সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফর
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৪, ২১:২১
ভারত শুধুমাত্র আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ নয়, বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত এখন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দেশ বলে বিবেচিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এখন ভারত। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মানুষ যাতে শান্তির সাথে বসবাস করতে পারে, সেদিকে বাংলাদেশ এবং ভারতকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেই হবে। এসব কথা মনে রেখেই ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরকে বিচার-বিশ্লেষণ করা বাঞ্ছনীয়।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে সমগ্র বিশ্ব তাকিয়ে ছিল। নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে নানারকম তর্ক-বিতর্ক, হিসাব-নিকাশ চলছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় জনসাধারণ যে রায় দিয়েছে তাতে দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে বিজেপির কাছে। নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের আগেই জনমত যাচাই থেকে জানা যাচ্ছিল বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি হবেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। অনুমান সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।
কংগ্রেসের পরাজয় এবং বিজেপির বিজয় দেখে বাংলাদেশে বিএনপি এবং জামায়াত বেশ আনন্দ-উত্সব করছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল কংগ্রেসের পতনের পর আওয়ামী লীগের দিনও শেষ হয়ে যাবে। তাদের ধারণা ছিল কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসিয়েছে, সোনিয়ার পতনের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনারও পতন ঘটবে। বিএনপি ধরে নিয়েছিল নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি অতিশিগগিরই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের মসনদে বসিয়ে দেবেন। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। বিশেষ করে সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফর থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্তমান মোদি সরকার বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে অত্যন্ত আন্তরিক।
বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও অনেক শক্তিধর দেশ আছে যেমন চীন, জাপান, মিয়ানমার, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ইত্যাদি। এসব দেশ সফরে না গিয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমেই যখন বাংলাদেশ সফরে এসেছেন, তখন বুঝতে হবে বাংলাদেশকে বর্তমান ভারত সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশ যে আজ ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য। নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যে কথাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ বিঘ্নিত হবার আশংকা পরিলক্ষিত হয়েছিল। তবে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণ করবার পর তাঁর কথার সুর এবং ধরন অনেকটা পাল্টে গেছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন ভারতের স্বার্থ এবং বাংলাদেশের স্বার্থ অভিন্ন। বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ প্রশ্রয় পেলে সবচেয়ে ক্ষতি হবে ভারত। শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ দমনে যে সাহসী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন, ভারত সরকার তাতে স্বস্তি অনুভব করছে, তারই স্বীকৃতি স্বরূপ সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফর।
শেখ হাসিনার এই কূটনৈতিক সাফল্যে বিএনপি-জামায়াত জোটের খুশি হবার কথা নয়। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে নানারকম বে-কায়দায় ফেলবে,এই ছিল বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যাশা। কিন্তু সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরের ঘটনা বিএনপিকে বেশ খানিকটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ২০১৩ সালের ৩ থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশের সফরের সময় তত্কালীন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রপতির সাক্ষাতের সময় ও তারিখ দু’পক্ষের সম্মতিতে ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়া কথা রাখেননি। জামায়াতের পরামর্শ মতো হরতাল-অবরোধের দোহাই দিয়ে সেদিন ভারতের রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত্ করতে আপত্তি জানিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এটি শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ বলেই ভারত মনে করেছে। ভারতীয় রাষ্ট্রপতি সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে খানিকটা বিব্রতবোধ করেছিলেন। সুষমা স্বরাজের মত একজন ঝানু পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি মাথায় রাখেননি, এমনটি মনে করবার কোন কারণ নেই।
যেহেতু এখন খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী নন। সুষমা স্বরাজ শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে সৌজন্য সাক্ষাত্ দেবেন কি না, একপর্যায়ে এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। পত্র-পত্রিকার খবর থেকে জানা যায়, যে খালেদা জিয়া একসময় ভারতের রাষ্ট্রপতিকে সাক্ষাত্ দেননি, সে খালেদা জিয়া এবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের জন্য নানারকম চেষ্টা-তদবির চালিয়েছেন। অবশেষ খালেদা জিয়ার সেই চেষ্টা সফল হয়েছে, তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাথে সাক্ষাত্ করতে পেরেছেন। ২০১৩ সালে ভারতীয় রাষ্ট্রপতির সাথে খালেদা জিয়া অসৌজন্যমূলক আচরণ করলেও এ যাত্রায় ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ খালেদা জিয়াকে অসম্মান করেননি। সুষমা স্বরাজের সাথে খালেদা জিয়ার যে আলাপ-আলোচনা হয়েছে, সংবাদ মাধ্যম থেকে তা অনেকটা জানা গেছে। খালেদা জিয়া তাঁর অবস্থান থেকে বলতে চেয়েছেন—হাসিনা সরকার অবৈধ সরকার, অগণতান্ত্রিক সরকার, বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই সরকারের কোনরকম গ্রহণ যোগ্যতা নেই। বাংলাদেশে অতিশিগগিরই একটা নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। খালেদা জিয়ার কথাগুলো অনেকটা নালিশের মত মনে হয়েছে। সুষমা স্বরাজ অত্যন্ত কৌশলে খালেদা জিয়ার সবগুলো নালিশের জওয়াব দিয়েছেন। সুষমা স্বরাজ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও ভারতের কাছে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আছে। ভারত এই নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে বলেই তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। ভারত সরকার শেখ হাসিনা সরকারকে অবৈধ সরকার মনে করলে বর্তমান ভারত সরকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরে পাঠাতো না। বেগম খালেদা জিয়া দাবি করেছেন শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি বাংলাদেশের জনসাধারণের কোনরকম সমর্থন নেই। তার উত্তরে সুষমা স্বরাজ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন ভারতের জনসাধারণ বাংলাদেশের জনসাধারণের সাথেই থাকবে। বাক্যটি কূটনৈতিক তাত্পর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের জনসাধারণ শেখ হাসিনার সাথে আছে না খালেদা জিয়ার সাথে আছে সে সত্যটি প্রমাণ করতে হবে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে। বেগম খালেদা জিয়া যখন নালিশ জানিয়েছেন বাংলাদেশের জনসাধারণ শেখ হাসিনার সাথে নেই, তাঁর সাথেই রয়েছে, সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়াকে তাঁর দাবির সত্যতা প্রমাণ করতেই হবে। কাজটি অত্যন্ত জটিল। খালেদা জিয়ার জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জও বটে। জনসাধারণ খালেদা জিয়ার সাথে আছে সে কথা প্রমাণ করতে হলে খালেদা জিয়াকে গণআন্দোলনের মাধ্যমে দেশে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিতে হবে। বিএনপি তথা বেগম খালেদা জিয়ার সে জনসমর্থন আছে কি?
খালেদা জিয়া বলছেন বর্তমান হাসিনা সরকারের কোনরকম জনসমর্থন নেই, শেখ হাসিনা বলছেন বাংলাদেশের জনসাধারণের সমর্থন নিয়েই তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন, সুষমা স্বরাজও বলেছেন বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভারত সরকার কোনরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না। তিন নেত্রীর বক্তব্যের মধ্যে তেমন কোনো গরমিল আছে বলে মনে হয় না। সকলের কথা এক জায়গায় মিলে গেছে ‘দেশের জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স’।
তর্জন-গর্জন শোনা যাচ্ছে রমজানের পর জনসাধারণকে সাথে নিয়ে খালেদা জিয়া দেশে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবেন। আওয়ামী লীগের এক নেতা রসিকতা করে বলেছেন ‘যত গর্জে, তত বর্ষে না।’ গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর কোন রেকর্ড বিএনপি-জামায়াতের নেই বললেই চলে। গণতান্ত্রিক উপায়ে বিএনপি-জামায়াতের জন্ম হয়নি। হরতাল, অবরোধ, পেট্রোল বোমা দিয়ে বাসভর্তি মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনাকে কখনও গণঅভ্যুত্থান বলা যাবে না, বরং এসব ঘটনাকে গণহত্যা বলা যাবে। ৫ জানুয়ারির আগে জামায়াত-বিএনপি যে অমানবিক কর্মকাণ্ড দেশে চালিয়েছিল, দেশের জনগণ তা সমর্থন করেনি। জঙ্গী উত্থান আর গণঅভ্যুত্থান কখনও এক হতে পারে না। জামায়াত-বিএনপি নির্বাচনের আগে যে কাজটি করেছিল তাকে জঙ্গী অভ্যুত্থান বলা যেতে পারে। গণঅভ্যুত্থান নয়।
বিএনপি এবং জামায়াত যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, তখন ভারতের বিরুদ্ধে ভয়ংকর সব জঙ্গীদেরকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে, তেমন অনেক প্রমাণ ভারতের হাতে রয়েছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের পররাষ্ট্র নীতিকে যে বিজেপি সরকার অনুসরণ করে চলবে, সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। নরেন্দ্র মোদীর নয়া সরকার তার কূটনীতির যে আভাস দিচ্ছে, সেখানে এশিয়ার আঞ্চলিক সম্পর্ক শক্তিশালী করবার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। এর বৃহত্তর অর্থটি হলো এই যে, ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ এখন ভারতের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই অর্থে আগের কংগ্রেস আমলের পররাষ্ট্র নীতির সঙ্গে বিজেপি সরকারের পররাষ্ট্র নীতির খুব একটা পার্থক্য হবে না। বাংলাদেশে তিনদিনের সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় সেই বার্তাই রেখে গেছেন। বিমানবন্দরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন এই সফরকে দারুণ ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সৈয়দ আকবরউদ্দিন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চিহ্নিত করেছেন। এবং বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ চালিয়ে যেতে ভারত সরকারের কোনরকম আপত্তি থাকবে না বলে মুখপাত্র জানিয়ে দিয়েছে। কাজেই সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফর শেখ হাসিনা সরকারের বড় রকমের কূটনৈতিক সাফল্য বলেই বিবেচিত হবে।
[ লেখক : সাবেক ভিসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ]