টঙ্গীবাসীর দুর্ভোগ দূর করুন
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৪, ২১:২৬
আষাঢ়ের অবিরাম বর্ষণ থামিয়া গিয়াছে কয়েকদিন আগেই, কিন্তু জলাবদ্ধতা পিছু ছাড়ে নাই টঙ্গীবাসীর। দীর্ঘকালীন দুর্ভোগ হইতে এইবারও পরিত্রাণ মিলে নাই রাজধানীর উপকণ্ঠে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষের। গত ২০ জুন শুরু হওয়া তিনদিনের টানা বর্ষণে তলাইয়া গিয়াছিল সাতাইশ রোড, দেওয়া রোড, শিল্পাঞ্চল রোড, মডেল থানা রোড ও সরকারি হাসপাতাল রোডসহ টঙ্গীর বেশিরভাগ এলাকা। কিন্তু সেই পানি নামিতেছে না কিংবা নামিলেও তাহার গতি অত্যন্ত শ্লথ। জমাটবদ্ধ পানির সহিত যত্রতত্র জমিয়া থাকা ময়লা-আবর্জনা মিশিয়া সৃষ্টি হইয়াছে এক অবর্ণনীয় অবস্থার। শুধু যে চলাচল কিংবা স্বাভাবিক কাজকর্মই বিঘ্নিত হইতেছে তাহা নহে, বহু বাসাবাড়িতে ময়লা পানি ঢুকিয়া পড়ায় জীবনধারণ করাই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। দেখা দিয়াছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। আর এই পরিস্থিতি যে হঠাত্ করিয়া সৃষ্টি হয় নাই তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। টঙ্গীর মাছিমপুর এলাকার একজন বাসিন্দা ইত্তেফাককে জানাইয়াছেন যে, স্থানীয় তিতাস গ্যাস সড়কটি বত্সরের বেশিরভাগ সময়ই ময়লা পানিতে ডুবিয়া থাকে। অবস্থা কতোখানি নাজুক টঙ্গী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য হইতেও তাহা কিছুটা আঁচ করা যায়। তিনি জানাইয়াছেন যে, সামান্য বৃষ্টিতেই থানার ভিতর-বাহির তলাইয়া যায়। স্টাফ কোয়ার্টারে পানি ঢুকিয়া পড়ায় তাহারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করিতেছেন। রাজধানীর সন্নিকটে এমন অসহনীয় অবস্থা অভাবিত হইলেও ইহাকে সারা দেশের বাস্তবতা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই বলিলেই চলে।
দীর্ঘদিন যাবত্ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছে টঙ্গী। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বত্সরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার পণ্য উত্পাদিত হয় অত্র এলাকার শিল্প-কারখানাগুলিতে। প্রশাসনিক দিক হইতেও অঞ্চলটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করিয়া আসিতেছে সেই মুঘল সুবাদার মীর জুমলার (১৬৬০-১৬৬৩) শাসনামল হইতে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্গত হইবার পূর্ব পর্যন্ত স্বতন্ত্র পৌরসভা হিসাবেও টঙ্গীর একটি আলাদা গুরুত্ব ছিল। বিশ্ব এজতেমা আয়োজনের সহিত সংশ্লিষ্টতার কারণে তাহা যে ভিন্ন একটি মাত্রাও লাভ করিয়াছে তাহাও সুবিদিত। এতোকিছু সত্ত্বেও টঙ্গীবাসীর ভাগ্যলিপির উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন যে ঘটে নাই—উপরে উল্লিখিত চিত্রটিকেই তাহার অকাট্য উদাহরণ হিসাবে উত্থাপন করা যাইতে পারে। কারণ একটাই—অপরিণামদর্শিতা। তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন বা লাভের বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখিয়া নির্বিচারে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা ও রাস্তা নির্মাণ করা হইয়াছে। কিন্তু পরিণামের কথা ভাবা হয় নাই। তোয়াক্কা করা হয় নাই পরিবেশগত ভারসাম্যের। নিশ্চিত করা হয় নাই ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ অত্যাবশ্যক নাগরিক সুবিধাদি। ইহা শুধু টঙ্গী বা অঞ্চলবিশেষের সমস্যা নহে, বরং বিশ্বজনীন সমস্যা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বিশেষজ্ঞরা ইহাকেই অপরিকল্পিত নগরায়ণ বলিয়া অভিহিত করিয়া থাকেন।
সভ্যতার উত্তরোত্তর উত্কর্ষের জন্য শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কোনো বিকল্প নাই। কিন্তু যেই প্রশ্নটি এখন বিশ্ববাসীর শিরঃপীড়ার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহা হইল-আমরা প্রকৃতি বা পরিবেশগত ভারসাম্যকে ধ্বংস করিয়া নগরায়ন করিব, নাকি এই ভারসাম্যকে যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রাখিয়া প্রকৃতির সহিত একাত্ম হইয়া সভ্যতাকে আগাইয়া লইয়া যাইব? ইতিমধ্যে ইহা প্রমাণিত হইয়া গিয়াছে যে, আমাদের নিয়তি প্রকৃতির সহিত একসূত্রে গাথা। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হইলে মানবজাতির অস্তিত্বও বিপন্ন হইবে। কারণ প্রকৃতি এবং পরিবেশই হইল আমাদের প্রধান সুরক্ষা বর্ম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই চরম সত্যটি আমরা গ্রাহ্য করি নাই এতোকাল। টঙ্গী শুধু নহে, সারা দেশেই এখন তাহার কুফল স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। অতএব, সময় আসিয়াছে তাহা সংশোধনের। আশা করি, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই কালবিলম্ব না করিয়া এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন।