[রা জ নী তি ]

সুনীতির অপেক্ষায় চাতক দৃষ্টি

আমার এক সহকর্মী জীববিজ্ঞান অনুষদের প্রবীণ অধ্যাপক। আমাকে বিস্মিত করে জানালেন তার বাসায় কোনো খবরের কাগজ রাখেন না। নিজে পড়েন না, চেষ্টা করেন ছেলে-মেয়েরা যাতে বিরত থাকে। কিন্তু শতচেষ্টা করেও টেলিভিশন থেকে বিরত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আতঙ্ক থেকে মুক্তি নেই আত্মভোলা এই বিজ্ঞানীর। তাঁর দৃষ্টিতে ভালো কোনো খবর থাকে না পত্রিকায়। সন্ত্রাস, খুনোখুনি, দুর্ঘটনা, ঘুষ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ঝগড়া এসব নেতিবাচক বিষয় পত্রিকার পাতা জুড়ে থাকে। ভালো কথা লেখার সুযোগই যেন নেই। অধ্যাপক মহোদয়ের শংকা এসব পড়ে আর শুনে প্রজন্মের এখন বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষাটিই মরে যাবে। রাজনীতি ঘরানার ক্ষমতাবান নেতা-নেত্রীরা যে ভাষা, শব্দচয়ন ও দেহভঙ্গিতে কথা বলেন টেলিভিশনের পর্দায় তা দেখে প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গ হবে। আমার এই সহকর্মীটি সেদিন খুব চমকে গিয়েছিলেন। কারণ চুরি, ডাকাতি বা খুন-খারাবি করে ধরা পড়লে—জেলে গেলে ক্ষতি নেই। কারণ দল ক্ষমতায় থাকলে বা ক্ষমতায় গেলে এগুলো রাজনৈতিক মামলা বলে চিহ্নিত হবে। দেশের আদালত নয়—রাজনীতিবিদদের গড়া আদালত থেকে এক কলমের খোঁচায় মুক্তি পেয়ে যাবে এসব অপরাধী। আমাদের অধ্যাপক মহোদয় এমন অন্যায়ের অক্টোপাশ থেকে মুক্তি পেতে চান বলেই চলমান সময়টি নিয়ে তাঁর হতাশা। তারপরও মনের ভেতর প্রত্যাশা লুকিয়ে রাখেন ‘আবার সুনীতির সাথে দেখা হবে আমাদের’। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির সাথে আমাদের কমবেশি বসবাস বহুকাল থেকেই। যদি খুব বেশি পেছনে না যেতে চাই তবে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্ব থেকে দৃষ্টি বুলাতে পারি। এই সত্যটি মানতেই হবে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে দুর্নীতি রাহুর মত আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে। ব্যক্তি-দুর্নীতি বরাবরই ছিল। তবে সামপ্রতিককালের মত এত বাড়বাড়ন্ত হয়তো ছিল না। প্রশাসনিক দুর্নীতি হিসেবে ঘুষ শব্দটির সাথেই মানুষের জানা-শোনা ছিল বেশি। সুযোগ থাকলেও ঘুষ সকল পেশাজীবী খেতেন না। যারা ঘুষ খেতেন সমাজে তারা খুব মাথা উঁচু করে চলতেন না। নিন্দনীয় বলে ‘ঘুষখোর’ শব্দটির জন্ম হয়েছিল। এখন ঘুষের পরিধি অনেক বেড়েছে। ঘুষখোরের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক। নানা নামে ঘুষ শাখা-প্রশাখা মেলেছে। যা সাধারণ শব্দে ব্রাকেট বন্দি করা হয় ‘দুর্নীতি’ নামে। এখন নাগরিক জীবনের নানা সেবা খাতে কমিশন বা পারিতোষিক, চাকরি বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি নানা নামে দুর্নীতির দাপুটে অবস্থান। দুর্নীতিবাজরা সমাজে বুক ফুলিয়ে চলে। কারণ রাজনীতির গুরুরা তাদের আশ্রয়। ঘুষ বা কমিশনবাজদের আয়ের ওপর আবার ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের কমিশন আছে। এভাবে রাজনীতি এখন লাভজনক চাকরিতে পরিণত হয়েছে। এ কারণে দুর্নীতির গোড়াঘর এখন ক্ষমতাধর রাজনীতি। আমার এক বন্ধু তার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। বললেন- তার মতো নিরানব্বই জন ভুক্তভোগীর একই অভিজ্ঞতা। পৈত্রিক সূত্রে ঢাকায় একখণ্ড জমি ছিল তার। নিজের সামর্থ্য নেই তাই ডেভেলপারের হাতে তুলে দিয়েছেন জমিটি। ডেভেলপার কোম্পানীর এমডি বললেন- আপনি কাছে থেকে লক্ষ্য করুন হাড়গিলারা কিভাবে হা করে থাকে। প্ল¬¬্যান পাস করাতে রাজউকের মুখে ঢালতে হলো লক্ষাধিক টাকা। এরপর গ্যাস, পানি, বিদ্যুত্, সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্স, ফ্ল্যাট মালিকদের নামজারি, খারিজ ইত্যাদি সকল বিষয়ে যেভাবে ঘুষ দিতে হলো তা দেখে বন্ধুটি বললেন- স্বাধীন দেশে নাগরিকদের জিম্মিদশা চলছে। ঘুষখোরদের ঘুষ যেন অধিকার। প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ নেই। না হলে কাজ বন্ধ হয়ে থাকবে। আর এসব দুর্নীতিবাজের এমন প্রকাশ্য দাপট কেন? কারণ ঘুষখোরদের ওপর চাঁদা আরোপিত আছে ক্ষমতার রাজনীতিক আর দলের। তাই রাজনৈতিক দুর্নীতির ছাতার নিচেই এদের অবস্থান। নীতিহীনতা আর অন্যায় নীতিই তো দুর্নীতি। ক্ষমতার রাজনীতির বিধায়করা কি শির উঁচু করে বলতে পারবেন যে তারা পরিশীলিত রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে চেয়েছেন? নিজেদের ব্যক্তিতন্ত্র আর গোষ্ঠীতন্ত্রের বাইরে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন? ‘লীগ’ আর ‘দল’ যা-ই বলি না কেন শ্রমিক সংগঠনসহ সকল পেশাজীবী সংগঠনকে কি দুর্নীতিগ্রস্ত আর চাঁদাবাজে পরিণত করেনি রাজনৈতিক দলগুলো? ছাত্র রাজনীতির নামে কি এসব রাজনীতিকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কলুষিত করেননি? শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ তৈরির বদলে রাজনীতির নামে ছাত্র শক্তিকে কি লাঠিয়াল বানাননি? অস্ত্র আর অর্থপ্রাপ্তির পথ কি তারা শিখিয়ে দেননি? একজন মেধাবী ছাত্রকে চাঁদাবাজ আর সন্ত্রাসী বানাতে কি তারা প্রশ্রয় দেননি? শিক্ষক রাজনীতির ক্ষমতাবানরা কি স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে ক্যাম্পাসকে অন্ধকারে ঠেলে দেন না? বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আমাদের দেশে যেসব রাজনৈতিক দুর্নীতি, দেখা যাচ্ছে তার বেশির ভাগের উত্সই হচ্ছে নির্বাচনে টাকার খেলা। এজন্য চলে নানা চেহারার চাঁদাবাজি। এসব চাঁদাবাজি অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের জন্য করা হয় না, হয় দল পরিচালনা ও নির্বাচনী ফাণ্ড তৈরি করতে। এ ধরনের চাঁদাবাজিকে এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয় যে তা এই প্রতিযোগিতায় থাকা সকল পক্ষের জন্য হয়ে পড়ে গা সওয়া। সবপক্ষই যখন এক ঘাটের জল খায় তখন এসব নিয়ে প্রশ্ন আর কে তুলবে! ক্ষমতায় তো হয় আমি আসব নয় তুমি আসবে। এ ধরনের সরল ভাবনাই হয়ত পেয়ে বসেছে সবাইকে। বড় দলগুলোর নির্বাচনে ব্যয়ের ক্ষেত্র অনেক সমপ্রসারিত হয় প্রতিবছরই। যেমন একটি ব্যয় পরিচালনা করতে হয় দলীয়ভাবে আর একটি ব্যয় করতে হয় প্রার্থীকে। এছাড়াও রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুতি ও খরচ একরকম আবার বিরোধী দলে থেকে নির্বাচন মোকাবেলার প্রস্তুতি ও খরচ অন্যরকম। নির্বাচনী ফল নিজ দলের পক্ষে রাখার জন্য ক্ষমতায় থাকতেই দলীয় লোক বসাতে হবে উপযুক্ত জায়গাগুলোতে। পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন ফিট রাখতে করণীয় সব করে যেতে হবে। তাঁবেদার নির্বাচন কমিশন বানাতে হবে। এর জন্য বিপুল খরচের প্রয়োজন। অতীতে মনমতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার তৈরিতেও শোনা গেছে নানা হিসেব-নিকেশের কথা। এসবের জন্য প্রয়োজন শত-সহস্র কোটি মুদ্রা। আর তা নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী সেল চাই। এসবের জন্যই দুর্নীতির প্রতীক হয়ে যাওয়া হাওয়া ভবনের মতো ভবনগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। এমন জটিল কার্যক্রম সফল করার জন্য বিপুল অর্থের চাঁদা যাদের ওপর আরোপ করা হয় বিনিময়ে তাদের প্রভূত সুবিধা দিতে হয় রাষ্ট্রের ও প্রশাসনের বারোটা বাজিয়ে। এ কারণেই শত শত কোটি টাকার ঋণ খেলাপিরা ঋণের টাকা নিজেরাই যেন তামাদি ঘোষণা করে মাথা উঁচু করে চলেন, আবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সাংসদও হন। ভবনগুলোর সবুজ সংকেতে সরকারি খাস জমিগুলোকে নিজেদের তালুক বানিয়ে ফেলেন। লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা নিজ এবং পরিজনদের নামে দেশ এবং বিদেশের ব্যাংকে তুলে রাখেন। টেন্ডারবাজি লাইসেন্সবাজিতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় এগিয়ে থাকেন। বিরোধী দলও চেষ্টা করে টাকা সংগ্রহে এগিয়ে থাকতে। কখনও টেক্কা দিতে চায় সরকারি ষড়যন্ত্রকে। নির্বাচনী ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে। একদা সরকারি দলের ফিট করা নির্বাচন কমিশন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানকে ‘সূক্ষ্মভাবে’ গোপন নিলামে উচ্চদরে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। সফল হলে হোঁচট খাওয়া পক্ষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ হয়েছে। অন্যদিকে দলের আশীর্বাদ নিয়ে প্রার্থীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন নির্বাচনী খরচ যোগাতে। ব্যবসায়ী আমলা যোগাড় করেন যে যার কায়দা মতো। বণিক বুদ্ধি মুনাফা খোঁজে। অর্থ দেয়ার বিনিময়ে ভবিষ্যতে তা বহুগুণে ফিরে পাওয়ার অঙ্গীকার আদায় করে নেয়। এমনও শোনা যায় অনেক অর্থলগ্নিকারী বণিকগোষ্ঠী আছে যারা কোনো ঝুঁকিতে থাকতে চায় না। ক্ষমতার সিঁড়িতে পা রাখা দু’পক্ষকেই টাকা বিলিয়ে দিতে হয়। কারণ ক্ষমতায় যে-ই আসুক বণিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা যাবে না। এসবের পরও প্রতিযোগিতার নির্বাচনে আরও অর্থের দরকার পড়ে। তখন শুরু হয় মনোনয়ন বিক্রি। কোটি কোটি টাকা দলীয় ফাণ্ডে দিয়ে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে রাজনীতি করা ত্যাগী নেতাকে কনুইয়ের গুঁতোয় ঠেলে ফেলে ভুঁইফোঁড় বণিক আর অর্থবাজ আমলা নির্বাচনের টিকেট পেয়ে যান। স্বাভাবিকভাবেই এসব সাংসদকে চোখে দেখার সৌভাগ্য এলাকাবাসীর প্রায়ই হয় না। এই বণিক-রাজনীতিকরা সাংসদের টিকেট বুক পকেটে রেখে নির্বাচনে লগ্নি করা টাকা বহুগুণে ফেরত আনার নানা তদ্বিরে ব্যস্ত থাকেন। এমন দমবন্ধ করা অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি। না হলে জাতি কোন অন্ধকারে গিয়ে ঠেকবে? দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করতে না পারি অন্তত অমন অন্ধকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আমরা কি সুনীতির প্রত্যাশা করতে পারি না? তবে দুর্নীতি যেভাবে সর্বক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে তা থেকে মুক্তি পেয়ে সুনীতির আবহ তৈরি করতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছা জরুরি। আমাদের দেশের বাস্তবতা থেকে সকলেই মানবেন রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের ছাতা আর শক্তি ছাড়া দুর্নীতি এমন সর্বপ্লাবী হয় না। তাই সুনীতির অপেক্ষায় এদেশের সাধারণ মানুষ এমন চাতক দৃষ্টি। এখানে শান্তির বৃষ্টি ঝরাতে আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিকরা যত দ্রুত অচলায়তন ভেঙ্গে নেমে আসবেন তত দ্রুতই আমরা মুক্তির পথ খুঁজে পাবো। সমপ্রতি মহান সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন ‘গত পাঁচ বছরে দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি’, মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছেন ‘দেশে কোনো কালো টাকা নেই’।—স্বপ্ন নয়, বিপন্ন দেশবাসী বাস্তবে অমন সত্যের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় shahnawaz7b@gmail.com