বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০১৪, ২০:৪৭
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন নীতিমালায় ইহাকে অলাভজনক ও সেবাধর্মীপ্রতিষ্ঠান হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু একশ্রেণির ব্যবসামনা মানুষ ইহাকে ব্যবসার নূতন খাত হিসাবে বাছিয়া লইয়াছে। উন্নত দেশসমূহের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি এবং ইহার সিংহভাগ কর্মকাণ্ডই অলাভজনক। কিন্তু এইদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সহিত অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের এখন খুব কমই পার্থক্য নির্ণয় করা যায়।
বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রথমে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল—বর্ধিত ও অতিরিক্তসংখ্যক ছাত্রদের জন্য মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং আশির দশকে সৃষ্ট সেশনজট পর্যায়ক্রমে কাটাইয়া উঠা। সরকারি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাশাপাশি নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকের ঐ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বজায় রাখিবার প্রয়াস দেখা গিয়াছে। কিন্তু পরবর্তীতে গণহারে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয় যেইগুলির প্রয়োজনীয় নির্মাণ অবকাঠামো, আর্থিক সঙ্গতি ও সবল শিক্ষানুষঙ্গ বিবেচনায় আনা হয় নাই। প্রস্তাবকারীদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিষয়গুলি উপেক্ষা করা হয়। অন্যদিকে, গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানও পর্যায়ক্রমে নামিয়া আসিয়াছে। সার্বিকভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষামান পড়িয়া যাইবার কারণ সার্টিফিকেট জালিয়াতি,ছাত্রদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, যত্রতত্র ক্যাম্পাস গড়িয়া তোলা, উপাচার্যবিহীন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। ইহাছাড়া যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে দিয়া খণ্ডকালীন পাঠদানের বিষয়টি কাহারও অজানা নহে। ইহাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদে যেমন নিজস্ব অভিজ্ঞ শিক্ষকের অনিশ্চয়তায় পড়িতেছে, তেমনি আমন্ত্রিত ঐ শিক্ষকের নিজ প্রতিষ্ঠানও হইতেছে ক্ষতির সম্মুখীন। প্রতি বত্সর বাজেটের একটি বড় অংশ গবেষণা কর্মে ব্যয় করিবার কড়াকড়ি নির্দেশনা থাকিলেও শতকরা ৯৫ ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত নগণ্য। দুই দশকের বেশি সময় অতিক্রম হইলেও আজও অনেক প্রতিষ্ঠান তাহাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিতে পারে নাই। বরং নূতন করিয়া ভাড়া লওয়া জায়গায় গড়িয়া তোলা হইতেছে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা, যাহা পর্যাপ্ত সরকারি পদক্ষেপের অভাবেই ঘটিয়াছে ও ঘটিতেছে। এই বিষয়ে বারংবার সতর্ক করিবার পরও কি করিয়া দিনের পর দিন এহেন নিয়ম বিবর্জিত কার্যক্রম চলিতে পারে তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। ইহাকে দেশের শিক্ষা লইয়া নিছক ছেলেখেলা বৈ আর কী বলা যাইতে পারে!
আমরা বরাবরই যেকোন বেসরকারি উদ্যোগকে উত্সাহিত করার পক্ষপাতী। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন-কানুন অনুসরণ ও নিয়ম-শৃঙ্খলা মানিয়া চলিবার অঙ্গিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এইজন্য প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। জানা মতে, প্রতি বত্সর তিন লক্ষাধিক ছাত্র এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তি হয়। অরাজনৈতিক পরিবেশে সময়মত শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করিয়া কর্মে নিয়োজিত হইবার জন্য অনেকেই এই সকল প্রতিষ্ঠান বাছিয়া লয়। ইহা অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। কিন্তু এখন যেসব অভিযোগ উঠিতেছে তাহাও অস্বীকার করা যায় না। অতি সামপ্রতিককালে লক্ষণীয় যে, ছাত্ররাজনীতির নানা সংগঠন এইখানেও তাহাদের অবস্থান পোক্ত করিয়া লইতে শুরু করিয়াছে। তাহাছাড়া মালিকপক্ষের মধ্যে প্রায়শই বিবাদের খবর হরহামেশাই জানা যাইতেছে। অর্থাত্ মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ অর্থ দিয়াও ছাত্রদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হইবার নানা অনুষঙ্গ এখন অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিদ্যমান। সরকার কর্তৃক অতিরিক্ত করারোপের অজুহাতে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত ডিগ্রির জন্য অতিরিক্ত খরচ দেখাইতে প্রয়াস পায় বলিয়াও জানা যায়; যাহার ফল ভোগ করিতে হয় সাধারণ ছাত্রদেরই। কাজেই, এইক্ষেত্রে আরোপিত করের পরিমাণ প্রয়োজনে যৌক্তিক হারে কমাইয়া বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উপর চাপ কমাইয়া আনিতে হইবে।
সর্বোপরি, দেশের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে নানা অনিয়ম, অবিচার ও অব্যবস্থাপনা জাতির ভবিষ্যতের জন্য কোনমতেই সুবার্তা নহে বলিয়া আমরা মনে করি। জরুরি ভিত্তিতে সকল অনিয়মের অবসান ঘটাইয়া একটি নিয়মতান্ত্রিক ও সুপরিকল্পিত উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইবে। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণকে দিতে হইবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এইক্ষেত্রে বিলম্ব ও কোন প্রকার নমনীয়তা অপ্রত্যাশিত।