[রা জ নী তি ]
আন্দোলনের রোডম্যাপ বনাম অস্তিত্বের সংকট
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৪, ২১:০৬
’৯০-পরবর্তী আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি সব সময়েই মুখোমুখি অবস্থানে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপিকে বিরোধী দলে আর বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগকে বিরোধী দলে দেখা গেছে। এবারই প্রথম বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিরোধী দলের অস্তিত্বটিও হারিয়েছে। তবে এর জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিএনপির একগুঁয়েমি অবস্থানকে দায়ী করা হয়েছে। কারণ গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবে বিএনপিকে যেকোনা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দেয়ার শর্ত, বিএনপি চেয়ারপার্সনকে প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন প্রভৃতি বিষয়ে ‘নির্বাচন ও গণতন্ত্র’ নিয়ে উভয় দলের আগ্রহ এবং অনাগ্রহের মাত্রাটি অবলোকন করা গেছে। তখন নির্বাচনের মাঠে প্রতিপক্ষকে বাধাহীন গোল করার সুযোগ করে দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার ইস্যু খোঁজার চেষ্টা করছে। কীভাবে দ্রুত নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা যায় অর্থাত্ সরকারকে বেকায়দায় ফেলে জনগণের মনের মনিকোঠায় স্থান করাই এখন বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও চায় কোনো রকম ভুল ভ্রান্তি না করে, জনগণের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দেশের উন্নয়নের যাত্রায় সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করা। বিগত সময়ে আন্দোলন চলাকালীন বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার ফলে জনগণ তাদের আন্দোলনকে বর্জন করেছে। সমসাময়িক রাজনীতিতে বিএনপি বড় ধরনের কোনো শক্ত ইস্যু পাচ্ছে না যা দিয়ে সরকারকে ধরাশায়ী করতে পারবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সরকার পরিচালনার কৌশল ও তার ব্যক্তিগত কঠোর অবস্থানের ফলে রাজনীতিতে খুব বেশি ভুল করার সুযোগ পাচ্ছে না অন্যান্য মন্ত্রীরা। দশম সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী তাত্ক্ষণিকভাবে সবার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ছিল কবে হবে একাদশ সংসদ নির্বাচন? বিশেষ করে বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং টকশোতে কিছু সিভিল সমাজের সদস্যরা এ বিষয়ে অধিকমাত্রায় সোচ্চার ছিল। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে অতি দ্রুত নির্বাচনমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়নি। অবশ্য এখন এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে যে, সংবিধান মোতাবেক পাঁচ বছর সময় পার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের প্রশ্নটি সহসাই আসছে না। বিএনপির নেতারা মাঝে মধ্যেই নির্বাচনের তাগিদ দিলেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটি এখনও ছাড়তে পারেনি তারা। আর এ কারণে তারা দেশের অভ্যন্তরে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে না পেরে বহির্বিশ্বে সমর্থন আদায়ের নানা ধরনের চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। সেগুলোও যথাযথ সফলতা পায়নি। সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
ইতিমধ্যেই নির্বাচন ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাশের দেশ ভারত থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য পর্যন্ত বড় মাপের দেশগুলোসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গেও জোর লবিং-তদবির অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। বৃহত্ প্রতিবেশী ভারতে নবনির্বাচিত মোদী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে শুরু থেকেই বিএনপির অতি আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবিসহ সরকার পরিবর্তনের ঘটনায়ও সারা দেশে বিএনপি দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে অনেকটা চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করেছিলাম। বিএনপির এমন চাঙ্গাভাব দেখে আমার মনে হয়েছিল, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময়ে তাদের ‘ভারত-প্রীতির অভিযোগ’ যে শুধুই রাজনৈতিক ছিল। কারণ বিএনপিও ভারতে বিজেপি সরকারের বিজয়ে নিজেদের ‘ভারত প্রীতির’ উন্মাদ দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যেই স্থাপন করেছে। তাহলে প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক, আওয়ামী লীগের ‘ভারত প্রীতি’ ইদানিং বিএনপির মধ্যেও ভর করেছে। তাহলে কি বিএনপিও এখন আওয়ামী লীগের রাস্তায় হাঁটতে চায়? এখন পরিষ্কার যে, আওয়ামী লীগ এতোদিন ঘোলা পানি পান করে থাকলে বিএনপিও এখন সেই ঘোলা পানি পান করতে চায়।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঢাকা সফরে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টিকে ‘বিশেষ গুরুত্ব’ দিচ্ছেন বলে আশ্বাস দিয়ে গেছেন। নয়াদিল্লিতে ক্ষমতার পালাবদলে দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কে ছেদ পড়বে না বরং তা জোরদার হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ ও বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে সুষমা স্বরাজ অনেক অস্পষ্টতা দূর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সুষমা স্বরাজ এটা বলে তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ককে গুরুত্ব দেবে বিজেপি সরকার। তাই আগামীদিনে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে অগ্রহী তাঁরা। আবার বিএনপির নেত্রীকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় এ দেশের জনগণই মেটাবে, ভারত নয়। ক্ষমতায় যে দলেই আসুক তার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেবে নয়াদিল্লি। কাজেই ভারতের নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপির চাঙ্গাভাব এবং তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় অতি দ্রুত বাংলাদেশে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, এসব নিয়ে বিএনপি এবং দেশের মানুষের মধ্যে যে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল তা এখন পরিষ্কার একটি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।
অনেকেই মনে করেন, বর্তমান সরকারের অধীনে দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এরকম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে। বর্তমান সরকার পূর্ণ মেয়াদেই ক্ষমতায় থেকে ২০১৯ সালে নির্বাচন দেবে। তাছাড়া উভয় দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) ঐকমত্যের ভিত্তিতে অতিদ্রুত নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কোনো ইতিবাচক আভাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অতএব, ওই পর্যন্ত বিএনপিকে অপেক্ষা করতে হবে, সেটি অনুমান করা যায়। এটিও পরিষ্কার যে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও করলে জনগণ তা ভালোভাবে নেবে না। এমনকি সরকারও তা কঠোরভাবে দমন করবে।
গত ৩০ জুন সিলেট সার্কিট হাউসে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আবদুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যে বিদেশিরা অত্যন্ত মুগ্ধ। তিনি আরো বলেন, ‘বিদেশিরা আমাদের কার্যক্রমে আশ্চর্য হয়, কীভাবে আমরা এই টানাপড়েনের মধ্যে এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি? তারা এখন আমাদের আর দরিদ্র দেশ মনে করে না।’ জাতিসংঘের সব কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে পাঁচ বছর আগে মাত্র তিনজন বাংলাদেশি জাতিসংঘে সদর দপ্তরে কাজ করতেন। এখন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ২২ জন কাজ করছেন। গত বছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ১৫ জন লোক বিভিন্ন সেক্টরে নিয়োগ করা হয়েছে।’ এসব বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশ আগের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে। এখন এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। এর পরও বিএনপি আন্দোলনের দিকে গেলে পরবর্তী সময়ে তারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে, বিদেশি বন্ধুরা আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। বর্তমান সরকারের কাজে দাতা গোষ্ঠীসহ বিদেশি অনেক শক্তিই ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। সুতরাং বাইরের কোনো চাপ আপাতত সামলানোর প্রয়োজন হচ্ছে না সরকারের। বিশেষ করে ভারতের নব-নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারেও সম্মতি জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সামপ্রতিক ঢাকা সফরই তার প্রমাণ। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে সুষমার ভাষ্য ছিল- কোনো দল নয় বরং বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চায় ভারত। ইতিমধ্যেই বিজেপির নেতারা জানিয়েছেন, ভারত কখনোই মৌলবাদী, জঙ্গিদের সঙ্গে কাজ করবে না। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি নির্বাচনে না এসে রাজনৈতিকভাবে ভুল করেছে। তাদের সে ভুল শোধরানোর দায়িত্ব আমাদের নয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে এখন দিশাহারা হয়ে গেছে। গত জানুয়ারির আগে নির্বাচন নিয়ে সংলাপের আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি। এখন সংলাপ করতে হলে আগামী সাড়ে চার বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাদের।
বর্তমানে দেশে কোনো রাজনৈতিক সংকট কিংবা অস্থিরতা নেই বললেই চলে। তবে যেকোনো সময়ই রাজনীতিতে সংকট, অস্থিরতা কিংবা উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণে সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক সতর্কতা রক্ষা করতে হবে, যাতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কোনো সুযোগ তৈরি না হয়। অন্যদিকে বিএনপিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, নিছক বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা কিংবা আন্দোলনে না গিয়ে সরকারের যথাযথ ব্যর্থতার ইস্যু খুঁজে বের করা। যাতে সরকার পতন আন্দোলন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিটি কিছুটা যৌক্তিকতা পায়। কারণ এ মুহূর্তে বিএনপির আন্দোলনের রোডম্যাপ তৈরির চেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোই মূল কাজ। ইতিমধ্যেই বিএনপি ঈদের পর কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী জানুয়ারির মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের টার্গেটও নিয়েছে তারা। অথচ এখনো আন্দোলনের মতো উপযোগী করে দল গোছানোর কাজটি তারা শেষ করতে পারেনি। এ কারণে বিএনপির উচিত হবে, নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে আরো মজবুত করা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকেও খেয়াল রাখতে হবে, বিএনপির যেমন সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগেরও সাংগঠনিক ভিত্তিকে মজবুত করার বিষয়টি জরুরি।
লেখক: ড. সুলতান মাহমুদ রানা, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: sultanmahmud.rana@gmail.com