যেখানে গাছের ডাল ভাঙ্গাও নিষেধ
প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৪, ২১:৩১
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের এক গ্রাম, নাম— খনোমা। এখানে বছর বিশেক আগে কারো বাড়িতে বিশেষ কেউ বেড়াতে গেলে তাকে আপ্যায়ন করা হতো বানর ও বিপন্ন হরিণের মাংস দিয়ে। কিন্তু এখন এরকম চিন্তা ভুলেও কেউ করে না। এ প্রত্যন্ত গ্রামটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ব্যাপারে সারা ভারতে দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিকার ও বৃক্ষ নিধনকে সামাল দিয়ে খনোমা অঞ্চলের লোকজন দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের দ্বারা অনেক কিছুই সম্ভব। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এ গ্রামের লোকজন এতটাই সচেতন যে, তরুণরা নাম লেখাচ্ছে ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন হিসেবে। অনুমতি ছাড়া এখানে কেউ গাছের ডালও ভাঙে না। গত বিশ বছরে বন ছড়িয়ে পড়েছে ৭০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে।
১৯৯৮ সালে গ্রামবাসীরা মিলে গঠন করেন খনোমা নাচার কনজারভেশান এন্ড ট্রাজোপান স্যাংটিউরি (কেএনসিটিএস)। ব্লিথ’স ট্রাজোপানসহ স্থানীয় বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষাই তাদের এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য। ব্লিথ’স ট্রাজোপানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এরা গহীন অরণ্যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সংগঠিত হওয়ার পর তারা প্রথমেই যে কাজটি করে তা হলো— শিকার ও বৃক্ষ নিধনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন। শিকারের উদ্দেশ্যে স্যাংটিউরিতে (আশ্রয়স্থল) ঢুকেছে, এটি প্রমাণিত হলেই ওই ব্যক্তিকে ৩ হাজার রুপি জরিমানা গুনতে হয়। এখানেই শেষ নয়, তার পরিবারকেও ধার্য করা হয় সম্মিলিত জরিমানা। অলাভজনক একটি সংগঠনের হয়ে কাজ করা পংকজ গগই খনোমা অঞ্চলটিকে দেখছেন প্রায় পঁচিশ বছর ধরে। তাঁর মতে, এখানে বিপ্লব ঘটে গেছে এবং তা সম্ভব হয়েছে সবাই সবকিছুকে সংরক্ষণবাদী চোখে দেখার কারণে। গ্রামটিকে সারা ভারতে চিনে এখন প্রথম “সবুজ গ্রাম” হিসেবে।
কেএনটিসি গঠিত হওয়ার দু’বছর পরই গঠন করা হয়েছিল খনোমা পর্যটন উন্নয়ন বোর্ড। এসবের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে গুজরাট-ভিত্তিক অলাভজনক সংগঠন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট এডুকেশন (সিইই)। সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে তারা। এক্ষত্রে প্রথমে উদ্বুদ্ধ করেছে খনোমা গ্রাম পরিষদকে। এরপর তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে আমজনতাকে নির্দেশ মানতে বাধ্য করার মাধ্যমে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রথমে একটা বিরাট সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কারণ গ্রামের বেশিরভাগ লোকেরই যে রুটি-রুজির উপায় ছিল শিকার ও গাছ কাটা। সমস্যার সমাধান বের করত গিয়ে ২০০৩ সালে গঠন করা হয় খনোমা পর্যটন উন্নয়ন বোর্ড। স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও নারীরা এখন কাজ করছে ট্যুর গাইড, অপারেটর ও অনুবাদক হিসেবে। এ প্রসঙ্গে সিইইর কর্মকর্তা আব্দেশ গাংওয়ার বলছিলেন, ‘ যারা জীবিকার জন্য শিকার ও গাছ কাটার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল, তাদের আয়ের যে বিকল্প রাস্তাটা বের করা হয়েছিল তার ফল পেতে খুব একটা সময় লাগেনি। এই অভয়ারণ্যটি ট্রেকিং ও গবেষণার জন্য আদর্শ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে আধা-চিরসবুজ বন থেকে শুরু করে সাভানা তৃণভূমির প্রতিবেশ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য রয়েছে।’
অভয়ারণ্যের সাফল্য দেখে ভারত সরকার খনোমাকে সবুজ গ্রামের স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি এর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বছর পাঁচেক আগে পুরস্কার দিয়েছিল ৩০ লাখ রুপি (৫ লাখ মার্কিন ডলার)। এ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে গ্রামের ভেতরে ফুটপাত, টয়লেট ও রাস্তা নির্মাণ, সৌরবিদ্যুত্ ও ভিউপয়েন্টের ব্যবস্থা ও ট্রেকিং সামগ্রী কেনার পেছনে। সংরক্ষণ মিশনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সকল বাড়ির ছাদের রঙ এখন সবুজ, যাতে সবাই বুঝতে পারে, এটি সবুজ গ্রাম। এসব দেখে নাগাল্যান্ড রাজ্য সরকার ওই গ্রামের বাসিন্দাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিও গর্ব করে বলেছিলেন, বিশ্বকে খনোমা শিখিয়ে দিয়েছে পরিবেশ রক্ষায় লোকজনের দ্বারা কী কী করা সম্ভব। খনোমা শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের গর্ব।
গ্রামবাসীদের প্রচেষ্টার সুফল বেশ ভালভাবেই আসছে এখন। অভয়ারণ্যটি পর্যটকদের জন্য হটস্পট বনে যাওয়ায় গ্রামের সবাই অর্থনৈতিকভাবে কমবেশি লাভবান হচ্ছে। পাহাড়, বন ও বন্যপ্রাণীর সান্নিধ্যে গ্রামীণ জীবনের স্বাদ নিতে খনোমায় ছুটে আসছে পর্যটকরা। এখানকার প্রত্যেকটি বাড়িতেই পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার (অবশ্যই স্থানীয় খাবার) সুবন্দোবস্ত আছে। থাকা-খাওয়া ও ঘরে বসেই প্রকৃতির স্বাদ পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে প্রতিজনের জন্য দিনপিছু নেয়া মাত্র ১৭ মার্কিন ডলার। তবে গাইড নিতে চাইলে সেজন্য আলাদা পয়সা দিতে হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
খনোমা পর্যটন উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, দেশি-বিদেশি মিলে বছরে অন্তত পাঁচহাজার পর্যটক ছুটে আসছে সেখানে। এতে করে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্রই পাল্টে গেছে। স্থানীয়দের কাপড়-চোপড়ে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এ অঞ্চলে কাজ করা সংরক্ষণবাদীরা দাবি জানাচ্ছেন, খনোমা মডেল সারা ভারতে ছড়িয়ে দেয়ার। পরিবেশবাদী গ্রুপ আরণ্যক-এর ফিরোজ আহমেদ মনে করেন,অসাধ্যকে সাধন করে দেখিয়েছে খনোমার লোকজন। ভারতের অন্যান্য রাজ্য ও সম্প্রদায়ের জন্য খনোমা হতে পারে রোল মডেল।