কলেজে ভর্তি ও সিট বাণিজ্য

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এখন সারাদেশে কলেজে ভর্তির মৌসুম চলিতেছে। কলেজে ভর্তি হইবার ক্ষেত্রে আসনগত কোনো সংকট নাই। তাহার পরও ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। তুলনামূলকভাবে ভাল কলেজে পড়িবার স্বপ্ন পূরণের তাগিদ অনুভব করিতেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল। ইহারই সুযোগ গ্রহণ করিতেছেন কেহ কেহ। অভিযোগ রহিয়াছে যে, সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই বাণিজ্যের সহিত জড়িত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কলেজ শাখার বাহিরেও জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের নেতৃত্বও ইহার সহিত জড়িত হইয়া পড়িতেছে। ইহার মধ্যে সাম্প্রতিককালে সবচাইতে আলোচিত হইতেছে নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়া। এইখানে একটি ছাত্রসংগঠন ৬০০ আসন দাবি করিলে ও অর্থের বিনিময়ে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করিলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাহাদের বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি পালনসহ আন্দোলন শুরু করে। খুলনার স্বনামধন্য তিনটি কলেজেও ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠিয়াছে। এভাবে সারাদেশের ২৭১টি সরকারি কলেজসহ আরও শতাধিক বেসরকারি কলেজে এই ধরনের ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ আছে বলিয়া জানা যায়। শিক্ষার্থীপ্রতি ১০ হইতে ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হইতেছে। কলেজের হল বা ছাত্রাবাসগুলিতে সিট পাওয়াইয়া দিতেও অনুরূপভাবে বাণিজ্য চলিতেছে। তাহাদের কথামতো ভর্তি করা না হইলে ফোনে বা সরাসরি হুমকি দেওয়া হইতেছে অধ্যক্ষকে। এমনকি এইজন্য অফিসকক্ষ ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটিতেছে। এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জানা যায়, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডগুলো এসএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর বা গ্রেডের ভিত্তিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মেধাতালিকা প্রকাশ করে। কলেজে ভর্তি হইতে এখন আর পরীক্ষা দিতে হয় না। এই পদ্ধতি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হইয়াছে। কিন্তু ইহার পরও কিভাবে অনিয়ম ও ভর্তি বাণিজ্য হয় তাহাই চিন্তার বিষয়। মূলত মেধাতালিকা নিয়া ও সেই অনুযায়ী ভর্তির ব্যাপারে তেমন কোনো সমস্যা নাই। সমস্যা হইতেছে অপেক্ষমাণ তালিকার ক্ষেত্রে। সেইখানেও সিরিয়াল অনুসরণ করা দরকার, কিন্তু নানা চাপের কারণে তাহা সম্ভব হইতেছে না। আবার কোথাও কোথাও সরাসরি কোটা দাবি করার ঘটনাও ঘটিয়াছে। ইহা অন্যায্য ও অন্যায় আবদার। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান মেরুদণ্ডহীন হইলেই কেবল এই অন্যায় আবদার মিটানো সম্ভব। অবশ্য তাহাকে ন্যায়ের পথে থাকিতে এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাহস জোগানো আবশ্যক। বস্তুত আমাদের সমাজে বর্তমানে যে অবক্ষয় দেখা দিয়াছে, তাহা হইতে বাহির হইয়া আসার সংগ্রাম করিতে হইবে সকলকে। এখানে নীতি-নৈতিকতার দেখা দিয়াছে চরম সংকট। যাহাদের এইসব কিছু দেখিবার কথা, তাহারা শুধু ‘পাওয়ার’ হিসাব মিলাইতেছেন। রাজনীতিতে আদর্শিক সংকট চলিবার কারণেও এইরূপ সমস্যা সর্বব্যাপী রূপ লাভ করিয়াছে। দেশ ও জাতিকে ‘কী দিলাম’-এর বদলে ‘কী পাইলাম’ তাহাই এখানে মুখ্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই হায় হায় নীতি উপর হইতে তৃণমূলেও সংক্রমিত হইয়াছে। ফলে জেলা-উপজেলার নেতা-পাতি নেতারাও কী পাইলাম তাহার হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। এইজন্য তাহারা বেপরোয়া ও মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। সকলেই নিজ নিজ অবস্থানে থাকিয়া ফায়দা লুটিতেছে বা লুটিবার চেষ্টা করিতেছে। শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তিসহ সকল ক্ষেত্রে যখন অনিয়ম হইতেছে ও বাম হাতের কারবার বাড়িয়া গিয়াছে, তখন ভর্তি ও সিট বাণিজ্য ইহার বাহিরে থাকে কিভাবে? স্বভাবতই ছাত্রনেতা বা নেত্রীরা ইহা হইতে লাভবান হইয়া নিজেদের আখের গুছাইতে উদগ্রীব। অর্থাত্ বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা দাঁড়াইয়া গিয়াছে এমন যে, সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দেব কোথা। এখন কোন ঔষধ বা অ্যান্টিবায়োটিকেও কাজ হইবে বলিয়া মনে হয় না। তবে এখন ফিজিওথেরাপি দেওয়া যাইতে পারে। এইজন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করিতে হইবে। কিন্তু তজ্জন্য যে নৈতিক শক্তির জোর থাকা দরকার, তাহারও অভাব পরিলক্ষিত হইতেছে ভীষণভাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল কিছু চলিবে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনে। এমপি, ছাত্রনেতা বা নেত্রীর যখনতখন হুকুমে চলিবে কেন? এই সমস্যা হইতে উত্তরণের পথও এখন আমাদের চিন্তা করিতে হইবে।