যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্ক বাংলাদেশি অভিবাসীরা দোটানায়
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০১৪, ২১:০৬
স্বদেশ না বিদেশ কোথায় কাটাবেন জীবনের বাকিটা অংশ এনিয়ে মহাদোটানায় ভুগছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বয়োজ্যেষ্ঠ বাংলাদেশী অভিবাসীরা। একদিকে মাতৃভূমির নাড়ীর টান, শৈশব, কৈশোর যৌবনের সংগ্রামী যাপিত জীবনের নষ্টালজিয়া। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন পরিবেশ ও প্রতিবেশে অভিবাসী যান্ত্রিক জীবন কোনটা বেছে নিবেন এমন মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রতিনিয়ত তাড়িত করছে বয়স্ক অভিবাসীদের। নানা কারণেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন তারা। বয়োজ্যেষ্ঠ এসব অভিবাসীরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রেই থাকতে চান না নিজ দেশে ফিরে যেতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার বয়স্ক বাংলাদেশী অভিবাসীর মধ্যে চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে শতকরা ৪০ ভাগ নিজ দেশে ফিরে যেতে চান। ৩০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ যুক্তরাষ্ট্রেই কাটাতে চান জীবনের শেষ সময়টুকু। সিংহভাগ বয়স্ক অভিবাসী সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না তারা কি করবেন। যারা দেশে ফিরে যেতে চান এবং যারা যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে চান তাদের প্রত্যেকেই এক ধরনের সিদ্ধান্তের পক্ষে বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন। এতে বেড়িয়ে এসেছে অনেক অজানা তথ্য। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী অভিবাসীদের সঠিক পরিসংখ্যান জানা না থাকায় বয়োজ্যেষ্ঠদের সংখ্যা নিরূপণ করাও সম্ভব নয়। তবে প্রতি ৮ জন অভিবাসী বাংলাদেশীর মধ্যে কম করে হলেও একজন বয়স্ক ব্যক্তি রয়েছে। এদেশে ১০ লক্ষ বাংলাদেশী বসবাসরত হলে তন্মধ্যে লক্ষাধিক বয়স্ক রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত বয়স্ক অভিবাসীর সংখ্যা হ্রাস পায় অভিবাসন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে। ১৯৯০ সালের পর ওপি ওয়ান ও ডাইভার্সিটি ভিসা চালু এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে বিপুল সংখ্যক যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সুযোগ পান। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এইজিং এর মতে ১৯৯০ সালে বয়স্ক অভিবাসীর সংখ্যা যেখানে ছিল ২৭ লক্ষ তা এখন দাঁড়িয়েছে ৪৮ লক্ষে। বৈধ অভিবাসী নাগরিকদের আবেদনক্রমে তাদের পরিবারের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে পিতা-মাতারাই অধিকতর প্রাধান্য পান। এছাড়া ৮০ ও ৯০এর দশকে যারা অভিবাসী হয়েছেন তাদের বয়স এখন ৬৫ বছর ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশী বয়স্ক অভিবাসীদের স্ফীতি ঘটেছে মূলত যারা ওপি ওয়ান ও ডিভি ভিসায় এসেছেন তাদের ফ্যামিলি প্রেফারেন্সে আসা পিতা-মাতাগণ। যুক্তরাষ্ট্রের বয়োজ্যেষ্ঠ অভিবাসী সংখ্যা মোট অভিবাসীর ১২শতাংশ। তবে মেক্সিকান, কিউবান ও রাশিয়ান বয়স্ক অভিবাসীর সংখ্যাই এদেশে অধিক। এছাড়া বয়স্ক অভিবাসীদের বসবাস মূলত ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক এবং ফ্লোরিডায়। বর্তমানে বিশ্বে অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান ও রাশিয়ায় আশংকাজনক হারে বাড়ছে বয়স্ক জনসংখ্যা। সেদিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ অর্থাত্ ৮ কোটি ৪০ লক্ষে দাঁড়াবে ২০৫০ সালে।
যুক্তরাষ্ট্রে যারা সত্তর দশকে উচ্চ শিক্ষা এবং উন্নত জীবনের অন্বেষায় পাড়ি জমান তাদের অনেকেই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। আর যারা ছেলেমেয়ে বা ভাইবোনের আবেদনক্রমে ফ্যামিলি প্রেফারেন্সে অভিবাসী হয়েছেন এমন বয়স্ক অভিবাসীদের সিংহভাগই ভুগছেন মানসিক যন্ত্রণায়। একদিকে বার্ধক্যজনিত রোগবালাই অন্যদিকে ক্ষয়িষ্ণু পারিবারিক মূল্যবোধ তাদেরকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। প্রবাসে অনেক পরিবারেই বৃদ্ধ পিতা-মাতা অপাংক্তেয় ও বোঝা স্বরূপ। অনেক সন্তান তাদের বৃদ্ধা মাকে অন্যের বাসায় পাঠাচ্ছেন। কাজের বুয়ার মতো ব্যবহার করছেন নিজেদের বাসায়। বৃদ্ধ বাবাকে প্রচণ্ড শীতের মাঝে সামান্য আয়ের জন্য বাইরে পাঠাচ্ছেন কাজ করতে। প্রতিনিয়ত দুর্ব্যবহার করছেন তাদের সাথে। তারপরও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন মুখ বুজে। কেউ কেউ আবার বৃদ্ধ বাবা-মাকে রিহ্যাব সেন্টার এবং ওল্ড এজ হোমে পাঠিয়ে দিয়ে কালে ভদ্রে খোঁজখবর নিয়ে ঋণ পিতৃমাতৃ ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছেন। এর উল্টো দিকটাও আছে অনেক সন্তান তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বাসায় রেখে সব ধরনের সেবা শুশ্রষা করছেন। আবার অনেকে বাবা-মার জন্য পৃথক বাসা নিয়ে তাদের থাকার ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু তাতেও এক ধরনের মনো:পীড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীর ভাষায়, তারা ভুগছেন “খালি বাসা উপসর্গে” (Empty Home Syndrome)। বিশেষ করে যে পরিবারে বৃদ্ধরা ছাড়া সবাই দিনভর কাজ করেন। অনেক বাবা-মা আবার সন্তানদের উপর বোঝা না হয়ে নিজেদের মতো করে থাকার চেষ্টা করছেন। প্রবাসী বৃদ্ধদের সময় কাটে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা পড়ে, বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল দেখে এবং মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে।
তাদের জন্য কোন সিনিয়র সিটিজেন সেন্টার নেই। এ কারণে তারা পার্কে, রেষ্টুরেন্টে বসে সীমিত পরিসরে সমবয়সীদের সাথে আড্ডা দেন। ব্যক্তিগত সুখ দু:খের কথা শেয়ার করেন। বিভিন্ন স্টেটে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশী পরিবারে বয়স্কদের রোজনামচা খুবই করুণ। তাদের অপেক্ষমাণ সময় যেন কিছুতেই ফুরাতে চায় না, এমন মন্তব্য এক ভুক্তভোগীর। সবকিছু মিলিয়ে খুব একটা ভালো নেই বয়স্ক অভিবাসীরা। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলীন এলাকায় অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে দেখা যায় রাস্তার মানুষের নিকট থেকে খাবারের টাকা চেয়ে নিতে। জীবনে রাজধানী ঢাকা এমনকি নিজ জেলা শহর দেখেননি এমন সাধারণ বয়স্ক ব্যক্তিরাও অভিবাসন সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। কিন্তু এখানকার সমাজ সংস্কৃতি ও চালচলনের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেকটা বন্দী জীবন যাপন করছেন এমন মন্তব্যও করেছেন কেউ কেউ। আবার যারা দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং কর্মজীবন শেষে অবসর নিয়েছেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত এমন বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকের সন্তান ভিন্ন ধর্মী ও ভিন্ন ভাষীদের সাথে সংসার গড়ে বাবা-মাকে ছেড়ে দূরে চলে গেছেন। তারা এতোটাই আমেরিকানাইজ্্ড যে বাবা-মার সামান্য খবর পর্যন্ত রাখেন না। এসব কারণে তারা অব্যক্ত বেদনা ও হতাশায় ভুগছেন। তাদের বড় একটা অংশ আমেরিকার পাট চুকিয়ে শেষ নি:শ্বাস ছাড়তে চলে যেতে চান দেশের মাটিতে। এসব নিয়ে অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানদের মাঝে চলছে মন কষাকষি।
সবকিছু মিলিয়ে যে সকল বয়স্ক বাংলাদেশী অভিবাসী ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেছেন এবং গ্রীনকার্ডধারী যারা নাগরিকত্বের জন্য অপেক্ষা করছেন তাদের মধ্যকার দোটানা মনোভাব দিন দিন বাড়ছেই। কিসে এবং কোথায় শান্তি ও স্বস্থি তা স্থির করতে পারছেন না তারা।
লেখক: নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলাদেশ -এর সম্পাদক