আলোকপাত
বাংলাদেশে কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমা
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৪, ২১:৩২
‘স্বাস্থ্য’ মানুষের মৌলিক অধিকার। আর ‘সুস্বাস্থ্য’ মানব উন্নয়নের এবং অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতাকে দূর করে মানব সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার অন্যতম হাতিয়ার। বাংলাদেশে চিকিত্সা ব্যয় প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। আর্থিক অসংগতির কারণে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনে চিকিত্সা সেবা নিতে পারে। দরিদ্র লোকজনের জন্য তা একরকম দুরাশাই বটে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ২৭ মার্কিন ডলার, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষদের স্বাস্থ্যসেবার পিছনে সবচেয়ে বেশি নিজের পকেটের টাকা খরচ করতে হয়। জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৪ শতাংশ ব্যক্তি নিজে, ২৬ শতাংশ সরকার এবং ১০ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও ব্যবসায়িক বীমা কোম্পানি বহন করে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক মানব সম্পদের অভাব, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যথার্থ বরাদ্দ না থাকা, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়, বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর প্রশ্নবিদ্ধ মান ও ব্যয়বহুলতা, অদক্ষ চিকিত্সা প্রদানকারীদের সেবা প্রদান, এবং নানাবিধ জটিলতার কারণে স্বাস্থ্য সেবা পদ্ধতিতে দরিদ্র মানুষেরা মানসম্পন্ন চিকিত্সা সেবা থেকে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, ব্যক্তি পর্যায়ে ‘বিপর্যয়কর’ স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে প্রতিবছর বাংলাদেশে ৪ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হচ্ছে। দেশের চিকিত্সা পদ্ধতির এই অব্যবস্থাপনার হাত থেকে সমাজের দরিদ্র মানুষদেরকে বাঁচাতে ‘কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমা’ একটি নব অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমা গতানুগতিক বাণিজ্যিক বীমার চেয়ে আলাদা। এটি একটি অলাভজনক বীমা ব্যবস্থা যা সমাজের মানুষের চিকিত্সা ব্যয় মেটানোর জন্য আর্থিক সুরক্ষা ও দরিদ্রদের গুণগত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
আইসিডিডিআরবি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চল চকোরিয়াতে ২০১২ সাল থেকে একটি প্রকল্প চালু করে। সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং চিকিত্সা সেবায় ব্যক্তিগত খরচ ও বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে এটি একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে। চকোরিয়ার প্রকল্পটি এলাকার মানুষের কাছে ‘আমাদের স্বাস্থ্য’ নামে পরিচিত। গ্রামের লোকদের একাত্মতাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে ‘আমাদের স্বাস্থ্য’, যার মূল মন্ত্র হলো “চিকিত্সার খরচাদি একের বোঝা দশের লাঠি”। এই প্রকল্পে ‘ইনডোর’ এবং ‘আউটডোর’ নামে দু’টি প্যাকেজ রয়েছে। ‘ইনডোর’ প্যাকেজে খানা প্রতি বছরে ৫০০ টাকা এবং দরিদ্রদেরকে ২০০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। এই প্যাকেজে একজন রোগী বিনামূল্যে এম.বি.বি.এস ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিত্সাসেবা, হাসপাতালে ভর্তি, প্যাথেলজী এবং অপারেশন খরচসহ স্বাস্থ্যসেবা পায়। এক্ষেত্রে সদস্য পরিবার জনপ্রতি বছরে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ৯০০০ টাকা ও পরিবার প্রতি সর্বোচ্চ ৫৪০০০ টাকা মানের চিকিত্সাসেবা পায়। আর ‘আউটডোর’ প্যাকেজে খানা প্রতি বছরে ১২০০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। এই প্যাকেজে একজন রোগী ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিত্সা সেবাসহ কমমূল্যে ওষুধ ও ডায়াগনষ্টিক সুবিধা পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সদস্য পরিবার জনপ্রতি প্রয়োজনে বছরে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা ও পরিবার প্রতি সর্বোচ্চ ৩০০০০ টাকার চিকিত্সা সেবা পায়। কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমার এই কার্যক্রম সুদূর প্রত্যন্ত অঞ্চল চকোরিয়াবাসীর কাছে নতুন হলেও স্থানীয় সমাজের জনগণের কাছে এই সেবার গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে এবং সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাবার ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষদের মাঝে আশার আলো সৃষ্টি করেছে।
কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমা ভারত, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়ার মত আরও কয়েকটি দেশে সার্বজনীন স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করতে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে সার্বজনীন স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব। চকোরিয়ার এই সফল উদ্যোগ সেক্ষেত্রে রাখতে পারে এক অনন্য ভূমিকা। পাশাপাশি সরকারেরও এবিষয়ে সুদৃষ্টির প্রয়োজন। কেননা, দেশের টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে একমাত্র সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জাতিই।
লেখক :আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত