অচল ঢাকা, সচল ঢাকা
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৪, ২১:০৭
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। অনেকে ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য বলে থাকেন আবার কেউবা এটাকে অচল নগরীর অভিধায় অভিহিত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমি কোনটাই বলতে নারাজ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০০৭ সালে ঢাকা মেগাসিটির (জনসংখ্যা এক কোটির বেশি) জনসংখ্যা ছিলো এক কোটি সাত লাখ। জাতিসংঘের অন্য রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বছরে ৬ শতাংশ। সে হিসেবে ২০১৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৭০ লাখে। ২০২৫ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটি ২৫ লাখে (দৈনিক ইত্তেফাক, ডিসেম্বর ১৪, ২০১২)। ব্র্যাক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা নগরীর বস্তিগুলোতে যে ৪০ শতাংশ মানুষ বাস করে, তাদের অধিকাংশই অশিক্ষিত। বস্তির ১৬ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক পড়তে এবং লিখতে পারেন। এদের ১৯ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। বস্তির পুরুষদের ৪০ শতাংশ দিনমজুর। ভিক্ষাবৃত্তির সাথে জড়িত আছেন ১৬ শতাংশ, ১১ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক। আর বস্তির নারীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ ভিক্ষুক, ২৩ শতাংশ গৃহকর্মী, রাস্তাঘাটে দোকান করছেন ৯ শতাংশ। এছাড়া ৮ শতাংশ মহিলা যৌন শ্রমিক। ব্র্যাক পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, রাজধানীর নিঃস্ব ও নিম্ন আয়ের লোকজনের মধ্যে ২০ শতাংশই গত ১০ বছর ধরে রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হল-নিম্ন আয়ের যেসব মানুষ রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন তাদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি (নারী ৩০ শতাংশ, পুরুষ ১৮ শতাংশ)। জরিপে দেখা গেছে, ফুটপাতে নারীর অবস্থান গড়ে ৯ বছর। আর পুরুষের ক্ষেত্রে এ গড় ৬ বছর। ফুটপাতবাসী ৭১ শতাংশ মহিলা বলেছেন, দারিদ্র্যের কারণে তারা ফুটপাতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া পরিবারের নানা ঝামেলার কারণে ১২ শতাংশ ফুটপাতে বাস করছেন (দৈনিক ইত্তেফাক, ডিসেম্বর ১৫, ২০১২)। তবে বর্তমানে অবস্থার কতটুকু উন্নতি হয়েছে তা বলা না গেলেও এ কথা হয়তো নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, অবস্থার আমূল কোন পরিবর্তন হয়নি। ঢাকায় বসবাসরত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত সেটা নিয়ে দ্বিমত থাকলেও এটা অন্তত পরিষ্কার যে, ঢাকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত মানুষ বাস করে।
এটা তো সাধারণ সত্য যে, কোন বিষয় বা পদ্ধতিকে সঠিকভাবে কাজ করাতে হলে বা তার থেকে প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে হলে তার উপাদানগুলোকে সাবলীল রাখতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি চৌকির ধারণক্ষমতা যদি দুই শত কেজি বা তিনজন মানুষের সমান ওজনের হয়, সেখানে যদি সাত থেকে আটজন মানুষ বা এক হাজার কেজি ওজন উঠে পরে তাহলে সেই চৌকির অবস্থা কি হবে, একবার ভেবে দেখুন। ঠিক তেমনিভাবে ঢাকার নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে নগর কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। যানজট-জনজটে জীবন অতিষ্ঠ। এর পিছনে যদি কারণ হিসেবে ধরতে হয়, তাহলে বলতে হবে জনসংখ্যার আধিক্য, প্রত্যাশিত ফলাফল প্রাপ্তির নিমিত্ত সুষম উপাদানের অনুপস্থিতি নগর জীবনের সাবলীলতাকে নষ্ট করেছে। কাজেই যে নীতিই গ্রহণ করা হোকনা কেন কিংবা ঢাকাকে যত ভাগই করা হোক না কেন নগর কর্তৃপক্ষ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক নাগরিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে না। এটা নাগরিক মাত্রই জানেন। এখন প্রশ্ন হল, ঢাকায় এত মানুষ কেন? কেন দলে দলে মানুষ ঢাকায় ছুটছে? কিসের আশায় বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে শহরের এই বস্তির জীবন বেছে নিচ্ছেন? কি আছে এই নগরে ? সাধারণভাবে বলতে গেলে মূলত তিনটি কারণে মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। এক, কর্মসংস্থান অর্থাত্ অর্থ উপার্জন। দুই, চিকিত্সা সেবা এবং তিন, শিক্ষা গ্রহণ। এর বাইরে নদী ভাঙনে বসতভিটা বিলীন হওয়ায় বাধ্য হয়ে জীবনধারণের জন্য নগরে ভিড় জমাচ্ছে। যদিও সমপ্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকা শহরে কোন কারণ ছাড়াই ৬০ লাখ মানুষ উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জটলা পাকানোয় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা কোন কারণ ছাড়াই বিভিন্ন সময় নগরীর বিভিন্ন উদ্যান ও পার্কে অযাচিত ঘোরাফেরা করে। তবে, একথা বললে নিশ্চয়ই ভুল বলা হবে না যে, ঢাকার মত শহর বাংলাদেশে আর কোথাও গড়ে ওঠেনি বা গড়ে তোলা হয়নি। ঢাকায় এই না পাওয়ার মধ্যেও ন্যূনতম যে সুবিধা পাওয়া যায় সেটাও অন্য নগরগুলোয় বিরল। সুতরাং মানুষ তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য ঢাকায় আসতে অনেকটা বাধ্য হয়। উপরে উল্লেখিত তিনটি কারণে ঢাকায় আসা মানুষের সংখ্যা কমিয়ে ঢাকাকে কথিত অচল নগরের তকমা থেকে বের করে আনা সম্ভব। বাংলাদেশে বর্তমানে বিভাগের সংখ্যা সাতটি। সাতটি বিভাগের মানুষকে কোন না কোন প্রয়োজনে ঢাকায় আসতে হয়। হোক সেটা জীবিকার প্রয়োজনে, হোক সেটা চিকিত্সা সেবা পাবার জন্য, হোক সেটা শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য। যদি বিভাগীয় পর্যায়ে এসব নাগরিকের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় তাহলে মানুষ অযথা ঢাকায় আসবে কেন? কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে কোন জেলা তো দূরের বিষয়, বিভাগীয় শহরেও নাগরিকরা তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারেন না। প্রশাসনিক কেন্দ্রীয়করণও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আমরা যদি প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পর্যাপ্ত চিকিত্সা সেবা নিশ্চিতকরণসহ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি তাহলে এই সমস্যা বহুলাংশে সমাধান করা সম্ভব। তারপর ধীরে ধীরে এগুলো জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিস্তৃত করতে পারলে আমাদের আর অধিক জনসংখ্যার অভিশাপ পরিমাপের জন্য কোন প্রকল্প হাতে নিতে হবে না। অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতির কারণে গ্রাম থেকে মানুষের এই শহরমুখী হওয়ার জোয়ার ঠেকাতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে চিকিত্সা সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে কয়টি মেডিক্যাল কলেজ আছে, সেগুলোকে শক্তিশালীকরণসহ জেলা পর্যায়ের সাধারণ হাসপাতালগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শক্তিশালী করাসহ প্রাথমিক ও মাধমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যথাযথ পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে পারলে শহরমুখী স্রোত ঠেকানো সম্ভব।
এই শহরে বিদ্যমান তৈরি পোশাক কারখানাগুলো যথাসম্ভব সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। তাদের জন্য প্রতিশ্রুত “পোশাক শিল্প পল্লী” প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে। তাতে চাপ কমবে, মানুষও স্বস্তি পাবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সামগ্রিক পরিকল্পনা, দুর্নীতির মূলোত্পাটনসহ ব্যক্তি বিশেষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। জীবনের প্রয়োজনে নগরের আবশ্যকীয়তায় নানাবিধ কর্মযজ্ঞের আয়োজন চললেও অনেকে জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও গ্রামে ফিরে যেতে চান না নাগরিক সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার শঙ্কায়। এছাড়া কর্ম প্রত্যাশী লাখো মানুষের দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে প্রভাবশালী মহল এদেরকে নানাবিধ অপরাধে ধাবিত করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি জায়গা দখল করে প্রভাবশালীরা বস্তি বানিয়ে অর্থ উপার্জন করছে। আবার কখনও কখনও হীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে এদের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার মাত্রা অতিক্রম করছে। তাই ঢাকাকে অচল বলি আর সচলই বলি, সমস্যার গভীরে না গিয়ে মলম লাগানোর মত করে সাময়িক সমাধানের চেষ্টা করে টেকসই সমাধান দিতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন।
[ লেখক: বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ashadullah.bd@gmail.com]