আমাদেরও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৪, ২১:২৩
অভিনেতা যখন নেতা তখন কি তার মগজ বিগড়ে যায়? উপমহাদেশে অভিনেতা থেকে নেতা হবার ঘটনা বিরল কিছু নয়। বহু নামি-দামি তারকাখচিত অভিনেতা-অভিনেত্রী নেতা হয়েছেন। কেউ কেউ মন্ত্রীও। অনেকে ঠাট্টা করে বলেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে অভিনয় পারদর্শীরাই কামিয়াব। সত্যকে মিথ্যা মিথ্যাকে সত্য বানানোর খেলায় যে রাজনীতি নিশিদিন পাগলপারা সেখানে অভিনেতারা ভালো করবেন এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু বাঙালি হলে কি অন্য কথা? আমাদের অভিনেতারা খারাপ করছেন এমন বলা যাবে না। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী জাদরেল একজন অভিনেতা, মূলধারা নাটকে কিংবদন্তীতুল্য শিল্পী তিনি, রাজনীতিতেও ভালো করছেন। অবয়বের মত তার কথা-বার্তা, আচরণেও প্রশান্তির ছাপ আছে, জ্বালাময়ী ভাষণ দেন না। বাক্য পরিমিত শব্দ চয়ন আধুনিক। আসাদুজ্জামান নূরের এই গুণ অভিনন্দনযোগ্য। আমি ভাবতাম অপেক্ষাকৃত শান্ত জনপদ ও ধারাবাহিক গণতন্ত্রে বেড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আগত অভিনেতারাও সেই মত হবেন। যে দেশে যে রাজ্যে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের রাজনীতিতে আগমন ও প্রতাপ বিস্তার নতুন কিছু নয়। প্রায় বছর তের আগে অভিনেত্রী মাধুরীকে নিয়ে রাজনীতির নোংরামী দেখার সুযোগ হয়েছিল। সে সময় বামরা ক্ষমতায়, বয়সী অভিনেত্রী মাধুরী চট্টোপাধ্যায় তৃণমূলে, তাকে খারাপ মহিলা বেশ্যা জাতীয় অচ্ছুত্ শব্দে আক্রমণ করায় তোলপাড় হয়ে উঠেছিল মিডিয়া। আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, দীর্ঘকালের গণতন্ত্র, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব সিদ্ধার্থ শংকরসহ নানা ক্ষেত্রে আকাশচুিম্ব প্রতিভার বাঙালির মুখে এ কোন ধরনের ভাষা? বলাবাহুল্য, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদরা কিছু মানেন না, না মানলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের কোনো ক্ষতি নেই। এবারের বিষয়টি আরো সাংঘাতিক।
দেখতে হাবাগোবা নাদুস-নুদুস টাইপের এই নায়ককে আমার কোনোকালেই নায়কোচিত মনে হয়নি, তারপরও একটা সময় প্রসেনজিতের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলা ছবির নায়ক হতে পারা তিনি বাংলাদেশের ঘরে ঘরেও ঢুকে পড়েছিলেন। দাদার কীর্তি নামের এক ছবিতে রবীন্দ্রনাথের গান ও বাঙালি সেন্টিমেন্ট সম্বল করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নায়কটি বেশিদিন টেকেননি। বাম পতনের আগেই তৃণমূল কংগ্রেসে ভিড়ে সাংসদ হয়েছিলেন, একবার জেতার পর পুনর্বার জেতা এবং সময়কালে অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে ওঠা তার আচরণ বক্তব্য এমন অশালীন সীমাহীন অভদ্রতায় তিনি বাম দলের নেতা-কর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের মা-বোনদের ধর্ষণ করানোর হুমকি দিতেও কসুর করেননি। তার এই হুমকি বা বিকৃত রুচি উপেক্ষা করার মত নয়। তৃণমূল এখন ক্ষমতায়। ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ ও একদা অভিনেতা তাপস পালের এই অভব্য বক্তব্য শুধু নারী সমাজের বিরুদ্ধে ভাবলে ভুল হবে, এটি সামাজিক অবক্ষয় ও ধর্ষণ প্রক্রিয়ার পক্ষে অপরাধীর বক্তব্যতুল্য। তিনি অশিক্ষিত গ্রাম-গঞ্জ বা গেঁয়ো পরিবেশ থেকে উঠে আসা কেউ নন। নাগরিক কলকাতার এই নায়ক এর আগেও কুকর্ম করে ছাড় পেয়ে গেছে। তার স্ত্রী টিভিতে এসে শারীরিক নির্যাতনের ভয়াবহ চিহ্ন দেখিয়েছিলেন। পুরো শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা আর তপ্তপাপের চিহ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা সে নারীকে দেখেও রাজনীতি নীরব থেকেছে। ঠিক আমাদের দেশে ও সমাজের মত একই চিত্র। রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে পারলে সাত খুনও মাফ। সরকারি দলে থাকতে পারলে খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন কিছুই কিছু নয়। অবাক হয়েছি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নিজে একজন নারী হবার পরও তাপস পালের এই ঔদ্ধত্য ও ক্ষমাহীন বক্তব্য মার্জনা করে তাকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন। একটি চিঠিই নাকি তাকে ক্ষমা করার জন্য যথেষ্ট। রাজনীতির পচন দেখছি উভয়বঙ্গেই সমানভাবে প্রকট। তাপস পালের এই দুঃসাহসের উত্স তার দল ও ক্ষমতা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব চালানো বাম দূর্গের পতন দেখেও শিখছে না তারা। উল্টো ক্ষমতায় এসেই মা-বোনদের ওপর চড়াও হবার মত জঘন্য অপরাধ উস্কে দিচ্ছে।
যারা কলকাতাকে স্বর্গ বিবেচনা করেন, যারা কথায় কথায় বর্ডার পার হয়ে শান্তিতে থাকার স্বপ্ন দেখেন, যাদের বাংলাদেশি মুদ্রা পশ্চিমবঙ্গে দালান-কোঠা গড়ে কিংবা বাজারে খাটে তাদের জন্য এই আচরণ শিক্ষণীয়। আশা করছি, এদের জ্ঞানচক্ষু খুলে দেবে তাপস পালের এই উগ্র অশোভন সভ্যতা বর্জিত আচরণ।
আমরাও কম যাই না। আমাদের সমাজ সংসারেও তাপস পালের কমতি নেই। কিন্তু এখনো এভাবে প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়ার সাহস হয়নি তাদের। প্রায় সর্বক্ষেত্রে ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের অনুকরণ প্রিয় আমাদের জন্য এই দৃষ্টান্ত ভয়াবহ, অনুকরণ প্রিয় নেতা-অভিনেতারা যদি তাপস পালের মত উগ্র ও বেপরোয়া হয়ে উঠতে চায় সেটা কারো জন্যে মঙ্গলের হবে না, পশ্চিমবঙ্গের নারী শক্তি সংঘবদ্ধ। স্বক্ষেত্রে উজ্জ্বল। আশাকরি, রাজনীতির মুখে ঝামা ঘষে অভিনেতার কুরুচির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন তারা। রুখে দাঁড়িয়ে তাপস পালের বিচার নিশ্চিত করবেন। ‘দাদার কীর্তি’র নায়কের এই অপকীর্তি উভয় বাংলার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক জগতে কলঙ্কের গভীর ছাপ রেখে গেল। অপরাজনীতি ও অপসংস্কৃতির কবল থেকে বাঁচতে এর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ জরুরি। অন্যথায় তাপস পালের মত সাধুবেশী শয়তানদের হাতে আমাদের মা-বোনেরা কখনোই নিরাপদে থাকবে না। পশ্চিমবঙ্গের দূষিত রাজনীতির বিষবাষ্প যেন প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে সাবধানতারও বিকল্প নেই।
(সিডনি থেকে)