স্বউদ্যোগী তারুণ্যের শক্তি
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৪, ২১:২৫
তরুণরাই বদলাইয়া দেয় সকল কিছু, সকল রঙ তাহাদেরই অন্তরে, তাহারাই অসাধ্যকে সাধন করে। নতুন কোনো উদ্যোগ ও কর্মের আয়োজন শুরু হয় তারুণ্যের হাত ধরিয়াই। আর সেই সকল উদ্যোগ বদলাইয়া দেয় লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, একটা রাষ্ট্রের ভবিষ্যত্। জাতীয় যুব নীতি অনুসারে ১৮ থেকে ৩৫ বত্সর বয়সী বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে যুবশক্তি রূপে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই হিসাবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও অধিক মানুষ তরুণ বলিয়া গণ্য হইবে। যেকোনো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চালিকা শক্তি সেই দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। আর সেই জনশক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হইল তরুণ সমাজ। তাই বলাই হয়তো বাহুল্য হইবে যে, দেশেরই জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি সমাজের যুবশক্তির সঠিক ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল হইয়া আছে। উন্নয়ন ইতিহাসের সকল উদাহরণের মতো, আমরা তাই বলিব, বাংলাদেশের যুবশক্তিই আমাদের ভবিষ্যতের কর্ণধার। দেশের সবচাইতে সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের কাজটি আমাদেরকে যত্নসহকারে করিয়া যাইতে হইবে।
উন্নয়ন তাত্ত্বিক এ.জি. ফ্রাঙ্ক তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নে ভারী শিল্পের বদলে ক্ষুদ্র উদ্যোগের জয়গান গাহিতে গিয়া স্লোগান তুলিয়াছিলেন: স্মল ইজ বিউটিফুল। আর সেই কারণেই হয়তো, বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিনা জামানতে ব্যাংক ঋণের বন্দোবস্ত করিয়াছে। উদ্দেশ্য একটাই: তারুণ্যের আত্মশক্তি সম্পর্কে সচেতন করিয়া সমাজে কর্মপ্রবাহ সৃষ্টি করা। তরুণদের, আপাতদৃষ্টিতে, বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ একসঙ্গে যুক্ত হইলেই সার্বিক উন্নয়ন বেগবান হইবে। আর এই বিপুল জনগোষ্ঠী না আগাইলে জাতিও আগাইবে না। তাহাদের উপযুক্ত শিক্ষা ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ সেহেতু অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই মনে করেন, সরকার কর্মসংস্থান যোগাইবে সেই আশায় বসিয়া থাকা কোনো কাজের কথা নহে, তরুণদেরকে স্বাবলম্বী হইবার পথ নিজেকেই সন্ধান করিতে হইবে। শিক্ষিত তরুণদের উদ্দেশে আমাদের প্রিয় পথপ্রদর্শক রবীন্দ্রনাথ বহুকাল আগেই কেরানিগিরির বদলে ‘স্বউদ্যোগী’ হইতে আহ্বান জানাইয়াছিলেন। কারণ, স্বউদ্যোগী হইলেই অন্যদের জন্যও কর্মসৃজন করা সম্ভব। আজিকার তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সমাজে সৃষ্টি হইয়াছে নিজেকে গড়িয়া তুলিবার অফুরন্ত সুযোগ। আশার কথা হইল, অনেক শিক্ষিত তরুণ ইন্টারনেটে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা হইতেও চেষ্টা করিতেছে। তবে, এই ক্ষেত্রেও অনেক বৈষম্য আছে-শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক সুবিধা, আর্থিক সামর্থ্য সকল দিক হইতেই। এখনও আমাদের তরুণদের সিংহভাগই সুযোগসুবিধা বঞ্চিত হইয়া গ্রাম ও মফস্বলে বাস করে। তবে তাহাদের মধ্যেও আজকাল হাল ছাড়িয়া না দিয়া, স্বউদ্যোগে স্বাবলম্বী হইবার একটা তাড়না আমাদের চোখ এড়াইবে না। ফলে আজ আমাদের নেতৃবৃন্দের জন্য এই আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি: তারুণ্যের এই প্রমত্ত শক্তিকে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য সৃজনশীল পথে চালিত করিবার আয়োজন কতোটুকু করিতে পারিয়াছি আমরা!
বয়সের হিসাব ধরিলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কৈশোর অতিক্রম করিয়া ভরা যৌবনের ঐশ্বর্য নিয়া ঝলমল করিতে শুরু করিয়াছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলিয়া সমগ্র বিশ্বে যে বদনাম রটাইয়াছিলেন, তাহা মাটিতে দলিয়া ছোট্ট এই রাষ্ট্রটি উন্নয়নের পথে দ্রুত এবং সাবলীল গতিতেই আগাইয়া যাইতেছে। পরাশক্তি হইতে অভিলাষী আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের তুলনায়ও আমরা মানব উন্নয়নের অনেক সূচকে আগাইয়া আছি। আর ইহা সম্ভব হইয়াছে বাংলাদেশের কর্মঠ ও অদম্য তারুণ্যের কারণেই। সেহেতু, আমাদের দেশের তরুণেরা অলস এই কথা বলা যাইবে না। সবচাইতে বড় কথা, দেশের প্রতি তাহাদের ভালোবাসা অন্য যেকোনো দেশকেই ঈর্ষাকাতর করিবে। ‘যে চাঁদ সাগরে জোয়ার জাগায়, সে হয়তো তাহার শক্তি সম্বন্ধে আজও নাওয়াকিফহাল।’ তরুণদের উদ্দেশ করিয়া কাজী নজরুল ইসলাম তাঁহার এক ভাষণে বলিয়াছিলেন। সেই কথাটি আজিকার তরুণদের সম্পর্কেও বলা যায়। নালায়েক সেই তরুণদের রাজনৈতিক জ্ঞান শিক্ষা জরুরি। কিন্তু দলান্ধ রাজনীতির বলি না করিয়া, তারুণ্যের শক্তিকে দেশের সম্পদে রূপান্তরের রাজনীতিটা আমরা করিতে পারিতেছি কিনা তাহার উপরেই নির্ভর করিবে আগামী বাংলাদেশের চেহারা।