শিক্ষককে যখন
রাস্তায় দিগম্বর
করা হয়
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০১৪, ২১:২৮
সম্প্রতি বাংলাদেশে নানা ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটছে, সেসব বিষয় নিয়ে লেখালেখিও হয়, মৃদু প্রতিবাদও হয় কখনো কখনো। কিন্তু প্রতিকার হয় খুবই কম। খুন, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, বোমাবাজি, রাহাজানি, ছিনতাই, টেন্ডারবাজির মত বিবিধ অপরাধ এদেশে এখন মনে হয় খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত ২২ জুন ময়মনসিংহের গৌরিপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন এমপি’র বশংবদ বাহিনী একজন সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপককে দিগম্বর করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়েছে এবং পরে সেবালয় নামের একটি অফিসে নিয়ে তাকে তাদের মতো করে ‘সেবা’ দিয়েছে অর্থাত্ ঘণ্টাখানেক মারধর করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
যেসব ছেলে মমিনুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজের ঐ শিক্ষককে জামা-কাপড় খুলে মারধর করেছে তারা তো কোনো না কোনো শিক্ষকের কাছে পাঠ নিয়েছে। এমনও তো হতে পারে তারা ঔ শিক্ষকের ছাত্র ছিল অন্য কোনো সময় যখন তিনি অন্য প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ছিলেন। একজন শিক্ষকের গায়ে হাত দেয়া বা তাকে নগ্ন করে ফেলার কাজে অংশগহণে তাদের বিবেকে বাঁধলো না। এর চাইতে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে। তারা কি ছাত্র? তারা মানুষ? তারা তো কারো না কারো সন্তান? তারা কি ন্যূনতম পারিবারিক শিক্ষাও পায়নি? আমি নিজেও এক সময় সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতাম। আমিও নানা সময়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি, নেতাদের নকল ধরতে গিয়ে হেনস্থা হয়েছি, আমাকে সারাদিন নেতা বা গুণ্ডা বাহিনীর ভয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয়েছে, ভয় দেখিয়েছে। তবে প্রকাশ্যে দিগম্বর হতে হয়নি। ভেবে বিচলিতবোধ করছি; হায়! আমাদের সন্তানেরা কত নিচে নেমে গেছে। এর চেয়ে কি আর নিচে নামা যায়? আর কত জঘন্য অপরাধ করার পর তাদের অধপতন শেষ হবে? এমনিতে তো তাদের কেউ থামাবে না। কারণ, তাদের গুরুরা তাদের এসব কাজের জন্য তিরস্কার করেন না বরং যদ্দুর জানি বাহবা দেন।
সেই রাজনৈতিক গুরু বা গডফাদারদের ক্ষমতা, দাপট, শক্তি, বাচনক্ষমতা এবং তাদের পোষা বাহিনীর আচার ব্যবহার নিয়ে কমবেশি সবাই ওয়াকিবহাল। আলোচ্য নেতা তার বাহিনীকে এতটাই নিপূণভাবে শিক্ষা দিয়েছেন যে তারা নেতার অপমান সহ্য করতে না পেরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একজন নিরীহ শিক্ষকের ওপর। এমনও তারা বলেছে যে, তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই এটা করেছে। এবং বলেছে, কেউ তাদের নেতার সমালোচনা করলে তাকে ইহজগতে থাকতে দেয়া হবে না। ইহজগতে বেঁচে থাকা না থাকার ব্যাপারটা এখন ওদের হাতে। প্রশ্ন হতে পারে, কেউ কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে? আমরা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে পারি, সেই অধিকার গণতন্ত্রই আমাদের দিয়েছে।
আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থে শিক্ষকের কোনো মর্যাদা নেই। ব্রিটিশ আমলে শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী একজনের শিক্ষকের গোটা মাসের খরচকে সাহেবের তিন ঠ্যাঙা এক কুকুরের মাসিক খরচের সাথে তুলনা করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বেতন বৃদ্ধির জন্য মাসের পর মাস শিক্ষকদের মিছিল করতে হয়েছে, মরিচের গুঁড়া খেতে হয়েছে, কাঁদানে খেতে হয়েছে, লাঠিপেটা খেতে হয়েছে, অনশন করতে হয়েছে। একজন স্কুলের হেডমাস্টারও ক্লাস ওয়ান গেজেটেড অফিসারের মর্যাদা বা সমপরিমাণ বেতন পান না। রুলস অব প্রিসিডেন্সে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সচিব মহাশয়ের বহু নিচে প্রফেসরদের কথা তো বাদ দিলাম।
মর্যাদার এ স্তরভেদ করে রাখা হয়েছে শিক্ষকদের হেনস্থা করার জন্য। যাতে তারা মাথা উঁচু করে সম্মান নিয়ে বাঁচতে না পারেন। আমলারা উপরে থাকবেন। মন্ত্রী এমপি’রা আরো উপরে থাকবেন না হলে সরকার চলে না হয়তো।
ময়মনসিংহে যে ঘটনা ঘটেছে তার জন্য স্থানীয় ওই নেতা সাহেবের ভুল স্বীকার করা উচিত। তার বাহিনী যে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে তার জন্য তার বিবৃতি দেয়া উচিত। তিনি তো জনগণের সেবক তিনি এটা করলে তার সম্মান বাড়বে, কমবে না। তার উচিত ছিল ঐ শিক্ষক কেন তার সমালোচনা করলেন তা তাকে জিজ্ঞেস করা। ভারতের নেতা কেজরিওয়ালকে যে ব্যক্তি জুতাপেটা করেছিল কেজরিওয়াল তার বাড়ি গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে কেন তিনি এমনটি করেছিলেন। পরে ঔ ব্যক্তি তার ভুল বুঝতে পারে এবং তিনি ক্ষমা চান। আমাদের কোনো কেজরিওয়াল নেই। আমাদের নেতাদের সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবক হবার খবর পত্রিকায় পড়তে চাই। তাদের বাহিনীর হাতে সম্মানিত নিরীহ শিক্ষককে দিগম্বর হবার খবর পড়তে চাই না।
নিজে একজন শিক্ষক হয়ে একজন শিক্ষকের এই ধরনের অপমান সহ্য করা মুশকিল। যে শিক্ষক জাতি গঠন করছে, আমাদের মনন তৈরি করে দিচ্ছে সেই শিক্ষকের অপমানে নিশ্চয় গোটা জাতির পক্ষ থেকে ধিক্কার উঠবে। হয়তো সময় নিচ্ছে সবাই।
লেখক :অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়