ই-বর্জ্য ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি

আধুনিক জীবন যাপনে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য নির্ভরতা আমাদের আগের তুলনায় অনেক বাড়িয়াছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নবিত্তের মধ্যেও এসব পণ্য ব্যাপক প্রসার লাভ করিয়াছে। ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের দাম অনেকটা হাতের নাগালে থাকার কারণেও ইহার মধ্য দিয়া দ্রুত সামাজিক রূপান্তর ঘটিতেছে এই দেশে। ইহা অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। মানুষ এসব পণ্যকে আর বিলাসিতা মনে করিতেছেন না, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মর্যাদা দিতেছেন। কম্পিউটার, মোবাইল, টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর, ্টিউবলাইট, এনার্জি সেভিং বাল্ব, ফ্যান প্রভৃতি নষ্ট বা মেয়াদোত্তীর্ণ হইয়া গেলে ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য বা সংক্ষেপে ই-বর্জ্য হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ইহা গৃহস্থালি বা অন্যান্য সাধারণ বর্জ্যের চাইতে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় এ ব্যাপারে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কেননা ইহা অনেক সময় হইয়া ওঠে প্রাণঘাতী। কিন্তু এই বর্জ্য ধ্বংস বা রক্ষণাবেক্ষণে নাই কোন পরিকাঠামো, আইন বা পৃথক ভাগাড়। যেহেতু ইহা পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর, তাই এ ব্যাপারে সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলা এখন সময়ের দাবি। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সারাদেশে প্রতিদিন প্রায় পাঁচশত টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়। তন্মধ্যে শুধু ঢাকা হইতেই তৈরি হয় শতকরা ১৫ ভাগ ই-বর্জ্য। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) মনে করে, শুধু সেলফোন হইতেই প্রতি বত্সর হাজার টন বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইএমএমএ) মতে, প্রতি বত্সর দেশে ৩২ কোটি টন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য ব্যবহূত হয়। ইহার মধ্যে যাহা বর্জ্য হয়, তাহার মাত্র ২০-৩০ শতাংশ রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার উপযোগী করা হয়। বাকিটা ভাঙিয়া ফেলিয়া দেওয়া হয় বা যত্রতত্র ফেলিয়া রাখা হয়। এসব পণ্যে রেজিন, ফাইবার গ্লাস, প্লাস্টিক, সীসা, টিন, সিলিকন, কার্বন ও লোহার উপাদান থাকে। অল্প পরিমাণে হইলেও থাকে ক্যাডমিয়াম ও পারদ একথালিয়াম। এসব বর্জ্যে পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জিংক, ক্রোমিয়াম, নাইট্রাস অক্সাইড, বেরিলিয়ামসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তাই এসব বর্জ্য ক্যান্সার, কিডনির সমস্যা, হাইপ্রেসার, থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা, নবজাতকের বিকলাঙ্গতা, প্রতিবন্ধিত্ব, মস্তিষ্ক ও রক্তনালীর বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী হইতে পারে বলিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা অভিমত দিয়াছেন। তাই এ ব্যাপারে মোটেও অবহেলা প্রদর্শন করা যাইবে না। ই-বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইহার কারণে ১৫ শতাংশ শিশুর মৃত্যু এবং বিষক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বত্সর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হইতেছে বলিয়া জানা যায়। অথচ এই বর্জ্য ধ্বংসের জন্য নাই কোন সরকারি ব্যবস্থাপনা। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড, ধোলাইখাল ও নিমতলীতে কম্পিউটারসহ ইলেক্ট্রিক বর্জ্য সংগ্রহ করিবার ব্যবস্থা আছে বেসরকারিভাবে। এখন বেশিরভাগ প্রযুক্তি পণ্যের মেয়াদ ৬ বত্সরের স্থলে ২ বত্সরে নামিয়া আসায় এরূপ বর্জ্যের স্তূপ ক্রমান্বয়ে বাড়িতেছে। তাই রিসাইক্লিংয়ের পর যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহা মাটিতে পুঁতিয়া ফেলা বা পুড়াইয়া ফেলার উদ্যোগ সরকারিভাবেই নিতে হইবে। এজন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয় ‘ডিসপোজাল ম্যানেজমেন্ট রুল’ নামে যে খসড়া আইনটি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়াছে, তাহার বাস্তবায়ন জরুরি। প্রতিটি শহরে মেডিক্যাল ও ই-বর্জ্যের জন্য পৃথক ভাগাড় নির্মাণ করা আবশ্যক। ই-বর্জ্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সরকারি-বেসরকারি ভূমিকা যেমন প্রত্যাশিত, তেমনি এ ব্যাপারে জনগণের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াইতে হইবে।