রমজানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০১৪, ২১:০১
যাহারা অপরাধ সংঘটিত করে, তাহাদের জন্য ঈদের নিকটবর্তী সময়খানি বড় একটি ‘মওসুম’। কেননা ঈদোত্সবের কারণে আর্থ-সামাজিক প্রাণচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পায়। আর্থিক লেনদেন, মানুষের চলাফেরা অর্থাত্ কেনাকাটা হইতে শুরু করিয়া সামাজিক যোগাযোগও এই সময়ে বৃদ্ধি পায় সর্বাাধিক পরিমাণে। সেই প্রাণচাঞ্চল্যের জোয়ারে অপরাধীরা জাল পাতে, সারা বত্সরের সবচেয়ে বেশি ‘আয়’ তাহারা হাসিল করিয়া লইতে চায় এই সময়ে। সুতরাং রমজান মাসের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা, ট্রেন, বাস ও লঞ্চের নিরাপদ চলাচল ও যাত্রীদের নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, ঈদ জামায়াতের নিরাপত্তা এবং জাল টাকার অপব্যবহার রোধ ইত্যাদি লইয়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রশাসনের বাড়তি পরিকল্পনা থাকিবে নিশ্চয়ই। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গাফিলতির কোনো সুযোগ নাই এই কারণে যে, বিগত ছয় মাস ধরিয়া দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটিয়াছে।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, দেশ জুড়িয়া অবৈধ অস্ত্রধারী, ভাড়াটে খুনি ও ছিনতাইকারীরা ক্রমশই বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। দীর্ঘদিন ধরিয়া দেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালিত না হওয়ায় অস্ত্রধারীদের সংখ্যা আগাছার মতো বৃদ্ধি পাইয়াছে ভয়ঙ্করভাবে। গত কয়েক মাস ধরিয়া অপরাধীরা এতোটাই বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে যে, তাহারা প্রকাশ্য জনাকীর্ণ সড়কেও প্রয়োজনে গোলাগুলি করিতে দ্বিধাবোধ করে না। পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের থানাসমূহে গত পাঁচ মাসে অস্ত্র আইনে সাত শতাধিক মামলা হইয়াছে। তাহার মধ্যে খোদ রাজধানীতেই অস্ত্র আইনে সর্বাধিক মামলা হইয়াছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রহিয়াছে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকা। বন্দর নগরীতেও অস্ত্র আইনে অর্ধশতাধিক মামলা হইয়াছে। রমজান মাস আসিবার পূর্বেই সন্ত্রাসীদের হাতে অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া পত্রিকান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। সন্ত্রাসীরা অবৈধ অস্ত্রের শক্তিতে ইচ্ছেমতো পেশিশক্তি প্রদর্শনী করিতেছে। অথচ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালাইয়াছিল বিধায় কিছুদিন এই পরিস্থিতি যথেষ্ট সহনশীল ছিল। ইহা স্পষ্টই বুঝা যায় যে, যেটুকু অস্ত্র ও অস্ত্রধারী অপরাধীরা ধরা পড়ে, তাহা হিমশৈলীর চূড়ার সামান্য অংশ মাত্র। নেপথ্যে রহিয়াছে বৃহত্ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও অস্ত্রধারীদের আস্ফাালন। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে রহিয়াছে নিজ-স্বার্থে অপরাধীদের মদদ ও প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ। এই অভিযোগ অতি পুরাতন এবং তাহা যেন চিরায়ত হইয়া উঠিয়াছে। কিছুটা আশার কথা হইল, রাজধানীতে রমজানে ছিনতাই প্রতিরোধে গত রবিবার হইতে শুরু হইয়াছে পুলিশের ‘সাইকেল টিম’। প্রতিটি থানায় ৯টি মোটর সাইকেলে এই টিম তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করিবে। ইহার পরও কোনো এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিলে তাহার সব দায়-দায়িত্ব ওই টিমকেই বহন করিতে হইবে। কাহারো বিরুদ্ধে দায়িত্বে কোনো ধরনের অবহেলার অভিযোগ মিলিলে তাহার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। অপরদিকে পুরানা ঢাকায় যানজট নিরসনে চালু করা হইয়াছে বাইসাইকেল টিম।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহ নিশ্চয়ই পূর্বাপেক্ষা তাহাদের ভাবমূর্তি দিন দিন উন্নততর করিতেছে। কিন্তু তাহার পরও সর্ষের মধ্যে যতক্ষণ অবধি ভূত লুকাইয়া থাকিবে, ততদিন ভূতেদের বিচরণও তুলনামূলক অবাধ ও নির্বিঘ্ন হইবে। এই বাস্তবতা সকলেই বোঝেন। তাহার পরও শুভ উদ্যোগকে আমরা সব সময়ই স্বাগত জানাইব এবং আশা রাখিব অপরাধীরা নহে, সাধারণ মানুষ অবাধ ও নির্বিঘ্নে চলাচল করিতে পারিবে। এই রমজানে তো বটেই, তাহার পরবর্তী দিনগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত রাখা দরকার।