[ রা জ নী তি ]
এবার রাজভবনে কে? বাবরি ধ্বংসের ‘অভিযুক্ত’ কল্যাণ সিং?
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২১:৪৬
বিদায় নিলেন এম কে নারায়ণ। বাংলার রাজভবনে আর তাঁকে দেখা যাবে না। মৃদুভাষী, নির্বিবাদী এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রাক্তন উপদেষ্টার দিন কাটবে এখন চেন্নাইয়ে, নিজের বাড়িতে। তবু বঙ্গীয় সমতটের আলো-হাওয়া-রোদ্দুর আর স্মৃতি ছুঁয়ে থাকবে তাকে, ছুঁয়ে থাকবে সাবেক রাজ্যপালকে সিবিআই-টিমের জেরা করার তিক্ত অভিজ্ঞতা। ৪ জুলাই শুক্রবার আড়াইটায় তিনি রাজভবন ছাড়লেন। ঠিক ৭ দিন আগে, আরেক শুক্রবারে, ৩৬০০ কোটি টাকার হেলিকপ্টার কেলেঙ্কারি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। রাজভবনে গদিনসীন রাজ্যপালকে জেরা করার দৃষ্টান্ত স্বাধীন ভারতে এই প্রথম। খবরটি চাপা থাকেনি। ছিটকে বেরিয়ে যায় বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে দেশ জুড়ে বিতর্ক শুরু। তবে বাংলার সরকার, বাংলার সংবাদ মাধ্যম যথাসম্ভব সম্ভ্রম ও সৌজন্য বজায় রেখে স্পর্শকাতর বিষয়টিকে বিশেষ আমল দেয়নি। নারায়ণও মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলেন। অপমানিত বোধ করেছেন। আর তারই অবরুদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। রাষ্ট্রপতি ভবনেও চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিলেন। কেন্দ্র তাঁকে ৪ জুলাই পর্যন্ত রাজভবনের কার্যভার চালিয়ে যাবার অনুরোধ জানায়। কেন্দ্রের আর্জিকে সম্মান জানিয়ে অসম্পূর্ণ, অর্ধসম্পূর্ণ সব কাজ শেষ করে গেছেন। স্বভূমিতে ফেরার আগে মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী রাজভবনের কর্মী—সবার সঙ্গে সদাশয় মানুষটি কথা বলেছেন, দেখাও করেছেন। কারো কারো প্রশ্নের উত্তরে নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন, বঙ্গের অভিজ্ঞতা ‘ওয়ান্ডারফুল’। এটা কীভাবে, কোন্ নিরিখে তা অবশ্য জানা গেল না। তাঁর বিস্ময় অথবা বিরাগ রহস্যময় হয়ে রইল। পণ্ডিত মানুষ। দেশে-বিদেশে ব্যাপক কাজের বিস্তৃতি—এসব নিয়ে আশাকরি আত্মবৃত্তান্ত লিখবেন। যদি লেখেন, সমৃদ্ধ হব আমরা। জানতে পারব ‘ওয়ান্ডারফুল’ অভিজ্ঞতার সারকথা।
কেন্দ্রে নতুন সরকার আসার পর কংগ্রেস জমানায় নিযুক্ত রাজ্যপালদের ভবিষ্যত্ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতার অঘোষিত নিয়ম মেনে বিজেপি তার ঘনিষ্ঠ আর আপাতদ্রোহী নেতাদের রাজ্যপাল নিয়োগ করে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে পাঠানোর অঙ্ক কষতে শুরু করল। ভাবল, এতে এক ঢিলে দুই পাখি ঝরে পড়বে। এক. অসন্তুষ্ট, ক্ষমতাবলয়ের শরিক হতে না পেরে অতৃপ্ত, বলিষ্ঠ নেতাদের সম্মানজনক পুনর্বাসন ঘটবে। দুই. বিরোধী রাজনীতিতে আবিষ্ট রাজ্যগুলোর হাল-হকিকত সরাসরি তাঁদের দর্পণে ভেসে উঠবে। এরকম ভেবেই মুঘল আমলে দিল্লির ঘরোয়া বিদ্রোহ রুখতে বাদশাহ আকবর শাহজাদা সেলিমকে, জাহাঙ্গীর তাঁর পুত্র সুজাকে এবং ঔরঙ্গজেব মিরজুমলাকে বাংলার সুবেদার করে পাঠিয়েছিলেন। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। দিল্লিতে সরকার বদল হলেই রাজ্যের আলঙ্কারিক সর্বোচ্চ অভিভাবকের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। যাঁরা কৌশলী, আনুগত্য প্রদর্শনে অভ্যস্ত, তাঁরা মেয়াদ পূর্ণ করেই বিদায় নেন। রাজ্য সরকারের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে কারো কারো ভাগ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় বহাল শব্দটি।
এম কে নারায়ণ মেয়াদ পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর রাজ্যপাল থাকার কথা ছিল। কিন্তু সুযোগ দিল না কেন্দ্র। ফোন করে বিভিন্ন প্রদেশের কয়েকজন রাজ্যপালকে পদত্যাগ করতে বললেন স্বরাষ্ট্র সচিব অনিল গোস্বামী। জে বি পট্টনায়ক, শীলা দীক্ষিত এবং এম কে নারায়ণও তাঁদের অন্যতম। রাজ্যপালকে ফোনে পদ ছাড়ার ‘নির্দেশ’ দেবার এক্তিয়ার কি স্বরাষ্ট্র সচিবের থাকতে পারে? উনি তো একজন উচ্চপদস্থ আমলা। গুরুদায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মান্যতা দেয়া তাঁর কর্তব্য। কিন্তু রাজ্যপালের আসনে কারো থাকা, না থাকার বিষয়টি তাঁর কাজের পরিধির অন্তর্ভুক্ত নয়। তবু তিনি ফোন করলেন। এটাও বেনজির ঘটনা। শীলা দীক্ষিত, পট্টনায়ক, নারায়ণ কেউই এভাবে সচিবের ‘ফোনাদেশে’ পদ ছাড়তে চাননি। শীলা দীক্ষিত তো সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বললেন—সরবো না, মেয়াদ পূর্ণ করে ছাড়ব। সংযত, শান্ত, বিনম্র নারায়ণ শীলার মতো রাজনীতির লোক নন। আত্মমর্যাদাই তাঁর শক্তি-ভিত। গোড়াতে চুপ করে বসে থাকলেন। কিন্তু রাজভবনে ঢুকে সিবিআই-টিমের জিজ্ঞাসাবাদ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে দিল, সম্ভবত তীব্র অপমানিতবোধ করে দিন-তিনেকের মধ্যেই পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলেন। সংশ্লিষ্ট সব মহলকেই বলে পাঠালেন, আমি আর থাকছি না। যত সম্ভব দ্রুত, তাঁর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চেন্নাইয়ে চলে গেল। কিন্তু যাবার আগে সংগৃহীত পুস্তক ভাণ্ডার রাজভবনকেই দিয়ে গেলেন, এটাও এক দৃষ্টান্ত।
১ এপ্রিল ১৯১২ থেকে ৪ জুলাই ২০১৪ পর্যন্ত ৪৪ জন রাজ্যপাল বাংলার রাজভবনে বিরাজ করেছেন। ব্রিটিশ আমলে ২৪, স্বাধীনভারতে ২০। স্বাধীন দেশের বিভক্ত বাংলার প্রথম গভর্নর চক্রবর্তী রাজা গোপালচারী থেকে এন কে নারায়ণ পর্যন্ত বহু গুণী—কবি, অঙ্কবিশারদ, ইতিহাসবিদ, এক সময়ের রাজনীতিকের স্পর্শে, আলঙ্কারিক পদটি শোভিত। ধরমবীর, এস এস ধাওয়ান, এল ডায়াসে বা গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর মতো কারো কারো সঙ্গে রাজ্য সরকারের সংঘাত তৈরি হয়েছে। আবার সৈয়দ নুরুল হাসানের মতো বড়ো মাপের ঐতিহাসিক, এ আর কিদোয়াই এর মতো অঙ্ক বিশারদ, পদ্মজা নাইডুর মতো বিদগ্ধ দূরদর্শীরা বন্ধুর মতো, অভিভাবকের মতো সরকারকে পরামর্শ জুগিয়ে উজ্জ্বল ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া মমতার সরকারের সঙ্গে এম কে নারায়ণের মতভেদ দেখা দেয়নি। নির্বিরোধ ব্যক্তিত্ব। এ কারণেই মমতা সরকারের বহু সিদ্ধান্তকে নিঃশব্দে মেনে নিয়ে সম্মতির পরিসরকে, সহমতকে স্বাস্থ্যবান করে গেছেন। এটিও আরেক দৃষ্টান্ত। বাংলার সামাজিক ইতিহাস এভাবেই তাঁকে স্মরণ করবে; তেমনি, রাজভবনে তাঁকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে যে ‘নীরব অবমাননা’ জড়িয়ে আছে,—বেনজির এই ঘটনাও ইতিহাসের প্রাথমিক উপাদান হয়ে টিকে থাকবে।
নারায়ণের উত্তরসূরী কে? প্রকাশ্যে এখনও ঘোষণা করা হয়নি। বিহারের রাজ্যপাল ডি ওয়াই পাতিরকে অস্থায়ী রাজ্যপালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্র দপ্তর সংঘপরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য, উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংকে বঙ্গের রাজভবনে পাঠানোর কথা ভাবছে। পাশাপাশি ইউপি-র প্রাক্তন স্পিকার ও মন্ত্রী কেশরীনাথ ত্রিপাঠী এবং লালজি ট্যান্ডার-এর নামও উঠে আসছে। কল্যাণ অবশ্য তালিকার শীর্ষে। বিতর্কিত ব্যক্তি, আলিগড়ের বাসিন্দা, বংশ মর্যাদায় ক্ষত্রিয়, গায়ের রং শ্যামলা। প্রশাসক হিসেবে দক্ষ না অদক্ষ, তা জানেন তিনি নিজে, জানে তাঁর দল, জানেন উত্তরপ্রদেশের পুলিশ প্রশাসন এবং রাজনীতিকরা। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে একটি খবর, নির্ভুল খবর সম্পর্কে ভারতবাসী সম্পূর্ণ অবহিত। তা হচ্ছে এই যে, তিনি যখন মুখ্যমন্ত্রী, তখনই, ’৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘জগত্-বিখ্যাত’ করসেবকেরা অযোধ্যার ‘বিতর্কিত’ এবং ইন্দো-সারাসিন ও শার্কি স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন বাবরি মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেয়। সরকার, তার পুলিশ, তার প্রশাসন তখন নীরব দর্শকের ভূমিকায়। মসজিদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে রা কাড়েননি কল্যাণ সিং। নরসিংহ রাও তখন প্রধানমন্ত্রী, মসজিদ ধ্বংসের পর কেন্দ্র বরখাস্ত করল রাজ্য সরকারকে, কল্যাণ সিং আজও ‘অভিযুক্ত’ বলে পরিচিত। অভিযোগ প্রমাণিত না অপ্রমাণিত জানে আদালত, কিন্তু সংঘপরিবারের একান্ত অনুগত এই ভদ্রলোক—রাজ্যপাল হয়ে এলে তাঁকে আমাদের হিজ ম্যাজেস্টি, মাননীয়, পরমশ্রদ্ধাভাজন বলে সম্বোধন করতেই হবে—কিন্তু তাঁর নামের সঙ্গে ধ্বংসকাণ্ডের যে আলোকিত কলঙ্ক জড়িয়ে আছে, তা ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সেবকদের বিশেষ করে লোকায়ত জীবন-দর্শনে বিশ্বাসী, মিলনে বিশ্বাসী, সমন্বয়ে বিশ্বাসী বাংলার মানুষের ভুলে যাওয়া কি সম্ভব? মনে হয় না। কেননা বার বার তাঁর ওই মুখ সামনে আসবে, বার বার মনে পড়বে বাবরি ধ্বংসের উল্লাস এবং ধ্বংসস্তূপের ভাষাহীন আর্তনাদ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ পর্যন্ত দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। নবীন ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। আমাদেরও দেখাচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে ঐক্য আর উন্নয়নের খোয়াব দেখছে নবপ্রজন্ম—তিনি যদি বিতর্কিত, বাবরি ভাঙার অন্যতম ‘অভিযুক্ত মহানকে’ কলকাতার রাজভবনের মসনদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, সেটি এক ‘হিমালয়ান ব্লান্ডার’ বলে গণ্য হবে। জনসমক্ষেও হেয় হবে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি! দ্বিতীয়ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, বাংলায় তাঁর ভোটার, বাংলার বহুদলীয় রাজনীতি কি মেনে নেবে আশঙ্কিত অকল্যাণের আবির্ভাব?
আরেকটি কথা বলতেই ইচ্ছে করছে। গত শতাব্দীর ’৯০-র দশকের গোড়ার কথা। সবে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন কল্যাণ সিং। এখনকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কালরাজ মিশ্র তখন গোবলয়ের বিজেপির সাংগঠনিক মহামন্ত্রী। তাঁর সূত্রেই মুখ্যমন্ত্রীর একান্ত সাক্ষাত্ গ্রহণের সুযোগ এসে গেল। লক্ষ্নৌর অভিজাত এলাকার বিশাল চৌহদ্দি জুড়ে তাঁর সরকারি বাসভবন। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট দশেকের মধ্যেই দু’জন পরস্পরের মুখোমুখি। আমার হাতে একগুচ্ছ প্রশ্ন। ওঁর মুখে হাসি। সব প্রশ্নের জবাব দেবেন কিনা, আমি দ্বিধান্বিত। উনি নির্বিকার, সংশয়হীন, শান্ত। শুরুতেই বলতে হল, আপনার রাজনীতির সঙ্গে আমার অনেকাংশের দূরত্ব। তবে কথা দিচ্ছি, যা বলবেন—প্রতিটি শব্দ, সেমিকোলন, দাড়ি, কমা অবিকৃত ছাপা হবে। শুনেই হাসলেন। তারপরেই প্রশ্ন আর উত্তরপর্ব শুরু। কয়েকটি এড়িয়ে গেলেন। উঠল বাবরি আর অভিন্ন দেওয়ানি আইনের প্রসঙ্গ। বিজেপি বা সংঘপরিবারের ঘোষিত এজেন্ডা এক দেশে একই দেওয়ানি বিধি চালু করার বিষয়টি নিয়ে তাঁর জবাব, ইস্যুটি স্পর্শকাতর। এখনই এ ব্যাপারে ভাবছি না। এবার প্রশ্ন, বাবরি মসজিদের কী হবে? বিতর্কিত জমিতে শিলান্যাস তো হয়ে গেছে। রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে এখন আপনি আর আপনার দল। প্রস্তাবিত, ঘোষিত রামমন্দির কবে হবে? প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে ছড়িয়ে দিলেন একরাশ হাসি—চা, মিষ্টি, লাড্ডু এসে গেছে। খেয়ে নিন।’ বলতেই হবে, ভদ্রলোক। অতিথিবত্সল। এবং প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত। তাঁর সঙ্গে আমার, আমাদের সামাজিক অবস্থান ও চিন্তা সমান্তরাল নয়, হতে পারে না, তবু স্বাস্থ্যময় মতভেদের পরিসর গড়ে তোলা হয়তো কঠিন কর্ম নয়। কঠিন হলেও বলতে হবে, ভাবতে হবে, গড়তেও হবে। এটাই তো গণতন্ত্রের অপরিহার্য, প্রাথমিক শর্ত।
লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, ‘আরম্ভ’ পত্রিকার সম্পাদক