়ে যায় ইরাকি সেনারা। সুন্নি গেরিলাদের অগ্রগতি দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে তারা বাগদাদের দিকে এগুচ্ছে। তাদের একমাত্র টার্গেট এখন বাগদাদ।
আনবার প্রদেশে নানা উপজাতির বাস। সুন্নি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, রক্তপাত ছাড়াই ঐ প্রদেশের শহর ও গ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিতে উপজাতি নেতাদের সাথে সমঝোতা করছেন তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্ভবত বিদ্রোহীরা গোটা ইউফ্রেতিস উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায়। সে লক্ষ্যেই তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এগুচ্ছে। কায়িম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্রসহ যুদ্ধের অন্যান্য রসদ সরবরাহ লাইন নিরাপদ রাখতে চায় গেরিলারা। সুন্নি বিদ্রোহীদের সংগঠন আইসিসের রয়েছে দশ হাজার বন্দুকধারী। যারা একই সাথে ইরাক ও সিরিয়ায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
শিয়া-সুন্নি বিরোধ ইরাকে নতুন নয়। নতুন হলো রক্তক্ষয়। বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং তা আরো হয়তো দেখতে হবে বিশ্ববাসীকে। এছাড়া এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছে বহু মানুষ। জাতিসংঘের হিসেবে চলতি বছরে সেসব মানুষের সংখ্যা দশ লাখ। এর মধ্যে পাঁচ লাখই ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী মসুলের। সুন্নি বন্দুকধারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকী সেনাবাহিনীর সাহায্যে মাঠে নেমেছে আরেক সশস্ত্র গেরিলা গোষ্ঠী। যার নাম মাহদী আর্মি। ইরাকের প্রভাবশালী শিয়া ধর্মীয় নেতা মুক্তাদা আল সদরের অনুগত তারা। বাগদাদে অস্ত্র উঁচিয়ে নিজেদের শক্তিও প্রদর্শন করে মাহদী আর্মি। ইরাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। তবে দেশটির শীর্ষ শিয়া নেতা গ্রান্ড আয়াতুল্লাহ আলি আল-সিস্তানির আহ্বান সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে। এমনকি ইরান থেকেও হাজার হাজার যুবক ইরাকে গিয়ে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হচ্ছে। সব মিলিয়ে ইরাকে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যা থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় আপাতত কারো জানা নেই।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ব রাজনীতিতে সম্ভবত আবারো নিজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান মেলে ধরতে যাচ্ছে ইরাক। কারণ আট বছরের ইরাক যুদ্ধ আর সবশেষে আরব বসন্তের পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার নতুন পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লো। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব, পুরোনো বন্ধু সৌদিআরব আর মিসরকে হাতে রাখাসহ বহু স্বার্থ গোষ্ঠীর হিসাব এর সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়া বাইজিতে ইরাকের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার সুন্নি বিদ্রোহীরা দখল করে নেয়ায় রীতিমতো অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্ব তেলের বাজার। অন্যান্য তেল ক্ষেত্রগুলো বন্দুকধারীদের দখলে যাওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চরমপন্থার বিরুদ্ধে ইরাক সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। বাগদাদ তা কিভাবে মোকাবিলা করে সেটাই দেখার বিষয়। তবে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কি করতে চায়, তা এখনও পরিষ্কার নয়। সংকট সমাধানে সামরিক অভিযানকে যথেষ্ট মনে করে না হোয়াইট হাউস। ইরাক ওয়াশিংটনের কাছে সুন্নিদের উপর বিমান হামলা চাইলেও বিবিসি জানিয়েছে অন্য কথা। সংকটের জন্য ইরাকী প্রধানমন্ত্রী নূরি আল মালিকিকে দায়ী মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কারণ সুন্নি সংখ্যালঘুদের প্রতি তাঁর সরকারের অবহেলা দৃশ্যমান। সরকার কাজ করেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের স্বার্থে। আর সেখান থেকেই বিদ্রোহের সূত্রপাত। এমনটাই বিশ্বাস করে হোয়াইট হাউস। এসব কারণে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ঝামেলার মধ্যে আছেন ইরাকের কূটনীতিক ও রাজনীতিকরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সুন্নি গেরিলা সংগঠন আইসিস সদস্যরা ইরাকী সেনা সদস্যদের চেয়ে অনেক বেশি যুদ্ধে পারদর্শী, অনেক বেশি প্রশিক্ষিত এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রসমৃদ্ধ। বিবিসি জানিয়েছে, বাগদাদ সরকারও আইসিসের বিরুদ্ধে পুরোদমে যুদ্ধে জড়াতে তেমন উত্সাহ দেখাচ্ছে না। কারণ ইরাকী বিমান বাহিনীর কাছে আমেরিকান হেলফায়ার নামের যে ক্ষেপণাস্ত্র ছিলো, তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে দুই সপ্তাহ আগে। এছাড়াও ঐ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার মাত্র দু’টি বিমান রয়েছে ইরাকের। এছাড়া আইসিস নিজেদের জন্য সিরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে গোপন ও নিরাপদ স্বর্গরাজ্য তৈরি করেছে, যার নাগাল পাওয়া ইরাকের পক্ষে কঠিন। তা সত্বেও শিয়া গেরিলা গোষ্ঠীর শক্তি প্রদর্শন বা সরকারের উপর অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি বেশ বেকায়দা এবং বিরক্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে নূরি আল মালিকির সরকারকে। কারণ এর ফলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ছে। এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির খুব শিগগিরই ইরাক যাবার কথা রয়েছে। সংকট মোকাবেলায় তিনি সরকারের মন্ত্রিসভায় সুন্নিদের জায়গা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নূরি আল মালিকিকে চাপ দেবেন বলে জানা গেছে।